পঞ্চগড়ে ভারতীয় বাঘের আতঙ্কে রয়েছে কয়েকটি গ্রামের কয়েক হাজার বাসিন্দা। এক মাস ধরে গরু-ছাগল খেয়ে ফেলার ঘটনায় আতঙ্ক আর ভয়ে দিন কাটছে তাদের। বাঘের আক্রমণ থেকে বাঁচতে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে গ্রামের মানুষ।
পঞ্চগড় সদর উপজেলা ও তেঁতুলিয়া উপজেলার সাতমেরা ও দেবনগড় ইউনিয়নের মুহুরিজোত, সাহেবীজোত, উষাপাড়া ও বাদিয়াগজ গ্রামের কেউ কেউ বাঘ দেখেছেন বলে দাবি করেছেন। আতঙ্কিত গ্রামবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে ওই এলাকায় চলছে প্রশিক্ষিত বনকর্মীদের অভিযান। বাঘের পায়ের ছাপ দেখতে পেলেও এখন পর্যন্ত তারা বাঘ দেখতে পাননি।
জেলা প্রশাসন ও সামাজিক বন বিভাগ অথবা সরকারের অন্য কোনো সংস্থা যদি বাঘ উদ্ধারে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা না নেয় তাহলে সড়ক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে গ্রামবাসী। এ খবর পেয়ে সামাজিক বন বিভাগের উদ্যোগে ওই এলাকায় মাইকিং করে গ্রামবাসীদের রাতে সচেতন থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার পঞ্চগড় সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরিফ হোসেন, পঞ্চগড় সদর থানা পুলিশের উপপরিদর্শক শাহীনুজ্জামান, সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুর রহমান, পঞ্চগড়ের ফরেস্ট রেঞ্জার আব্দুল হাইসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
সরেজমিন গিয়ে জানা গেছে, ভারতীয় একটি চিতাবাঘ তার দুটি বাচ্চাসহ ভারত সীমান্তের একটি ব্রিজের নিচ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বিষয়টি সীমান্তবর্তী এলাকার লোকজনদের অবহিত করেন। এরপর ওই এলাকার লোকজনও আকারে লম্বা ও গায়ে কালো গোল ছাপ দেখে বাঘগুলো চিতাবাঘ বলে ধারণা করছেন।
গ্রামবাসী বলছেন, দুটি বড় ও তিনটি বাচ্চা বাঘ রাত হলেই বের হয়ে গ্রামের দিকে চলে আসে। গত এক সপ্তাহ থেকে বাঘের আনাগোনা বেড়ে গেছে। প্রয়োজন ছাড়া কেউ হাট-বাজারে যাচ্ছেন না। গেলেও দল বেঁধে যাচ্ছেন। এখন রাতে শান্তিতে ঘুমাতেও পারছেন না তারা। প্রতিটি বাড়িতে বড় টর্চ লাইট রাখা হয়েছে। রাত জেগে বাঘ পাহারা দিচ্ছেন গ্রামের মানুষ। ওই এলাকার চার একর জমির পুরোনো চা বাগানের ঝোপে বাঘ লুকিয়ে রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। ওই চা বাগান এলাকায় শত শত উৎসুক মানুষের ভিড়। দূর-দূরান্ত থেকে তারা বাঘ দেখতে এসেছেন অনেকে। কেউ কেউ চা বাগানের ভেতরে ঢুকেও বাঘের দেখা পাওয়া চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন স্থানে বাঘ ধরতে ফাঁদ পেতে রাখা হয়েছে।
দেবনগড় ইউনিয়নের উষাপাড়া গ্রামের আবুল কালাম জানান, বুধবার বিকেলে আমার একটি গরুকে বাঘ গলায় কামড়ে ধরে হত্যা করে। আমি নিজেই চা বাগানে চিতা বাঘকে দেখেছি এবং সে সময় আমার চিৎকারে লোকজন ছুটে আসে। অন্যরাও বাঘ দেখেছে। বাঘটি আমার দিকে তেড়ে আসছিল কিন্তু চা বাগানের ডালপালার কারণে কাছে আসতে পারেনি। আমার ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার গরুটি মেরে ফেলে বাঘটি। এর আগে আরেকটি ছাগলের ওপর হামলা করে বাঘ।
সাহেবীজোত গ্রামের হাজিবউদ্দিন নামে একজন জানান, আমরা কয়েকটি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ বাঘ আতঙ্কে ভয়ে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছি। এ এলাকায় বেশ কয়েকবার আমরা বাঘের আনাগোনা দেখেছি।
মুহুরীজোতা গ্রামের রুবেল রানা জানান, আমাদের এলাকায় এখন বেশ কিছু এলাকায় জঙ্গলসহ পুরোনো চা বাগান রয়েছে। বাঘ আসলে এ এলাকায় ঘাপটি মেরে থাকে। ভয়ে আমরা স্বাভাবিক চলাচল করতে পারছি না। সন্ধ্যার পর কেউ বের হয় না।
পঞ্চগড় ফরেস্ট রেঞ্জার আব্দুল হাই জানান, প্রধান বন সংরক্ষকের নির্দেশে ঢাকা থেকে আসা ভেটেরিনারি সার্জনসহ ৪ সদস্যের একটি দল ও আমাদের স্থানীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়ে বাঘ ধরার কাজ শুরু হয়েছে।
পঞ্চগড় সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আরিফ হোসেন জানান, কিছু প্রত্যক্ষদর্শী এবং গরুকে হত্যা করার মালিক ও বাঘের পায়ের ছাপ থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এ এলাকায় বাঘের অস্তিত্ব রয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক এ বিষয়টি সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন। এ ছাড়া আমরা বন বিভাগের সমন্বয়ে বাঘটিকে ধরার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আমরা এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করেছি। স্থানীয়দের প্রয়োজন ছাড়া বাড়ি থেকে বের না হওয়ার জন্য অনুরোধ করেছি।
বাঘের আক্রমণে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের সহযোগিতা করার কথাও বলেছেন তিনি।
দিনাজপুর সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুর রহমান জানান, এখানে বাঘ একটি গরুকে হত্যা করেছে। জেলা বন কর্মকর্তাকে বাঘ ধরার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঢাকা থেকে ৪ সদস্যের একটি অভিজ্ঞ টিম পাঠানো হয়েছে। তবে বাঘগুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি বাঘগুলোর অবস্থান নিশ্চিত হয়ে জীবিত অবস্থায় ধরতে।
