‘চীন-যুক্তরাষ্ট্রের শীতল যুদ্ধ বিশ্বের জন্য করোনার থেকেও বড় হুমকি’

আপডেট : ২১ জুন ২০২০, ১০:৪৮ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রে ও চীনের মধ্যে একটা শীতল যুদ্ধ যেভাবে ঘনিয়ে উঠছে সেটা করোনাভাইরাসের চেয়েও বিশ্বের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদ জেফ্রি স্যাক্স 

বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন মহামারির পর নেতৃত্ববিহীন টালমাটাল পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী। এতে দুই পরাশক্তির মধ্যে বিরোধ এ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলবে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এই বৈরিতার জন্য মার্কিন প্রশাসনকেই দায়ী করেছেন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক স্যাক্স। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে বিভাজন সৃষ্টিকারী একটা শক্তি, সহযোগিতার নয়। 

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, চীনের সাথে নতুন করে একটা শীতল যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। যদি এটাই তাদের লক্ষ্য হয়ে থাকে, তাহলে আমরা কখনই স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরে যাব না। বরং এর থেকে আরও গভীর বৈরিতার পরিস্থিতি এবং আসলেই বিশাল একটা বিপজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি হবে।

অধ্যাপক স্যাক্স এই সতর্কতা দিয়েছেন এমন এক সময়ে যখন চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুধু বাণিজ্য নিয়ে নয়, বরং অনেক বিষয়ে উত্তেজনা বাড়ছে।

এ সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি আইনে সই করেছেন যাতে চীনে উইঘুর মুসলিমদের নিপীড়নের জন্য দায়ী চীনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তোলার একটা উপায় হিসেবে চীন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়াকে উৎসাহিত করেছে বলে তিনি মনে করেন।

ট্রাম্প প্রশাসন চীনা কোম্পানিগুলোকেও তার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করেছেন, বিশেষ করে চীনের বিশাল টেলিযোগাযোগ সংস্থা হুয়াওয়ে। মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য, চীন মার্কিন ভোক্তাদের ওপর গোয়েন্দাগিরি করার জন্য এই কোম্পানিকে কাজে লাগাচ্ছে। যদিও চীনা কর্তৃপক্ষ এবং হুয়াওয়ে এই দাবি অস্বীকার করেছে

তবে চীন এবং হুয়াওয়ের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই কঠোর মনোভাব তার আসন্ন নির্বাচনে আবার জিতে আসার একটা রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে এমনটা মনে করেন তার সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন। সম্প্রতি প্রকাশিত বোল্টনের লেখা একটি বই নিয়ে এখন তুমুল আলোড়ন চলছে, সেখানে ট্রাম্পকে নিয়ে বোল্টন তেমনটাই উল্লেখ করেছেন।

অধ্যাপক স্যাক্সও এ বিষয়ে একমত যে, হুয়াওয়েকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র শুধু সাদাসিধে নিরাপত্তা উদ্বেগ থেকে কড়া কড়া মন্তব্য করেনি। ব্যাপারটা অত সহজ নয়।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ফাইভ-জি প্রযুক্তির দৌড়ে হেরে গেছে, নতুন ডিজিটাল প্রযুক্তির একটা উল্লেখযোগ্য অংশ হল ফাইভ জি। আর এক্ষেত্রে হুয়াওয়ে ক্রমশই বিশ্ব বাজার দখল করে নিয়েছে।

এই বিশেষজ্ঞে আরও বলেন, হুয়াওয়ে বিশ্বের জন্য একটা হুমকি-আমার মতে যুক্তরাষ্ট্রের এই বক্তব্য বানোয়াট। যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদেশগুলোকে এটা বোঝাতে উঠেপড়ে লেগেছিল, যাতে তারা হুয়াওয়ের সঙ্গে সবরকম সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়। 

তবে চীন শুধু যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই সংঘাতে জড়িয়েছে তা নয়। এখন ভারত-চীন সীমান্তেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে মারত্মক সীমান্ত সংঘাতে অন্তত বিশ জন ভারতীয় সৈন্য মারা গেছে।

চীন ইতোমধ্যেই পাকিস্তান, মিয়ানমার, শ্রীলংকা এবং নেপালে বড় বড় অর্থকরী প্রকল্পে আর্থিক সহযোগিতা করছে। আর এই সবগুলো দেশই ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। চীন যেভাবে ওই অঞ্চলে তার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে, যেটা পাকিস্তানকে বাদ দিলে একসময় ভারতেরই আয়ত্তে ছিল, সেটা অবশ্যই ভারতের জন্য আশংকার।

অধ্যাপক স্যাক্স স্বীকার করছেন যে, এশিয়ায় ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও চীনের এই উত্থান উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে, যদি না তারা এই আশংকা দূর করার চেষ্টা করে যে, তারা শান্তিপূর্ণ ও সহযোগিতার পথে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাইছে।

তিনি বলেন, আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন, এমন একটা সত্যিকার আশংকা দূর করার জন্য চীন উদ্যোগ নেবে বলে আমি বিশ্বাস করি কিনা- আমি বলব হ্যাঁ।

জেফ্রি স্যাক্স বলেন, আসলে বিষয়টা কিন্তু পুরো চীনের হাতে। চীন যদি সহযোগিতা করে, চীন যদি কূটনীতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিকতায় অংশগ্রহণ করে, অন্য কথায়- চীন যেহেতু খুবই শক্তিশালী একটা রাষ্ট্র এবং সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করতে আগ্রহী, আমার মনে হয়- এশিয়ার জন্য সেটা একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যত নিয়ে আসবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত