করোনায় পাল্টাবে না মৃত্যুর আধুনিক ধারণা: ইউভাল নোয়াহ হারারি

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২০, ০৯:০২ পিএম

নভেল করোনাভাইরাস চোখের পলকে কাতারে কাতারে প্রাণ নিয়ে গেলেও মৃত্যু সম্পর্কে মানুষের আধুনিক যে ধারণা সেটি পাল্টাবে না বলে মনে করেন ইসরায়েলের জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইউভাল নোয়াহ হারারি। করোনার পর মৃত্যু নিয়ে মানুষের ভাবনা পাল্টাবে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দ্য গার্ডিয়ানে লেখা কলামে ‘স্যাপিয়েন্স: আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব হিউম্যানকাইন্ড’র লেখক হারারি বিজ্ঞানেরই জয়গান গেয়েছেন।

হারারি লিখেছেন, আগেকার দিনে মহামারী এলেই মানুষ ‘সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ’ বলে মুক্তি খুঁজত। কিন্তু আধুনিক যুগে সেসবের বালাই নেই। আধুনিক যুগের মানুষেরা বিশ্বাস করে, মানুষ আরও বেশি সতর্ক থাকলে রোগবালাই এভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।

হারারি তার কলামে ধর্মকে অস্বীকার করেননি। কিন্তু পৃথিবী টিকিয়ে রাখার জন্য তিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি নির্ভরশীল হওয়ার বিষয়ে জোর দিয়েছেন।

বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণে মানব ইতিহাসের ব্যাখ্যা দিয়ে বই লিখে পৃথিবীব্যাপী তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন এই হারারি। তিনি মনে করেন, মানুষ নিজেকে আপগ্রেড করে আগামী ২০০ বছরের মধ্যেই সাইবর্গ বা যন্ত্রমানবে রূপান্তর করতে সক্ষম হবে।

মানুষের কেন মৃত্যু হয়, সৃষ্টির আদিকাল থেকে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে মানুষ। এক সময় বলা হতো সৃষ্টিকর্তা আয়ু থামিয়ে দেন বলেই মানুষের মৃত্যু হয়। সমাজের বড় একটা অংশের এই বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করে হারারি নতুন কলামে লিখেছেন, ‘বাইবেল, কোরআন এবং বেদের মতো গ্রন্থ অনুযায়ী, মৃত্যু বিধাতার হাতে লেখা। আধ্যাত্মিক শক্তির বলে মানুষের জীবনকাল বেড়ে যায় বলেও বিশ্বাস মানুষের।’

‘এক সময় বিজ্ঞান এল। ঘটল বিপ্লব। মানুষ বলল, মৃত্যু নিছক একটা টেকনিক্যাল সমস্যা।  হার্ট রক্ত সঞ্চালন বন্ধ করে দিলে মানুষের মৃত্যু হয়। ক্যানসার লিভার ধ্বংস করলে মানুষের মৃত্যু হয়। ভাইরাস ফুসফুস আক্রমণ করলে মানুষের মৃত্যু হয়। এগুলো আসলেই কি সব টেকনিক্যাল সমস্যা?’

হারারির মন্তব্য, ‘হার্টের পেশিতে যথেষ্ট অক্সিজেন না পৌঁছালে সে রক্ত সঞ্চালন বন্ধ করে। জেনেটিক পরিবর্তনের জন্য ক্যানসার লিভারে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ আমার সামনে হাঁচি দিলে ভাইরাস আমার ফুসফুসে বাসা বাঁধে।’

‘বিজ্ঞান বিশ্বাস করে প্রতিটি কারিগরি সমস্যার পেছনে কারিগরি কারণ থাকে। মৃত্যু জয় করতে খ্রিস্টের আরেকবার আসার দরকার নেই।’

বিজ্ঞান এতই যদি সফল, তাহলে অমোঘ এই মৃত্যুকে শেষ পর্যন্ত ঠেকানো যায় না কেন? হারারি লিখেছেন এভাবে, ‘আমরা এখনো সব টেকনিক্যাল সমস্যা সমাধান করতে পারি না, এটা সত্য। কিন্তু আমরা কাজ করছি। এখন আসল মানুষ মৃত্যুর মানে খুঁজতে যায় না। বরং জীবনের মেয়াদ বাড়াতে চায়। তারা মৃত্যুর জন্য কারণগুলোর পেছনে বিনিয়োগ করছে। নতুন নতুন ওষুধ তৈরির চেষ্টা করছে। চেষ্টা করছে যুগান্তকারী চিকিৎসা ব্যবস্থা আবিষ্কারের।’

মানুষ এসব করে উল্লেখযোগ্যভাবে সফল বলে মনে করেন হারারি, ‘গত দুই শতকে গোটা পৃথিবীতে মানুষের গড় আয়ু ৪০ থেকে বেড়ে ৭২ বছর হয়েছে। কিছু উন্নত দেশে সেটি ৮০। সেই আদিকালের মতো ঘরে ঘরে এখন আর শিশুদের মৃত্যু হয় না।’

চলমান মহামারী শেষের পর মৃত্যু সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে, হারারি তার সম্ভাব্য উত্তর দিয়েছেন কলামের নবম প্যারার শুরুতে, ‘সম্ভবত দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে না। কভিড-১৯ এর কারণে মানুষ জীবন রক্ষার চেষ্টায় আরও নিবেদিত হবে।’

‘মহামারীতে মানুষ কেন মরে, এই প্রশ্নে মানুষ আগে বলতো সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন। কিন্তু এখন আর সৃষ্টিকর্তাকে কেউ দোষ দেয় না। এখন সবাই ভ্যাকসিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। ’

হারারি মনে করেন, ভ্যাকসিন আসার পর মানুষের উচিত আরও বেশি হাসপাতাল বানানো, ‘আমাদের আরও বেশি চিকিৎসক, নার্স দরকার। আরও বেশি শ্বাসযন্ত্রের মেশিন মজুদ রাখা প্রয়োজন। আরও বেশি করে দরকার টেস্টিং কিট। সুরক্ষার পোশাক। এসবের পাশাপাশি গবেষণায় আমাদের আরও বেশি বিনিয়োগ দরকার।’

‘মহামারী শেষ হলে আধ্যাত্মিক বিষয়ে আমাদের বিনিয়োগের দরকার আছে বলে মনে করি না। তার চেয়ে সরকারের উচিত স্বাস্থ্য সেবা উন্নত করা। আধ্যাত্মিক বিষয়ে উন্নত হওয়া ব্যক্তির নিজের ব্যাপার। মনে রাখতে হবে, চিকিৎসকেরা আমাদের অস্তিত্বের ধাঁধা সমাধান করতে পারেন না, তারা কেবল আরও কিছুক্ষণ আমাদের টিকিয়ে রাখতে পারেন। আমরা যা করি সময় আমাদের সেখানেই নিয়ে যায়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত