নিগ্রহের শিকার তরুণীকে আত্মহত্যা থেকে বাঁচাতে শ্বাসরুদ্ধ অভিযান

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২০, ১০:৩৬ পিএম

বুধবার বিকেল সোয়া ৬টা। রাজধানীর গুলশান নিকেতনের বি ব্লকের ৪ নম্বর রোডের দুই পাশে পুলিশের অবস্থান। বন্ধ ছিল যানবাহন ও পথচারী যাতায়াত। চারপাশের উৎসুক জনতার ভিড়। সবার দৃষ্টি ৯১ নম্বর ১০তলা ভবনের ছাদ।

লোকজন বলাবলি করছিলেন, এক ছাত্রী  আত্মহত্যার হুমকি দিয়ে বহুতল ভবনের ছাদের ব্যালকনিতে অবস্থান নিয়েছে। ভবনের ছাদের দিকে তাকাতেই দেখা গেল একটা পা ঝুলছে।  ভবনের নিচের রাস্তায় প্রস্তুত অ্যাম্বুলেন্স। তটস্থ ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা তড়িঘড়ি মেয়েটির অবস্থান বরাবর নিচে এয়ার কুশন(বাতাসের বিছানা) তৈরিতে ব্যস্ত ছিলেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান,  আবাসন ব্যবসায়ীর মেয়ে অর্পি (১৯) পারিবারিক বৈষম্য ও অবহেলার অভিযোগ তুলে বহুতল ভবনের ১০তলার ছাদের ব্যালকনি থেকে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান। পরবর্তীতে নানা কৌশলে তাকে উদ্ধার সম্ভব হয়েছে।

ভবনের গেটে দায়িত্ব পালনকারী নিরাপত্তা প্রহরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, মেয়েটির নাম অর্পি (১৯)। ভবনের এ-১ নম্বর ফ্ল্যাটে থাকেন। তার বাবা-মা ও দুই ভাই আছেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে কোনো এক সময় আত্মহত্যার জন্য ছাদের ব্যালকনিতে অবস্থান নেন।

আত্মহত্যা চেষ্টার কারণ জানতে চাইলে  তিনি বলেন, ওপরে অনেকেই আছেন, সেখানে যান।

তার কথামতো লিফট দিয়ে ৮ম তলায় নেমে আরেক সিঁড়ি ভাঙতেই দেখা গেল, মাথায় টুপি, পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত মধ্যবয়স্ক এক ব্যক্তি হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছেন সিঁড়ির শেষ মাথায়। কাঁপছিলেন অজানা শঙ্কায়। এই প্রতিবেদকের পরিচয় পেয়ে তিনি ঠোঁটে আঙুল চেপে কথা বলতে বারণ করেন। তার পাশেই ছাদের এক কোণে একাধিক নারীকে দাঁড়িয়ে তসবি হাতে দোয়া-দরুদ পড়তে দেখা গেল।

ঘটনা প্রসঙ্গে  জানতে চাইলে তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওই যে দেখেন মেয়েটি কোথায় বসে আছে। একটু এদিক-সেদিক হলেই মেয়েটির প্রাণ বেরিয়ে যাবে।

কারণ হিসাবে তারা বলতে লাগলেন, মেয়েটি চিৎকার করে  তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুনেছি। বাবা-মা ও দুই ভাইয়ের ওপর তার  প্রচণ্ড ক্ষোভ। পরিবারের কেউ তার কাছাকাছি গেলেই নিচে লাফিয়ে পড়ার হুমকি দিচ্ছে। এ জন্য তারাও দূরে রয়েছেন।

একই ভবনের ওই নারী বাসিন্দারা আরো জানান,  মেয়েটির বাবা পেশায় আবাসন ব্যবসায়ী। ভবনের প্রথম ফ্লোরেই তার নিজের ফ্ল্যাট। দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে অর্পি সবার ছোট। খুবই মেধাবী। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট (ও লেভেল) পাস করেছে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে। মালয়েশিয়ার কোনো এক ইউনিভার্সিটির স্কলারশিপ পেয়ে সেখানে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে যেতে পারছিলেন না।

ভবনের বাসিন্দা আরেক নারী  বলেন, দুপুরের দিকে হঠাৎ করে মেয়েটির মা কান্না করে বলতে থাকেন, তার মেয়ে আত্মহত্যার জন্য ছাদের দেয়াল টপকে বাইরের কার্নিশের মতো জায়গায় চল গেছে। সেখান থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ার  হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।

খবর পেয়ে ভবনের বাসিন্দারা ছাদে ওঠেন। উদ্ধারের জন্য পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে অনেকেই মেয়েটি বুঝিয়ে সেখান থেকে ফিরে আসার অনুরোধ করেন। মেয়েটির বাবা ও মা দুজনেই মেয়েটির কাছে হাতজোড় করে বারবার ক্ষমা চান। আর কখনো তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দেন। তবুও মেয়েটি শান্ত হচ্ছিল না। চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘তোমরা আমাকে সব সময় ছোট করেছ। ঠিকমতো যত্ন নাওনি। শুধু ব্যবসা নিয়ে থেকেছ। ভাইদের যেভাবে যত্ন নিয়েছ, আমার ক্ষেত্রে কিছুই করোনি’।

মেয়েটির আরেক স্বজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাসায় মেয়েটির ফুপাতো বোন থাকত। সকালের দিকে সেই বোনকে চা তৈরি নিয়ে ধমক দেওয়ায় মা-মেয়ের তর্ক বাঁধে। মেয়েটি বলে ওঠে, তোমরা ওকে কাজের মেয়ে পেয়েছ নাকি? যখন-তখন কাজের জন্য খাটিয়ে মারো। এসব কথার জের ধরেই প্রথমে মা, পরে দুই ভাইয়ের ভর্ৎসনার শিকার হয় অর্পি। সবাই মিলে তাকে গালমন্দ করলে সবার অজান্তে মেয়েটি ছাদে উঠে ওই ব্যালকনিতে অবস্থান নেয়।

একাধিক প্রতিবেশী জানান,  মেয়েটির মা খুঁজতে খুঁজতে ওই ব্যালকনিতে পেয়ে সবাইকে জানায়। তবে  মেয়েটি তার পরিবারের কাউকে দেখলেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতে থাকে। লাফিয়ে পড়ার হুমকি দিতে থাকে। এরই মধ্যে খবর পেয়ে মেয়েটির খালু পেশায় অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত হয়ে অর্পিকে বোঝাতে থাকেন।

ঘটনাস্থলে পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য উপস্থিত হন বেসরকারি টেলিভিশনের সাংবাদিক সুবর্না আক্তার।

তিনিও মেয়েটিকে নানাভাবে বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করেন। সেখান থেকে ফেরানোর জন্য নানাভাবে চেষ্টা করতে থাকেন। এরই মধ্যে মেয়েটির খালুর মোবাইল ফোন দিয়ে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেন ওই নারী সাংবাদিক। এরপর ধীরে ধীরে মেয়েটি শান্ত হয়ে পড়ে। প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা ওই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যালকনিতে অবস্থানের পর মেয়েটির  খালু, এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও ওই নারী সাংবাদিকের হাত ধরে নিরাপদ স্থানে চলে আসেন। এমন পরিস্থিতি থেকে বাবা-মা ও খালু মেয়েকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে উদ্ধারকর্মীদের ধন্যবাদ জানান।

সাংবাদিক সুবর্না আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, মেয়েটি তার পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে নিগ্রহের শিকার হয়েছে। মা ও বড় দুই ভাইয়ের ধারাবাহিক বৈষম্য ও নেতিবাচক আচরণের কারণে সে আর বাঁচতে চায় না বলে জানিয়েছে। তুচ্ছ কারণে তাকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। এসব আচরণ সহজভাবে মেনে নিতে না পারার কারণে মেয়েটিকে মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেছে। যার কারণে মেয়েটি আরও বেশি ডিপ্রেশনে ভুগেছেন।

অর্পির বরাত দিয়ে সুর্বনা আক্তার আরো বলেন, যেখানে মেয়েটির দুই ভাইয়ের চিকিৎসার দরকার ছিল সেখানে তা না করে মেয়েটির ওপর তারা টর্চার করেছে বলে জানিয়েছে। এটার প্রমাণও হাতেনাতে পাওয়া গেছে। কারণ মেয়েটি উদ্ধার হওয়ার পর ক্যামেরা দেখে অর্পির বড় ভাই যেভাবে তেড়ে এসেছিলেন তাতে তাকে অ্যারোগেন্ট মনে হয়েছে।

একই কথা বলেছেন সেখানে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও। তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, মেয়েটির পরিবারের সদস্যদের আচরণগত সমস্যা আছে বলে মনে হয়েছে। যার কারণে এই বয়সী একটি মেয়ে এমন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে চলে গিয়েছিল।

যদিও মেয়েটিকে বাঁচানোর জন্য তাদের সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছিল বলে জানান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত