দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটের মুখচ্ছবি বদলে দেওয়া এডি বার্লো

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২০, ০৭:৫০ এএম

এডি বার্লো। বর্ণবৈষম্যের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকার হারিয়ে যাওয়া সোনালি প্রজন্মের একজন। মাত্র ২১ বছরে টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক। ১৯৭০ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা নিষিদ্ধ হওয়ার আগে খেলতে পেরেছিলেন ৩০ টেস্ট। ৪৫.৭৪ গড়ে ২৫১৬ রান করেছেন। উইকেট নিয়েছেন ৪০টি।

সত্যি বলতে এই টেস্ট পরিসংখ্যান দিয়ে এডি বার্লোকে  চেনা সম্ভব নয়। অথচ তিনি প্রজন্মের সেরা ছিলেন। টেস্টে সব সময় ওপেন করতেন। কার্যকর আউট সুইং বোলার হিসেবেও নাম ছিল। সিøপে দুর্দান্ত ফিল্ডিং করতেন। মাঠে তার স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণশক্তি দেখে জীবনীকার রডনি হার্টম্যান লিখেছিলেন ‘ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং প্রতিভা ছিল বার্লোর সহজাত। হাতের পেশি ফোলানো দেখলে মনে হতো পেশাদার মুষ্টিযোদ্ধা।’

বার্লোর অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের প্রমাণ আছে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে। ২৮৩ ম্যাচে প্রায় ৪০ গড়ে ১৮ হাজারের ওপর রান করেছেন। সেঞ্চুরি আছে ৪৩টি। এর সঙ্গে ৮৬ হাফসেঞ্চুরি আর ৫৭১ উইকেট যোগ করলে এডি বার্লোকে প্রজন্মের সেরা অলরাউন্ডার বলতেই হবে।

চার্লস হ্যামিল্টনের ফিকশনাল স্কুলবয় উইলিয়াম বানটারের মতো দেখতে হওয়ায় বার্লো ক্রিকেটের ‘বানটার’ নামে পরিচিতি পান। প্রথম জীবনে শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু উইটস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভুগোল নিয়ে পড়ার সময় ক্রিকেটের প্রতি টান অনুভব করেন। ১৯৬০ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে ট্রান্সভাল বি দলের পক্ষে অভিষেক। প্রথম ম্যাচেই করেছিলেন ৭২ রান। পরের বছর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ডারবানে টেস্ট অভিষেক। প্রথম ম্যাচে ব্যর্থ হয়েছিলেন। জোহানেসবার্গে বক্সিংডে টেস্টে করেন ৪৭ ও ৪৫ রান। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে পরের তিন টেস্টে তিনটি হাফসেঞ্চুরি। এরপর ১৯৬২ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে এমন ক্রিকেট খেলেছিলেন যে স্বয়ং ডন ব্র্যাডম্যানের রেকর্ড হুমকির মুখে পড়েছিল। সেই সফরেই তারকা হয়ে ওঠেন ২২ বছরের যুবক। রিচি বেনোর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৫ টেস্টে করেছিলেন ৬০৩ রান। ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচের রান ধরলে ১৫২৩। ডনের এক মৌসুমে ১৬৯০ রানে গড়া ৩৫ বছরের পুরনো রেকর্ডের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন বার্লো। ১৯৬৩-৬৪ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়া সফরের পর তিন টেস্টের সিরিজ খেলতে নিউজিল্যান্ড গিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। দুই সফরে ১৯০০ রান করেন বার্লো।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম চার টেস্টে তিন সেঞ্চুরি করেছিলেন। প্রথম সেঞ্চুরি করেন ব্রিসবেনে। দ্বিতীয়টি মেলবোর্নে। সিডনির তৃতীয় টেস্টে রান পাননি। ৬ ও ৩৫ রানে আউট হন। এরপর অ্যাডিলেডে প্রথম ইনিংসে ২০১ করার পর ৪৭ রানে অপরাজিত ছিলেন। অ্যাডিলেডে সেঞ্চুরি করেছিলেন গ্রায়েম পোলকও। চতুর্থ উইকেটে বার্লো-পোলক জুটি ৩৪১ রান তোলে। বল হাতে নিয়ে ৫ ওভারে ৬ রানে ৩ উইকেট নেন। ৮২ রানের টার্গেটে খেলতে নেমে ৮ উইকেটের ঐতিহাসিক জয় পেয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা।   

’৬৪-তে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করেছিল ডেক্সটার-বয়কটদের ইংল্যান্ড। জোহানেসবার্গে দ্বিতীয় টেস্টে করেন ৭১ ও ১৫ রান। কেপটাউনে খেলেন ১৩৮ রানের ঝলমলে ইনিংস। দ্বিতীয় ইনিংসে করেন ৭৮ রান। পরের দুই টেস্টে ৯৬, ৪২, ৬৯ ও ৪৭ রান করেন বার্লো। বর্ণবৈষম্যের কারণে ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হওয়ার আগের বছর কেপটাউনে তিনি শেষ টেস্ট সেঞ্চুরিটি করেছিলেন। তার ১২৭ রানের ইনিংসটির কারণে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৭০ রানে জয় পেয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। তখন আর তিনি ওপেনার নন। আলি বাকেরের দক্ষিণ আফ্রিকা দলে তখন ওপেন করেন ব্যারি রিচার্ডস।

খেলা ছাড়ার পর প্রগ্রেসিভ ফেডারেল পার্টির হয়ে রাজনীতিতে নামেন বার্লো। সফল হতে পারেননি। অল্পের জন্য পার্লামেন্ট নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন। এরপর ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় দলের কোচ হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বব উলমারের কাছে হেরে বিদায় নেন। পাঁচ বছর পর বার্লো বাংলাদেশের কোচ হয়েছিলেন। তার তত্ত্বাবধানেই টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির পথে যাত্রা শুরু করে টাইগাররা। তবে টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তির সময় বাংলাদেশের কোচ ছিলেন না বার্লো। ব্রেন স্ট্রোকের পর পক্ষাঘাতে তিনি তখন হুইলচেয়ারে বন্দি।

বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান বলেন, ‘আইসিসির মঞ্চ থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আমাদের ক্রিকেটকে নেওয়ার পেছনে তিনিই ছিলেন মূল কারিগর। দুর্ভাগ্য আমরা তাকে খুব অল্প সময় পেয়েছি। বেশি সময় পেলে ক্রিকেটের লম্বা সংস্করণে কীভাবে খেলতে হয় তা শেখা যেত।’

শেষ জীবন কাটিয়েছেন তৃতীয় স্ত্রী কেলির সঙ্গে নর্থ ওয়েলসে। দীর্ঘ রোগভোগের পর ২০০৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়। জন্ম ১৯৪০ সালের ১২ আগস্ট প্রিটোরিয়ায়। এডি বার্লো বেঁচে ছিলেন ৬৫ বছর। এর ৪২ বছর ক্রিকেট খেলেছেন। এবং মাইক প্রক্টরের ভাষায়, ‘দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটের মুখচ্ছবি বদলে দিয়েছেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত