জিসামনির কথিত ধর্ষণ ও হত্যা: স্বীকারোক্তি দেওয়া খলিল মাঝির দুঃসহ স্মৃতি

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:৩০ পিএম

নারায়ণগঞ্জে ‘মৃত স্কুলছাত্রী’ জিসামনির জীবিত ফিরে আসার ঘটনায় পুলিশের তদন্তে ধর্ষণের পর হত্যার স্বীকারোক্তি দেওয়া নৌকার মাঝি খলিলুর রহমান গত বুধবার বিকেলে জামিনে মুক্ত হয়েও এখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি।

নির্যাতনে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পরা এই দরিদ্র অসহায় ব্যক্তি পুলিশ রিমান্ডের সেই দুঃসহ স্মৃতির কথাও মুখে আনতে ভয় পাচ্ছেন। পুলিশের ভয়ে জেলা কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর গণমাধ্যমকে অনেকটা এড়িয়ে চলছেন তিনি।

বুধবার সন্ধ্যায় অসুস্থ খলিল মাঝিকে নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলেন তার স্বজনরা উন্নত চিকিৎসার জন্য। কিন্তু অর্থের অভাবে রাতেই ফিরিয়ে আনা হয় বন্দর উপজেলার একরামপুর এলাকায় ধনু মিয়ার ভাড়াটে খলিলকে।

বুধবার রাতে কথা বলতে অনেকটাই অপারগ ছিলেন খলিল। বৃহস্পতিবার কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর দেশ রূপান্তর- এর কাছে তুলে ধরেন সেই রিমান্ড আর লোমহর্ষক মিথ্যা জবানবন্দি আদায়ের ঘটনা।

খলিল মাঝি জানান, ‘আমার হাত-পা রশি দিয়ে বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে  মুখে গামছা বেঁধে অনবরত মুখে পানি ঢালছে। পানি ঢালার কারণে দম বন্ধ হয়ে যেত। মিথ্যা স্বীকারোক্তি দেওয়ার জন্য বারবার মুখে গামছা বেঁধে পানি ঢেলে নির্যাতন করেছে। যদি স্বীকারোক্তি না দিই তাহলে আমাকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এভাবে যদি কাউকে নির্যাতন করা হয় তাহলে যে কেউ মারা যাবে’।

খলিল বলেন, “গত ৮ আগস্ট গ্রেপ্তার করা হয়। কোনো কারণ বলা হয়নি। এসআই শামীম স্যার এসে আমাকে ধরে নিয়ে যায়। সদর থানায় আমার সামনে দুই ছেলেকে ( জিসা মনির কথিত প্রেমিক আব্দুল্লাহ্‌ ও অটো চালক রকিব) দেখিয়ে বলে, ‘তুই ওদের চিনিস?’  তখন আমি বলি তাদের আমি চিনি না। তখন আমাকে মারধর শুরু করেন শামীম স্যার।  আমি ওই দুই ছেলে ও কিশোরীকে চিনি না।  জীবনে তাদের দেখি নাই। তবু শামীম স্যার আমাকে মারধর করেন আর বলেন, ‘তুই মিথ্যা কস।’ এভাবে আমাকে থানার লকআপে তিন দিন আটকে রেখে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়।”

এদিকে এসব অভিযোগ অকপটে অস্বিকার করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ( বর্তমানে অব্যাহতিপ্রাপ্ত) এস আই শামীম।

তিনি বলেন, “নির্যাতন করার অভিযোগ মিথ্যা। তাকে যদি মারধর ও নির্যাতন করা হতো তাহলে তো তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে বলতে পারতেন। ম্যাজিস্ট্রেট স্বীকারোক্তি নেওয়ার আগেও তাকে এসব বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছেন। সেখানে তো খলিল এসব অভিযোগের কথা বলতে পারতেন।”

তবে কেন জেলা পুলিশের তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে এসআই শামীমকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং জিসা মনি মৃত হলে কীভাবে ফিরে এল এমন প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে ব্যর্থ হন এসআই শামীম আল মামুন।

উল্লেখ্য, গত ৪ জুলাই ১৫ বছর বয়সী কিশোরী জিসা শহরের দেওভোগের মা-বাবার বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় জিডি ও মামলা করে তার পরিবার। ওই মামলায় পুলিশ আব্দুল্লাহ, রকিব ও নৌকার মাঝি খলিলুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ৯ আগস্ট তারা আদালতে জবানবন্দিতে তারা ‘অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার’ দায় স্বীকার করেন।

এই ঘটনার ১৪ দিন পর গত ২৩ আগস্ট ওই কিশোরী জীবিত ফিরে আসে এবং সে জানায় যে ইকবাল নামের এক যুবককে বিয়ে বন্দর এলাকায় ভাড়া বাড়িতে সংসার করছিল। এরপরই পুলিশের রিমান্ড ও তদন্ত নিয়ে মিথ্যাচার সামনে আসে। যা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়।

বুধবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আনিসুর রহমান তার জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন। গত ১ সেপ্টেম্বর জামিন শুনানির পর আসামি খলিলুর রহমান খুলিলকে জামিন আবেদন করেন। পরে শুনানি শেষে গত বুধবার  তারিখ ধার্য করেছিলেন আদালত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত