প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস মহামারী আকারে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। মহামারীর প্রভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু ছাড়াও অর্থনৈতিক দুরবস্থা তৈরি হয়েছে বিশ্বের। তবে গবেষকরা বলছেন, ধনী দেশগুলোর তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলো মহামারী বাস্তবতা ভালোভাবে সামাল দিতে পেরেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো অর্থনৈতিক দিক দিয়েও অন্যদের তুলনায় আগে এগিয়ে যাবে বলেও মনে করেন তারা।
যুক্তরাজ্যে সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে করোনায়। অন্যদিকে বাংলাদেশে চার হাজারের (সরকারি হিসাব) কিছু বেশি মানুষ মারা গেছে, যদিও বাংলাদেশের জনসংখ্যা যুক্তরাজ্যের তুলনায় দ্বিগুণ। চলতি বছরে ব্রিটিশ অর্থনীতিতে ৯ শতাংশ ধসের আশঙ্কা করা হচ্ছে। আর বাংলাদেশে কমেছে দুই শতাংশ। করোনা মহামারী-পরবর্তী পৃথিবীতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থনৈতিক ক্ষেত্র খুলে যাবে বেশি। মহামারীর মূল আঘাত লেগেছে মূলত ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে। এই দেশগুলো করোনা মোকাবিলায় পর্যাপ্ত সময় পায়নি। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলো করোনা মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য অনেকটা সময় পেয়েছে।
২০১৬ সালের এক রিপোর্টে যুক্তরাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতার দিক তুলে ধরা হয়েছিল। পিপিই (পার্সোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট) থেকে শুরু করে অবকাঠামোগত অনেক সমস্যার কথা ওই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছিল। আজ অবধি ওই ত্রুটি ঠিক করা হয়নি, যার খেসারত দিতে হয়েছে করোনার মধ্যে। জিকা, সার্স, মার্স এবং সোয়াইন ফ্লু ভাইরাসের সময় দেখা গেছে, দরিদ্র দেশগুলো আগে আক্রান্ত হয়েছে এবং পরে ধনী দেশগুলো। কিন্তু করোনার ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো চিত্র। কিছু উন্নয়নশীল দেশ আছে যেখানে করোনাভাইরাস এখনো বিস্তার লাভ করতেও পারেনি। জোহানেসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিভেন ফেইডম্যানের মতে, ‘উন্নত ও তৃতীয় বিশ্বের কল্পিত ধারণাকে নস্যাৎ করে দিয়েছে করোনাভাইরাস।’
উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে ভিয়েতনাম খুব দ্রুত করোনার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে পেরেছে এবং নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে। নাইজেরিয়ায় যখন মাত্র ১০০ জন আক্রান্ত হয়েছে তখনই দেশটি শাটডাউন করে দিয়েছে। কারণ এই দেশগুলোর যুগের পর যুগ ধরে মহামারী সামলানোর অভিজ্ঞতা আছে। আফ্রিকার অধিকাংশ দেশই ২০১৪ সালে ইবোলা মহামারী প্রত্যক্ষ করেছে, যা করোনা মহামারীর কঠিন সময় অতিক্রম করতে তাদের সাহায্য করছে।
বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। করোনাভাইরাসের কাগজে-কলমের হিসাবে এমন ঘনবসতিপূর্ণ দেশে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্ততে তা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে যে পরিমাণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে তা বাংলাদেশে হয়নি। সরকারি হিসাব নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, বাস্তবিক সংখ্যাও অতটা বেশি নয়। এই সফলতার পেছনে আছে স্থানীয় পর্যায়ে লকডাউন ও কৌশল।
আর একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর রয়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর করোনা যুদ্ধের নেপথ্যে। এই দেশগুলোর জনসংখ্যা তুলনামূলক তরুণ। আর তরুণদের মধ্যে করোনা সংক্রমিত হয়ে মৃত্যুর হার সারা বিশ্বেই কম। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আক্রান্তের সংখ্য বাড়লেও মৃত্যুহার কম। একই অবস্থা অর্থনীতির ক্ষেত্রেও। উন্নত দেশগুলো করোনায় অর্থনৈতিকভাবে যতটা ধাক্কা খেয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলো অতটা চাপে পড়েনি। উন্নয়নশীল দেশগুলো অর্থনৈতিক দিক দিয়ে চাপে পড়েছে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে তারা আগের মতোই আছে।
