তার নামের আগেও ডন আছে। দোহাই লাগে, এ ডনের কাণ্ড শুনে আঁতকে উঠবেন না। কানা ছেলের নামও তো পদ্মলোচন হয় নাকি?
ব্যাপার হলো এই ডন ৭৭৭ মিনিট ব্যাট করে ৫৪৮ বল খেলে ২০১ রানে অপরাজিত একটা ইনিংস খেলেছিলেন ১৯৮৭ সালের এই দিনে। তা ভালোই তো। টেস্ট ক্রিকেটের পরাকাষ্ঠা। ঠুকঠুকের চূড়ান্ত। এতে আঁতকে ওঠার কী আছে?
আরে আছে আছে! ৩৩ বছর আগে এমনই এক ১৯ এপ্রিলে কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস গ্রাউন্ডে উনি টানা তিনদিন ব্যাটিং করার পর জীবনের প্রম এবং শেষ ডাবল সেঞ্চুরিটি করেছিলেন। যা মন্থর টেস্ট ডাবলের রেকর্ড হিসেবে এখনো টিকে আছে। লোকটার নাম ডন সারধা ব্রেনডন প্রিয়ান্থা কুরুপ্পু। উইকেটের পেছনে দাঁড়াতেন আর লঙ্কা দলের ওপেনার হিসেবে ব্যাট করতেন।
মন্থরতম ডাবল সেঞ্চুরির গল্পটা শোনেন। কলম্বো টেস্ট শুরু হয়েছিল ১৯৮৭ সালের ১৬ এপ্রিল। তারকা খচিত নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টস হেরে ব্যাট করতে নেমেছিল শ্রীলঙ্কা। প্রম দিন রোশান মহানামার সঙ্গে ওপেন করতে নামেন কুরুপ্পু। কেউ ভাবেনি এ ছেলে টানা তিন দিন ব্যাট হাতে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকবে। তাও আবার স্যার রিচার্ডস হ্যাডলি অ্যান্ড কোং-এর বিপক্ষে।
কলম্বোর আকাশ সেদিন মেঘলা ছিল। হ্যাডলির আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠার কথা। কিন্তু কলম্বোর প্রাণহীন উইকেট শুরু থেকেই কিউই পেসারদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে থাকে। এতেও মহানামা ও কুরুপ্পুর ওপেনিং জুটি ৪২ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয়নি। মাত্র ২৯ রান উঠেছিল। এরপর অশাঙ্ক গুরুসিনহা আরও ৪১ রান যোগ করে ব্যক্তিগত ২২ রানে হ্যাডলির বলে এলবিডব্লিউ হন। রয় ডায়াস নেমে দারুণ খেলছিলেন। তিনটা আগুনে বাউন্ডারির পর দর্শকরাও নড়েচড়ে বসেছিল। ২৫ রানে তিনি হ্যাডলির বলে জন ব্রেসওয়েলের হাতে ধরা পড়েন। এরপর কলম্বোর আকাশ মেঘে ঢেকে যায়। আলোক স্বল্পতায় খেলা বন্ধ হওয়ার আগে শ্রীলঙ্কা ১৪১/৩, এর মধ্যে কুরুপ্পুর ৬৬। ওটাই তখন পর্যন্ত তার সর্বোচ্চ ফার্স্টক্লাস ইনিংস। এর আগে একটিই ফিফটি ছিল তার। কলম্বো টেস্টের কয়েকদিন আগে পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-২৩ দলের বিপক্ষে একটা ফার্স্টক্লাস ম্যাচে ৫৫ করেছিলেন তিনি।
দ্বিতীয় দিনে চটজলদি আউট ২১ বছরের অর্জুনা রানাতুঙ্গা। অধিনায়ক দিলিপ মেন্ডিসও থিতু হতে পারেননি বেশিক্ষণ। ব্যাট হাতে কুরুপ্পুকে সাহায্য করেছিলেন রঞ্জন মাদুগালে। এই একজনই কুরুপ্পুর সঙ্গে দাঁড়িয়ে শতাধিক রানের জুটি গড়তে পারেন। মাদুগালের ৬০ রানের ইনিংস সম্পর্কে উইজডেন ম্যাচ রিপোর্টে লিখেছে, ‘সত্যিকার কর্তৃত্ব নিয়ে ব্যাট করেছিল সে।’ কলম্বোর মরা উইকেটে কোনো প্রভাবই ফেলতে পারছিলেন না হ্যাডলি, চ্যাটফিল্ড, ব্রেসওয়েল এবং ইভান গ্রে। ফলে লঙ্কার হয়ে অভিষেক টেস্টে প্রম সেঞ্চুরির নজির গড়তে তেমন বেগ পেতে হয়নি কুরুপ্পুর। টেস্টের দ্বিতীয় দিনের খেলাও আলোর অভাবে নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ হওয়ার মুহূর্তে শ্রীলঙ্কা ৩১৭/৫। ধৈর্যের প্রতিমূর্তি হয়ে ১৫৩ রানে ব্যাট করছিলেন কুরুপ্পু।
ভারতের সাবেক অধিনায়ক অংশুমান গায়কোয়াডের একটা রেকর্ড আছে। জলন্ধরে ১৯৮৩ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২০১ রান করেছিলেন তিনি। সেই ডাবল সেঞ্চুরি করতে গায়কোয়াডের ৬৫২ মিনিট আর ৪৩৬ বল লেগেছিল। কুরুপ্পুর কলম্বো মিশনের আগে ওটাই ছিল মন্থরতম ডাবল সেঞ্চুরির রেকর্ড। এই রেকর্ড ভাঙার আগে অন্তত তিন বার আউটের সুযোগ দিয়েছিলেন কুরুপ্পু। প্রম দিন ৩০ রানে। দ্বিতীয় দিন ৭০ রানে আর তৃ তীয় দিন ১৬৫ ও ১৮১ রানের মাথায় দুবার। তিনি যখন ১৮০ রানে, তখন উইকেটে আসেন কৌশল কুরুপ্পুরাচ্চি। ইনি ৩৫ মিনিট উইকেটে থেকে কুরুপ্পুর ডাবল সেঞ্চুরি করতে সহায়তা করেছিলেন। নিজে ২০ বল খেললেও কোনো রান করেননি। তবে তার ওই মহামূল্যবান সহযোগিতাতেই ৭৭৭ মিনিট ব্যাট করে ৫৪৮ বলে ২০১ রানের ইনিংস খেলে অপরাজিত থাকতে পেরেছিলেন কুরুপ্পু। ওটা ছিল টেস্ট অভিষেকেই ডাবল সেঞ্চুরির তৃতীয় নজির। এর আগে ইংল্যান্ডের টিপ ফস্টার এবং উইন্ডিজের লরেন্স রো অভিষেকেই করেছিলেন ডাবল। তালিকায় পরে যোগ দেন ম্যাথু সিনক্লিয়ার ও জ্যাক রুডলফ।
৩৩ বছর টিকে আছে কুরুপ্পুর সেই মন্থরতম ডাবল সেঞ্চুরির রেকর্ড টি-টোয়েন্টির ধামাকা ক্রিকেট যুগে হয়তো আরও বহুদিন টিকে যাবে। সেদিন মাত্র একটা রেকর্ডই করেছিলেন কুরুপ্পু তা নয়। ৭৭৭ মিনিট ব্যাট করে তিনি দীর্ঘসময় উইকেটে থাকাদের তালিকায় তিন নম্বরে উঠে এসেছিলেন। ৯৯০ মিনিট উইকেটে কাটিয়ে এই তালিকার শীর্ষস্থানটি দখলে রেখেছেন পাকিস্তানি কিংবদন্তি হানিফ মোহাম্মদ। এরপরেই আছেন ইংলিশ কিংবদন্তি লেন হাটন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৯৩৮ সালের ওভাল টেস্টে ৩৬৪ রানের ইনিংস খেলার সময় ৭৯৭ মিনিট উইকেটে ছিলেন হাটন। এরপরেই আছেন কুরুপ্পু।
মন্থরতম ডাবল সেঞ্চুরির রেকর্ডের জন্ম দেওয়া কলম্বো টেস্টে শেষ পর্যন্ত ড্র হয়েছিল। কুরুপ্পু ২০১ রানে অপরাজিত থাকা অবস্থায় চা বিরতির ৫০ মিনিট আগে ইনিংস ঘোষণা করেন দিলিপ মেন্ডিস। নিউজিল্যান্ড প্রম ইনিংসে ৫ উইকেটে ৪০৬ রান তুলেছিল। সেঞ্চুরি করেছিলেন মার্টিন ক্রোর ভাই জেফ ক্রো এবং রিচার্ড হ্যাডলি। এই দুজনই কলম্বো টেস্টে একটা মাইলফলক ছুঁয়েছিলেন। হ্যাডলি ৩৫৫ উইকেট নেওয়া ডেনিস লিলিকে টপকে যান। আর জেফ ক্রো অধিনায়ক হিসেবে প্রম টেস্টেই সেঞ্চুরি করেন। তাতে অবশ্য ‘মিস্টার ঠুকঠুক’ কুরুপ্পুর কাছ থেকে লাইমলাইট কাড়তে পারেননি। এরপর কুরুপ্পু টেস্ট খেলেছেন আর ৩টি। এছাড়া ওয়ানডে খেলেছেন ৫৪টি।
