নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থানার ওসি মো. আবদুল আহাদ খানের বিরুদ্ধে গৃহকর্মী হত্যা মামলায় চেয়ারম্যানকে বাঁচাতে নানা কারসাজির অভিযোগ উঠেছে।
বারহাট্টা উপজেলার সিংধা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক শাহ মাহবুব মুর্শেদ কাঞ্চনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তার নিজ গৃহে গৃহকর্মী মারুফা আক্তারকে (১৪) নির্যাতন করে হত্যা করার। সিংধা গ্রামের মৃত আকবর আলীর স্ত্রী ও ভিকটিমের মা আকলিমা আক্তার এ ঘটনায় মামলা করেন। তিনি ওসির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন।
সোমবার থানায় মামলা করার পর সন্ধ্যায় চেয়ারম্যানকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে পুলিশ। মঙ্গলবার দুপুরে চেয়ারম্যানকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। শনিবার ওই গৃহকর্মীর লাশ উদ্ধার হয়।
সোমবার দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধি ওসিকে ফোন দিলে তিনি জানান, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চেয়ারম্যানকে আটক করা হয়েছে। এর আগে মৃত্যুর দিন শনিবার রাতে ওসি দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিকে কারেন্টের তার পেঁচানো এক লাশ উদ্ধার করা হয়েছে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
ঘটনার দিন শনিবার রাতে সিংধা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক শাহ মাহবুব মোর্শেদ কাঞ্চন ফোনে বলেন, বিকেল ৪টায় বাসায় এসে গোসল করেছেন তিনি। এরপর মারুফাকে খোঁজাখুঁজি করে বাসার পেছনে বড়ই গাছে কারেন্টের তারে ঝুলে আছে দেখতে পান।
এরপর চেয়ারম্যান নিজেই হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখান কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। খবর পেয়ে পুলিশ হাসপাতালে যায়। লাশ হাসপাতালে বেশিক্ষণ না রেখে ময়নাতদন্তের জন্য ব্যাগে ভরে অ্যাম্বুলেন্সে করে থানায় নিয়ে আসে পুলিশ। ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতালে না নিয়ে, কেন থানায় আনা হলো এমনই অভিযোগ তোলেন স্থানীয়রা।
ওই কিশোরীর মা, ভাই ও স্বজনদের অভিযোগ, থানায় অ্যাম্বুলেন্সে রাখা লাশ সারা রাতের মধ্যে একবারের জন্যও তাদের দেখতে দেওয়া হয়নি।
এসব অভিযোগ বিষয়ে মোহনগঞ্জ থানার ওসি মো. আবদুল আহাদ খানের সঙ্গে মঙ্গলবার বিকেলে কথা হলে তিনি বলেন, হাসপাতাল তো পাবলিক স্থান। এখানে মানুষ সেবা নিতে আসে এবং একটা আতঙ্ক তৈরি হয়। টিএইচও (থানা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা) বারবার ফোন করেন লাশটি সরানোর জন্য। ওখানে মানুষজন চিকিৎসা নিতে আসতে ভয় পাচ্ছে। এ জন্য আইও'র (তদন্ত অফিসার) হেফাজতে রেখে অ্যাম্বুলেন্সে রাখা হয়েছে। নিহতের মা আসেন রাত ২টার দিকে। তখন অ্যাম্বুলেন্স খুলে দেওয়া হয়। তাদের অভিযোগ সঠিক নয়। রাতে তারা দেখবে না বলেছে, পরে সকালে দেখেছে। আমরা তো তার (মা) জন্য অপেক্ষ করলাম, পরে সকালে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ পাঠানো হয়।
ঘটনার দিন রাতে দেশ রূপান্তর প্রতিনিধিকে ফোনে এ ঘটনাকে কেন আত্মহত্যা বলেছিলেন তা জানতে চাইলে ওসি বলেন, প্রাথমিকভাবে এটা আত্মহত্যা মনে হয়েছিল। এখন অভিযোগ দিয়েছে, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসা সাপেক্ষে তদন্ত করা হবে।
ধামাচাপার বিষয়ে তিনি বলেন, পুলিশ ধামাচাপা দেবে না।
সিংধা ইউনিয়নের সাবেক সংরক্ষিত (৩,৫,৬) মহিলা মেম্বার সন্ধ্যা রানীয় রায় জানান, আকলিমা (মৃত কিশোরীর মা) আমার সাহায্য নিতে দেখা করতে চেয়েছিল। সে জানায় সোমবার তাকে থানায় অভিযোগের জন্য যেতে বলেছে। তার আসতে দেরি দেখে বিকেলে ফোন করি। সে আমাকে বলে, পুলিশ তাকে আটকে রেখেছে। ওসি ও চেয়ারম্যান স্বাক্ষরের জন্য চাপ প্রয়োগ করছে। আমি তাকে বলি, কোনো কাগজে স্বাক্ষর করো না। এ অবস্থায় ওসি ওর কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলে এবং আমাকে জিডি ও মামলার ভয়ভীতি দেখায়। আমি ৯৯৯-এ ফোন করে সাহায্য নিই। পরে অভিযোগ দায়ের করে আকলিমা থানা থেকে বের হয়।
নিহতের মা আকলিমা আক্তার জানান, দু’বছর আগে স্বামী প্রতিপক্ষের আঘাতে খুন হওয়ার কয়েক মাস পর চেয়ারম্যানের বাসায় কাজের জন্য আমার ছোট মেয়েকে নেয়। প্রথমে দিতে চাইনি। পরে প্রতিবেশীদের অনুরোধে আর্থিক অবস্থা ও স্বামী হত্যা মামলার ব্যয় বিবেচনা করে সম্মতি দিই। চেয়ার্যমান লেখাপড়া ও বিয়ের আশ্বাসে মেয়েকে মোহনগঞ্জ পৌরসভার দৌলতপুর এলাকায় নিজস্ব বাসায় নিয়ে যায়। এ দিকে সংসার ও ছেলের লেখাপড়া খরচ যোগাতে দেড় মাস আগে ঢাকায় এক বাসায় কাজ নিই। শনিবার বিকেলে ফোনে আমাকে জানানো হয়, আমার মেয়ে অ্যাকসিডেন্ট করে হাসপাতালে। পরে আমি চেয়ারম্যানের স্ত্রীকে ফোন দিলে তিনি ধরেননি। পরে আবার ফোন দিলে বন্ধ পাই। চেয়ারম্যানের ভাতিজা ফেরদৌস ফোন দিয়ে বলে আমার মেয়ে হাসপাতালে আছে। আমার কান্না দেখে যে বাসায় কাজ করি সে ম্যাডাম আমার ছেলে ও ভাগিনাকে ফোন দেয় এবং কীভাবে পাঠানো যায় তা নিয়ে ম্যাডাম চিন্তা করতে থাকে। পরে চেয়ারম্যানের ছেলে তন্ময় ফোন করে জানায় গাড়ি নিয়ে আসছি। সে আমাকে এলাকায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে। তার সঙ্গে রওনা দিয়ে আসার পথে আমার ছেলে আকিকুল ও ভাগিনা ফোনে জানায় লাশ দেখতে দিচ্ছে না পুলিশ। যাওয়ার পথে চেয়াম্যানের ছেলে ফোন দিয়ে বলে ওসি কথা বলবে। পরে ওসি বলে, আপনি নেত্রকোনায় থাকেন, লাশ পোস্টমর্টেমের জন্য নেত্রকোনা পাঠানো হয়েছে। আমি লাশ তখনো দেখিনি, না দেখে কীসের পোস্টমর্টেম। রাতে থানায় আসলে লাশ দেখতে পাইনি। আইও লিখিত কাগজ এনে আমাকে বলে চেয়ারম্যান সই করেছে, তুমি কর। আমি বলি, ছেলে ও ভাগিনা পড়ে না শুনালে আমি সই করব না। আগে আমি স্বামীর খুনের মামলায় সই করে এখন এই মামলা হালকা হয়ে গেছে। আমি করব তবে দেখে শুনে করব। সকালে আমাদের অ্যাম্বুলেন্সে করে নেত্রকোনায় পাঠায় এবং অ্যাম্বুলেন্সেই দেখতে পাই মেয়ের দেহে বিভিন্ন ফোলা জখমের দাগ। মোবাইলে ছবি তুলে রাখি। পোস্টমর্টেমের পরে দাফনের আগে গোসল আমি নিজেই করাই। তখন আরো দেখতে পাই শরীরের অনেক স্থানে কালো ফোলাসহ গোপনাঙ্গে আঘাতের চিহ্ন।
তিনি জানান, রবিবার ওসি আমাকে ফোন করে বলেন সোমবার থানায় আসেন অভিযোগ দিতে। সিএনজি ভাড়া দিয়ে দিয়ে দেওয়া হবে।পর দিন সোমবার মেম্বার সন্ধ্যা রানীকে জানিয়ে থানায় আসি। গিয়ে দেখি ওসি ও চেয়ারম্যান বসে আছে। আইও লিখিত কাগজ নিয়ে এসে বলে সই করার কথা। আগে মামলা করে ঠকেছি। এবার মামলা আমি করব, তবে নিজেদের লোক দিয়ে অভিযোগ লিখিয়ে। তারা বারবার সই করার জন্য চাপ দিতে থাকে। থানা থেকে বের হয়ে আসতে চাইলে মহিলা পুলিশ দিয়ে আটকে রাখে। বিকেলে সন্ধ্যা রানী আমাকে ফোন দিয়ে দেরি হচ্ছে কেন জানতে চাইলে বলি, আমাকে থানা থেকে বের হতে দিচ্ছে না, সই নিতে চাচ্ছে। কোথাও সই দিতে না করেন সন্ধ্যা রানী। এ সময় আমার হাত থেকে মোবাইলটি থাবা দিয়ে নিয়ে যায় তারা। সন্ধ্যা রানীকে জিডি ও মামলার ভয় দেখায় ওসি।
নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতালের আাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) মো. একরামুল হাসান জানান, সব আলামত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ডিএনএ টেস্ট করতে পুলিশকে বলা হয়েছে। সবগুলো রিপোর্ট আসলে বলা যাবে।
এ ব্যপারে নেত্রকোনার পুলিশ সুপার আকবর আলী মুনসী জানান, কেউ থানা থেকে অন্যায় আচরণ পাওয়ার অভিযোগ করতেই পারেন। আমারা দেখছি আউটকাম। মামলা রুজু হয়েছে। বাকি বিষয়টা আমরা তদন্ত করে বের করব। ওই কিশোরীকে ধর্ষণ করা হয়েছে কি না তা ফরেনসিক মতামতের জন্য ঢাকায় পাঠাচ্ছি। আমাদের তরফ থেকে কোনো কার্যক্রম বাকি রাখা হচ্ছে না। আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে।
সবগুলো বিষয়ই খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
