করোনাভাইরাসের কারণে অন্যান্য সব খাতের মতো শিক্ষা খাতেও ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-কর্মচারী এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনলাইনে শ্রেণি কার্যক্রম আরও গতিশীল করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। করোনার কারণে অর্থকষ্টে থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঝরেপড়া, শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়ের হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এত কিছুর পরেও এবারের বাজেটে বিশেষ কোনো বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়নি। উল্টো জিডিপির অনুপাতে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ কমেছে। এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা শিক্ষার এই বাজেটকে সে অর্থে ‘গতানুগতিক’ বলেই চিহ্নিত করেছেন। একইসঙ্গে করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিশেষ বরাদ্দ না রাখায় সমালোচনাও করেছেন তারা।
গতকাল জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাবে অর্থমন্ত্রী আ. হ. ম. মুস্তফা কামাল ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে ৮৫ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেন, যা মোট বাজেটের ১৫ দশমিক ১ শতাংশ। গেল অর্থবছরের বাজেটে ৭৯ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, যা ছিল মোট বাজেটের ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। শতাংশের হিসাবে বাজেটে দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে এবার এই খাতে খাতে যে বরাদ্দ ধরা হয়েছে তা জিডিপির ২ দশমিক ৭০ শতাংশের সমান; অথচ গেল অর্থবছরে ছিল ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ফলে জিডিপির অনুপাতে হিসাবে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে।
বাজেট প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সার্বিকভাবে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কিছুটা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে ২৪ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগকে ৩৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগকে ৮ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে ১৭ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগকে ১ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বাজেট-পরবর্তী শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, করোনায় শিক্ষা খাতে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় বাজেটে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। অথচ অন্যান্য খাতের মতো এই খাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, আগামীতেও হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের যেহেতু শ্রেণিকক্ষে সহজে ফেরানো যাচ্ছে না ফলে অনলাইন ক্লাস কার্যক্রমের ওপর জোর দিতে বাড়তি অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন ছিল। অথচ এ বিষয়ে বাজেট বরাদ্দে মনোযোগ দেওয়া হয়নি। বাজেটে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক-কর্মচারী, শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের সহায়তার কোনো ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা নেই বলেই মনে হয়েছে। ঝরেপড়া শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফিরিয়ে আনতে, সামাজিক সুরক্ষার অধীনে উপবৃত্তি ও স্কুল মিল কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি করা; স্কুল মিলে পুষ্টি চাহিদার অন্তত ৫০% নিশ্চিত করা; বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুবিধাবঞ্চিত অভিভাবকদের ভিজিডি ও বিধবা কার্যক্রমের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এছাড়া শিক্ষা গবেষণার প্রসার; সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার; ন্যূনতম শিখনফল অর্জনে বিশেষ উদ্যোগ; বিদ্যালয়ভিত্তিক কভিড-১৯ এর স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তন করার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু বাজেটে এসব পরিকল্পনার কোনো নমুনা পাওয়া যায়নি।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মোটা দাগে বাজেটের আকারের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা খাতেও কয়েক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু সে অর্থে শিক্ষায় যে হারে বাড়ানোর প্রত্যাশা করেছিলাম সেটা হয়নি। এটা গতানুগতিক।’
তিনি বলেন, ‘বরং এবার অন্যান্যবারের তুলনায় শিক্ষার দিকে বিশেষ নজর দেওয়ার কথা ছিল। করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রণোদনাসহ শিক্ষা কার্যক্রমকে অনলাইনে পরিচালনার ওপর জোর দিতে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য ব্যাপক অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন ছিল কিন্তু সেটা হয়নি।’
অন্যদিকে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষায় বাজেট গতানুগতিক। করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিশেষ বরাদ্দ থাকতে পারত। কিন্তু তা হয়নি। করোনায় অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়বে। এতে শিশুশ্রম আর বাল্যবিয়ে বেড়ে যাবে। বেসরকারি স্কুল-কলেজ এবং কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো ক্ষতির মুখে পড়বে। বহু অনার্স-মাস্টার্স কলেজ যারা এমপিও পায় না তারা ক্ষতির মুখে পড়বে। আল্টিমেটলি ক্ষতির মুখে পড়বে শিক্ষার্থীরা। কিন্তু তাদের সুবিধা দিয়ে টেনে তুলতে হবে, এর জন্য তো কোনো বরাদ্দ চোখে পড়েনি। ফলে এই বাজেট দিয়ে কভিড-১৯ এর জন্য পড়াশোনার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।’
