সীমিত ওভারে অনন্য মালিঙ্গা

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২০, ০২:২৯ এএম

লাসিথ মালিঙ্গার একটাই ট্রেডমার্ক নিখুঁত ইয়র্কার। টেস্ট বেশি খেলেননি। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। এমনই প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন যে, লোকে তাকে ‘ওয়ান অব দ্য গ্রেট লিমিটেড-ওভার্স বোলার’ মনে করে। আজ তার ৩৭তম জন্মদিন।

অপ্রচলিত অ্যাকশনের পেস বোলিংয়ে মালিঙ্গা অনন্য। ইচ্ছেমতো ইনসুইং ইয়র্কার দিতে পারেন। গতি-বৈচিত্র্যের কারণে যা ব্যাটসম্যানকে আউট করতে অব্যর্থ। সঙ্গে শরীর বরাবর ফুঁসে ওঠা বাউন্সার তো আছেই। সব মিলিয়ে মালিঙ্গার মতো স্ট্রিট স্মার্ট ক্রিকেটার দ্বিতীয়টি নেই।

মহেন্দ্র সিং ধোনির মতো মালিঙ্গাও টেনিস বলের প্রোডাক্ট। শ্রীলঙ্কার অপ্রচলিত কোচিং সিস্টেমের পোস্টার বয়। কিশোর বয়সে গলের উত্তরে রথগামা বিচে চুটিয়ে টেনিস বলের ক্রিকেট খেলতেন। এরপর চম্পকা রামানায়েকের নজরে পড়েন। মালিঙ্গা এখনো সেই ঘটনা ভুলতে পারেননি, ‘মনে করতাম টেনিস বলেই আমি বোলিংটা ভালো করি। তখনো চামড়ার বল হাতে নেইনি। কোনো ধারণাই ছিল না। জানতাম না শ্রীলঙ্কার জাতীয় দলে খেলতে হলে কতটা ভালো হতে হয়। চামড়ার বল হাতে নেওয়ার দশ মাস পর চম্পকার সঙ্গে আমার দেখা হয়। এরপর থেকে তিনি আমার জন্য অনেক করেছেন। চামড়ার বলে খেলতে শুরু করার সময় আমি কিছুই জানতাম না। বল কন্ট্রোল কী জিনিস, রিভার্স সুইং কীভাবে করতে হয়, কেমন করে গতি-বৈচিত্র্য আনতে হয়, এর সব কিছুই আমি চম্পকা স্যারের কাছে শিখেছি।’ মালিঙ্গা জানান, ‘আমি বেশি স্কুল ক্রিকেট খেলার সুযোগ পাইনি। শিখতেও পারিনি। প্রথম দিন চম্পকা স্যার আমায় বলেছিলেন, যত জোরে পারো সোজা বল করে যাও। আমার অ্যাকশনে পরিবর্তনের কোনো চেষ্টাই করেননি তিনি। এখনো দেখা হলে প্রথম দিনের মতোই বলেন, খুব জোরে আর সোজা বল করে যাও। আমার মনে হয়, ওনার জন্য আমি এতদূর আসতে পেরেছি।’ 

চম্পকার তত্ত্বাবধানে পপিং ক্রিজের ওপর জুতা রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইয়র্কার প্র্যাকটিস করতেন মালিঙ্গা। তবে কৌশল রপ্ত করার পেছনে অবদান আছে ওয়াকার ইউনিস এবং ওয়াসিম আকরামেরও। এক সাক্ষাৎকারে মালিঙ্গা বলেছিলেন, ‘টিভিতে ওয়াকার-ওয়াসিমের বোলিং দেখে আমার মনে হয়েছিল বলের মধ্যে ইয়র্কারই সেরা। তাছাড়া কোচ আমায় বলেছিলেন শুনে শেখার চেয়ে বোলিং দেখে শেখা ভালো। মনে হয়েছিল ইয়র্কার আমি দেখতে ভালোবাসি বলে শিখতেও পারব। যখন শিখে গেলাম তখন আরও ভালো করার চেষ্টা করলাম। এখন মনে হয় চোখ বন্ধ করেও আমি ব্যাটসম্যানের পায়ের কাছে বল ফেলতে পারব।’

২০১০ সালে ভারতের বিপক্ষে শেষ টেস্ট খেলেছেন মালিঙ্গা। হাঁটুর ইনজুরিই তাকে ক্রিকেটের অভিজাত সংস্করণে বেশিদূর যেতে দেয়নি। অপ্রাপ্তিটা এখনো ভুলতে পারেন না, ‘টেস্ট ক্রিকেট না খেলতে পারা নিয়ে আমার দুঃখবোধ আছে। জাতীয় দলে আমার অভিষেক হয়েছিল টেস্ট বোলার হিসেবে। টেস্ট খেলতে খেলতে আমি অনেক শিখেছি। নতুন বলে বোলিং, পুরনো বলের ব্যবহার, উইকেট নেওয়া সব শিখেছি টেস্ট থেকে। তাই ইনজুরির কারণে যখন টেস্ট ছাড়তে বাধ্য হলাম তখন খুব কষ্ট পেয়েছি।’ সেই দুঃখবোধকে সঙ্গী করে বলেছিলেন, ‘খেলেছি মাত্র ৩০ টেস্ট। আমার ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি সাফল্যের ভিত্তি ওটাই। এখনো মনে আছে ২৯তম টেস্ট খেলতে গিয়ে আমি দুই দিকে রিভার্স সুইং করা শিখেছিলাম। ভারতের বিপক্ষে সেই গল টেস্টে নিয়েছিলাম ৭ উইকেট। সেই সিরিজের পর আর টেস্ট খেলিনি হাঁটুর ইনজুরির কারণে। এখনো মনে হয় আমার সঙ্গেই কেন এটা হলো।’

টেস্ট না খেলতে পারার কারণেই কি ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত সংস্করণে আরও দুরন্ত হয়ে উঠেছেন মালিঙ্গা? উত্তর সম্ভবত ‘হ্যাঁ’। আইপিএলসহ ঘরোয়া লিগে মালিঙ্গার দাপট, ওয়ানডেতে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওটা সেই সাক্ষ্য দেয়। ২৯ বছর বয়সে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের ইচ্ছার কথা জানাতে গিয়ে মালিঙ্গা বলেছিলেন, ‘টি-টোয়েন্টিতে আমি একশো উইকেট নিতে চাই। আর ওয়ানডেতে চাই তিনশো উইকেট।’

দেশের হয়ে ২২৬ ওয়ানডেতে ৩৩৮ উইকেট নিয়েছেন মালিঙ্গা। ৮৪ টি-টোয়েন্টিতে তার উইকেটসংখ্যা ১০৭টি। টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি, ফার্স্ট ক্লাস মিলিয়ে প্রায় ১৬শ’র ওপর উইকেট নিয়েছেন তিনি। এটা তার গ্রেটনেসের স্বাক্ষর। তবে স্রেফ ইয়র্কারেই অমরত্ব পেতে পারেন মালিঙ্গা। ওয়ানডেতে টানা চার বলে চার উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব আছে তার। মোট তিনবার হ্যাটট্রিক করেছেন। তাছাড়া একার চেষ্টায় কত ম্যাচে যে দলকে জিতিয়েছেন তার হিসাব নেই। এখনো সীমিত ওভারে মালিঙ্গা ম্যাজিক চলমান। তাই ধরে নেওয়া যায় আরও অনেক ম্যাচ ভবিষ্যতেও জেতাবেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত