পালিত পশুদেরও ঈদ আয়োজনের ভাগ দিতেন মওলানা ভাসানী

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২০, ১০:১৭ পিএম

বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক পুরুষ মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। 

ছয় দশক ধরে অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে বাংলার মানুষের মন জয় করেছিলেন মওলানা ভাসানী। তার আন্দোলন ছিল সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতা ও সামন্তবাদের বিরুদ্ধে।

তার রাজনৈতিক দীক্ষা হয়েছিল ব্রিটিশ বিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতা চিত্তরঞ্জন দাশের কাছে। আর স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বহু ঘটনার কেন্দ্রেই ছিলেন মওলানা ভাসানী, যাকে তার ভক্তরা "মজলুম জননেতা" বলে সম্বোধন করতেন।

জীবনের শেষ সময়ে তিনি থাকতেন টাঙ্গাইলের সন্তোষে। তাকে ঘিরে থাকত ভক্ত-মুরিদরা। তাদের বয়ানে পাওয়া যায় মওলানা ভাসানীর বিভিন্ন স্মৃতি।

সেসব থেকে জানা যায়, মওলানা ভাসানী তার ঈদের আয়োজন থেকে পালিত পশুদেরও বঞ্চিত করতেন না। 

১৯৭৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সাপ্তাহিক হক কথায় প্রকাশিত 'তাঁহার ঈদ' শিরোনামের লেখা থেকে জানা যায়, 'নামাজ হইতে আসিয়া হুজুর কোরবাণীর হুকুম দিলেন। ময়মনসিংহের সৈয়দ শরফুদ্দীন হাবীব একটি গরু পাঠাইয়াছিলেন। মুরিদদের কেউ কেউ খাসী দিয়াছিলেন। সব জবেহ হইল। হুজুর কাহাকেও গোশত দেন না। পাক করাইয়া একসাথে সবাইকে খাওয়াইয়া দেন। পাকের মশলার অভাবে অনেক গরীব গোশত বিক্রয় করিয়া দেয়। অথবা কোন রকম সিদ্ধ করিয়া খায়। তাই হুজুর খিচুড়ী ও গোশত খাওয়ান। হুজুরের বাড়িতে একটা কুকুর থাকিত। এক টুকরা ভাল গোশত কুকুরটাকে নিজেই খাইতে দিলেন। বলিলেন, নাড়ি-ভুড়ি তো খাবেই। কিন্তু কোরবানীর গোশতের হিস্যা হিসাবে এইটা। দুপুরে হাজার হাজার লোকের জমায়েত হইল। সবার হাতে কলাপাতা। দশের হাতে শীগগীর পাকও হইয়া গেল। গরু খাসী যাহা পাক হইল সবই খাওয়ানো হইল। আমরাও কিছু খাইতে পাইলাম বটে। রাত্রে অবিশ্বাস্য হইলে সত্য- হুজুর ও আমরা ডাল ভর্তায় ভাত খাইলাম। খাইতে বসিয়া হুজুর বলিলেন, একটা ভুল হইয়া গেল রে। বাবুর মার (স্ত্রী) লাগি আমাদের কোরবানীর তরকারি তো রাখা হইল না। তারপর নিজেই বলিলেন, ঠিক আছে, কাল নানান জায়গা তনে (থেকে) তো তরকারি আসবই।'

একই লেখার অপর একটি অংশে বলা হয়, ''সামাজিক ও ধর্মীয় অনেক পর্ব হুজুরকে পালন করিতে দেখিয়াছি। প্রত্যেকটিতে কিছুনা-কিছু থাকে যাহা সাধারণের জন্য অভাবিতপূর্ব। পর্বগুলোতে হুজুর বরাবর বাড়িতে থাকার চেষ্টা করেন। পরিজন ও মুরিদদের লইয়া তাহা পালন করা কর্তব্য মনে করেন।

শখের গাভীগুলির চাহিদা মিটানো হইতে হুজুর ঈদের প্রস্তুতি শুরু করেন। গাভীগুলি কোন ফর্দ পেশ করিয়াছিল তাহা নহে। কিন্তু ঈদের বিশেষত্ব হইতে বাড়ির পালিত পশুকেও বঞ্চিত রাখা যাইবে না- হুজুরের ব্যক্তিগত মত তাহাই। সেই দিনগুলিতে গরুর সবচেয়ে স্বাদের খাবার ছিল খেসারী কলাইয়ের ঘাস। কাঁচা থাকিতে অনেক কৃষক গোটা কলাই ফসল বিক্রয় করিয়া ফেলে। বেশ খোঁজাখুঁজি করিয়া হুজুর এমনি একটি ফসল খরিদ করেন। ঈদের আগের দিন বোঝাই করিয়া সেইগুলি বাড়িতে আনা হয়। লক্ষ্যণীয় ব্যাপার, সেইদিনই হুজুর গাভিগুলিকে কলাই খাইতে দিলেন না। ঈদ উপলক্ষ্যে আনা। তাই পরের দিনের জন্য রাখিয়া দেয়া হইল। জনৈক মুরিদ রস করিয়া আমাকে বলিয়া ছিলেন, ‘হুজুরের পালের গরু হইয়া জন্ম নেওয়াও ভাগ্যের কথা’।''

কোরবানীর ঈদ বিষয়ে একই লেখায় বলা হয়, 'কাগমারীর পীর শাহজামানের (রঃ আঃ) মাজার প্রাঙ্গণে ঈদের জামাত হইবে। ছোট্ট মাঠ। আশপাশের গ্রামের মানুষ জমায়েত হয়। হাজির থাকিলে হুজুরই নামাজ পড়ান। যথাসময়ে এইবারেও তিনি পৌঁছিয়া গেছেন। নাতিদীর্ঘ একটা ভাষণ দিলেন। বলিলেন, যাহারা মনে করে, আল্লাহ আমাদের নিকট পশু কোরবানী যাচ্ঞা করেন তাহারা ইসলামের কিছুই বুঝে নাই। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমাদের খাহেশকে ত্যাগ করাই আসল কোরবানী। যাহারা ত্যাগী তাহারাই চরিত্রবান। সৃষ্টির কল্যাণে তাহাদের জীবন-উৎসর্গ আল্লাহ মহাবিচারের দিন গ্রহণ করিবেন।'

তথ্যসূত্র: মওলানা ভাসানীর ফেইসবুক পেজ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত