সাশ্রয়ী, লক্ষ্যনির্দিষ্ট ও কার্যকর বাজেটের প্রত্যাশা মিটল না

আপডেট : ১৬ জুন ২০২০, ০৭:৩৬ এএম

প্রস্তাবিত বাজেট ২০২০-২১ এমন সময়ে উপস্থাপিত হলো, যখন বাংলাদেশ করোনা সংক্রমণের কারণে একধরনের বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। যদিও বাংলাদেশে এ সংক্রমণের সূত্রপাত জানুয়ারি থেকে, তবে ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে মার্চ মাস থেকে। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও আমরা করোনা সংক্রমণের কিছু প্রতিক্রিয়া দেখতে পেয়েছি। প্রস্তাবিত বাজেটটি যখন উত্থাপিত হলো, তখন বাংলাদেশ বেশ কিছু ঝুঁকির মধ্য দিয়ে সময় অতিক্রম করছে। চার ধরনের ঝুঁকিতে আমরা রয়েছি : ১. স্বাস্থ্যঝুঁকি, ২. খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি ৩. কর্মসংস্থানের ঝুঁকি ৪. দারিদ্র্য ও বৈষম্যের ঝুঁকি। বিভিন্ন গবেষণা ও তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখা গিয়েছে যে, ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষ হতে যাচ্ছে, সে বছরে গত এক দশকে আমরা জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার, বেকারত্ব হ্রাস এবং দারিদ্র্য বা আয়বৈষম্যের ক্ষেত্রে আমরা যে অগ্রগতি অর্জন করেছিলাম, সেগুলো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে পড়বে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, আইএলও, এডিবি এবং দেশের মধ্যে সিপিডি, পিআরআই-এর মতো সংস্থাগুলো বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত দিয়ে নিয়মিত পরিস্থিতি জাতীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে তুলে ধরেছে। ফলে সামগ্রিকভাবে যে অর্থবছরটি শেষ হতে যাচ্ছে, সে বছরে সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমরা কিছু দুর্বল চিত্র দেখতে পাচ্ছি। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি থাকা, সরকারি বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ততা, উচ্চ বাজেট ঘাটতি, নেতিবাচক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং নেতিবাচক আমদানি প্রবৃদ্ধি ইত্যাদি পরিলক্ষিত হয়েছে। যদিও এর মধ্যে আমরা কিছু স্বস্তিদায়ক চিত্র দেখতে পেয়েছি : মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে একধরনের স্থিতিশীল পরিস্থিতি, রেমিট্যান্স ফ্লোর ক্ষেত্রে যতটুকু নেতিবাচক ভাবা হয়েছিল ততটুকু না হওয়া, ব্যালেন্স অফ পেমেন্টের অবস্থা স্বস্তিদায়ক থাকা এবং মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকা এবং আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়া। এ বিষয়গুলো এ ধরনের পরিস্থিতিতে ইতিবাচকভাবে দেখা যেতে পারে।

কিন্তু ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটের ক্ষেত্রে যে প্রত্যাশাগুলো ছিল, বিশেষ করে সাশ্রয়ী বাজেট হওয়া, প্রাধিকারগুলোর পরিবর্তন করা এবং বিশেষ পরিস্থিতির বাস্তবতায় নতুন প্রাধিকার নির্ধারণ করা, রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বাস্তবানুগ পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সাশ্রয়ী ব্যয় কাঠামো চিন্তা করার মতো বিষয়গুলো উপেক্ষিতই থেকে গেছে। অথচ বাজেটে উত্থাপিত হওয়ার আগে এ ধরনের বিষয়গুলো অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত হয়েছিল। সে বাস্তবতায় গত ১১ জুন অর্থমন্ত্রী যে বাজেটটি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করলেন, সেখানে এই প্রত্যাশাগুলোর পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন দেখতে পেলাম না।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের যে প্রত্যাশা ছিল, তার কিছু ঘাটতির প্রতিফলন বাজেটে রয়েছে। বিশেষ করে ফিসকাল ফ্রেম বা রাজস্ব কাঠামোকে বেশ কিছু প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থায় রেখে কাঠামো তৈরি করে বাজেটটি উপস্থাপিত হলো। সেদিক থেকে আমরা বাজেটটিকে দুটি ভাগ করে বিশ্লেষণ করতে পারি। একটি হলো : সামষ্টিক এবং রাজস্ব কাঠামো, আরেকটি হলো : খাতওয়ারি প্রাধিকার। আমরা দেখতে পেয়েছি যে সরকার অত্যন্ত বাস্তবানুগভাবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫.২ শতাংশ ধরেছে, যদিও অন্যান্য হিসাবে এটি আরও কম হওয়ার কথা। কিন্তু প্রশ্ন হলো সরকার ২০২০-২১ অর্থবছরে একই ধরনের স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করছে। সেক্ষেত্রে সরকারি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বছর শেষে স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাশা করছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ জিডিপি শতাংশের হিসাবে ১২.৭ শতাংশ ধরা হয়েছিল। আর ২০২০-২১ অর্থবছরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ জিডিপি হিসাবে ধরা হচ্ছে ২৫.৩ শতাংশ, প্রায় দ্বিগুণ। আমি যদি কাগজ-কলমেও হিসাব করি, তাহলে বর্তমান অর্থবছরে যে বিনিয়োগ হয়েছে তার থেকে বেশি বিনিয়োগ আগামী অর্থবছরে হতে হবে। সেক্ষেত্রে আগামী অর্থবছরে ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার মতো বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। আর বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধির প্রয়োজন হবে ১২৫ শতাংশ। কোন বিচারে বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটা তাই প্রশ্নসাপেক্ষ। আবার কোন হিসাবগুলো মেলাতে গিয়ে এ প্রক্ষেপণগুলো করা হয়েছে, সেটাও প্রশ্নের উদ্রেক করে। মোট কথা, ম্যাক্রো ইকোনমির যে মেজর সূচকগুলো ধরা হচ্ছে, সে সূচকগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এ থেকে যে অনুমিতি পাওয়া যায়, সেটি হলো সরকার ভাবছে যে, কভিড যেভাবে এসেছে, সেভাবে ২০২১ সালের প্রথমার্ধে তা চলে যাবে। এখানে সরকার ভি আকারের প্রবৃদ্ধি আগামী অর্থবছরে প্রত্যাশা করছে, যেটা এই অর্থবছরে আমরা হারিয়েছি। এই অনুমিতি নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে, যেখানে আমরা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে দেখছি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফেরত যাওয়ার মতো স্বাভাবিক পরিস্থিতি এখনো আমরা দেখতে পাচ্ছি না। বৈশ্বিক পর্যায়ে আমরা যে পণ্যগুলো রপ্তানি করি, সেই বৈশ্বিক বাজারগুলোও প্রস্তুত নয়। যে দেশগুলো ভেবেছিল তারা বাজার স্বাভাবিক করে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করবে, বিকিকিনি শুরু করবে, সেসব জায়গায় কভিড সংক্রমণ আবার বাড়ছে। সেদিক থেকে আমাদের পণ্য রপ্তানির জন্য আগামী ছয়মাস পরিস্থিতি অনুকূল না থাকার আশঙ্কা রয়েছে। উপরন্তু, এরকম বিনিয়োগের জন্য আমাদের দেশীয় বাজারেও মানুষের যে আয়চাহিদা বা ব্যয়ের সক্ষমতা কতটুকু থাকবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কেননা, পণ্যের বিক্রি না হলে উৎপাদনমুখী কারখানাগুলো তাদের উৎপাদন বৃদ্ধি করবে না। মনে রাখা দরকার যে এখন অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান আন্ডার ক্যাপাসিটিতে চলছে। তাদের প্রচুর পরিমাণ আনইউটিলাইজড ক্যাপাসিটি এখনই রয়েছে। সুতরাং, সেগুলো ব্যবহার না করে নতুন বিনিয়োগে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কারণ নেই। এজন্যই এসব প্রক্ষেপণ নিয়ে আমাদের আপত্তি রয়েছে।

এরকম একটা পরিস্থিতিতে ফিসকাল ফ্রেমের ব্যাপারে আমাদের প্রত্যাশা ছিল যে, সরকার আয়ের সাপেক্ষে ব্যয়ের ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দেবে। সিপিডির হিসাবে, যে অর্থবছরটি শেষ হতে যাচ্ছে, সে বছরে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হবে বলে ধরা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে এরকম পরিস্থিতি বা এরচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় রাজস্ব আদায়ে উচ্চ রাজস্ব নির্ধারণ করে উচ্চ ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা তৈরি করা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। সিপিডির হিসাবে বর্তমান অর্থবছরের হিসাবে আগামী অর্থবছরের রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫০ শতাংশ ধরা হয়েছে। সাম্প্রতিককালের হিসাবে এ ধরনের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি আদায় কখনোই সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশে সর্বোচ্চ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি আদায় হয়েছে ২৩ শতাংশ। এই আয়কাঠামোর ক্ষেত্রে বাস্তবানুগ না হওয়া এবং এরকম আয়কাঠামো মাথায় রেখে ব্যয়ের চিন্তা করা আমাদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ মনে হয়েছে। আগামী অর্থবছরে এর কতটুকু অর্জন করা যাবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আমাদের কাছে মনে হয়েছে, এরকম চ্যালেঞ্জিং সময়ে সরকার কোনো মন্ত্রণালয়কে বড় ধরনের অর্থচাপে রাখতে চায়। কিন্তু সমস্যা দেখা যাবে অন্য জায়গায়। যখন আগামী অর্থবছরে কম রাজস্ব আসতে শুরু করবে, তখন এই অর্থ দিয়ে বিভিন্ন খাতের প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ বরাদ্দ করা হবে ঠিক সে সময়ে প্রাধিকারমূলক খাতে অর্থ বরাদ্দ দিতে গিয়ে সরকার টানাপড়েনে পড়বে কি না সে প্রশ্ন থেকেই যায়। এরকম একটি আশঙ্কা আমাদের রয়েছে। কেননা, সব খাতকেই সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি বাজেটে রাখা আছে। বাজেটে চারটি খাতকে প্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। খাতগুলো হলো : স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, কৃষি, কর্মসংস্থান এবং শিক্ষা। এ জায়গাগুলোতে সরকার যথেষ্ট পরিমাণ অর্থছাড় করতে পারবে কি না, সে অনিশ্চয়তা থেকে যায়। সেক্ষেত্রে জরুরি বিষয়গুলোতে অর্থছাড়ের বিষয়টি বাস্তবায়নযোগ্য হবে কি না সেটিও প্রশ্নসাপেক্ষ। এক্ষেত্রে বিবেচনা করা দরকার, স্বাভাবিক সময়ে যেসব বিষয় জরুরি মনে হয়, সংকটকালীন তা প্রাধিকারের উপযোগী নাও হতে পারে। কিছুটা পরে হলেও সেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে অসুবিধা নেই। যেহেতু স্বাভাবিক সময়ে পণ্যের যে চাহিদা সেটি এখন নেই। সুতরাং, স্বাভাবিক সময়ের প্রাধিকারগুলোর পরিবর্তন করার যৌক্তিকতা সরকারের ছিল। কেননা, অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকার আগামী বছর একটা চাপে থাকতে পারে। এক্ষেত্রে সিপিডি থেকে আমরা বলেছিলাম কিছু ফাস্ট ট্রাকের প্রকল্প  যেগুলোর ডিমান্ড এখন নেই, সেগুলোতে প্রাধিকার এখন কম দিতে।       (আগামীকাল সমাপ্য)

লেখক

গবেষণা পরিচালক, সিপিডি

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত