ওপেনিংয়ে আধুনিকতা এনে দিয়েছিলেন সাঈদ আনোয়ার

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৩:১৪ এএম

সাঈদ আনোয়ার, পাকিস্তান ক্রিকেট শুধু নয় ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম রোমাঞ্চকর ও কার্যকর একজন ওপেনার। সাঈদ আনোয়ার ক্রিজে থাকা মানে রানের ফুলঝুরি ছোটা, এমনও কথা প্রচলিত আছে। ব্যাট হাতে তার প্রমাণও রেখেছেন। ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকেই দেড়শ ছাড়ানো স্কোরে নিয়ে যান সাঈদ। ওয়েলিংটনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে করেছিলেন ১৬৯ রান। আরও বড় ব্যাপার, ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ব্যাটসম্যানরা যখন রান করার জন্য হোম ভেন্যুকে বেছে নেন, সাঈদ সেখানে রান করে দেখিয়েছেন প্রতিপক্ষের মাঠে। একদম ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই। তার প্রথম ৫ টেস্ট সেঞ্চুরির চারটিই বিদেশের মাটিতে। ওয়ানডেতেও তেমন। প্রথম সেঞ্চুরি অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে, পরেরটি দেশের মাটিতে আর বাকি তিনটি নিরপেক্ষ ভেন্যুতে। তাছাড়া শট নেওয়ায় তার সাবলীল ধরন, দুর্দান্ত স্ট্রাইক রেট আর ১৯৯৭ সালে চেন্নাইতে ভারতের বিপক্ষে ১৯৪ রানের ইনিংস (ওয়ানডেতে দীর্ঘদিন সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস) আনোয়ারকে ক্রিকেটের আধুনিকতম ব্যাটসম্যান করে রেখেছে আজীবন। ক্রিকেট ছেড়ে এখন ধর্মকর্মে মনোনিবেশ করা সাঈদ আনোয়ার আজ পা রাখলেন ৫২ বছরে।

সাঈদ আনোয়ারের ইনিংস দাঁড়িয়ে যাওয়া মানেই যেন সেঞ্চুরি। আর সেই সেঞ্চুরি লম্বা ইনিংসে পরিণত হওয়া। ক্যারিয়ারের ৫৫ টেস্টে করা তার ১১টি সেঞ্চুরির ৫টিই ১৪০ এর ওপরে ছিল। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়েলিংটনের প্রথম সেঞ্চুরি ছাড়া ইংল্যান্ডের সঙ্গে ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরিটি ছিল ১৭৬ রানের। পরে রাওয়ালপিন্ডিতে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ১৪৯, একই ভেন্যুতে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ১৪৫, কলকাতায় ভারতের সঙ্গে অপরাজিত ১৮৮ তার টেস্টে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ। তবে সাঈদ আনোয়ারের ব্যাটিং স্টাইল ছিল সবচেয়ে আলাদা। স্ট্রাইক রেট ছুটিয়ে রান তোলার ধরনটাই তাকে সবার চেয়ে আলাদা করেছে। ১৯৯৬ তে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লর্ডসে টেস্টের দুই ইনিংসে যথাক্রমে ১২০ বলে ৭৪ ও  ১৪৪ বলে ৮৮ করেছিলেন তিনি। তার সেই ব্যাটিংকে উইজডেন আলম্যানাকে আধুনিক পাকিস্তান ব্যাটিংয়ের শুরু বলা হয়েছিল। শুধু টেস্টে নয় ওয়ানডেতেও ওপেনিং ব্যাটিংয়ে আধুনিকতার জনক বলা হয় তাকে।

ওয়ানডেতে ওপেনিংয়ে আধুনিকতা এনেছেন, এমন বলার কারণ আছে। নব্বই দশক পর্যন্ত ওয়ানডেতেও ওপেনারদের কাজ ছিল শুরুতে দেখে খেলা। এই দেখে খেলতে গিয়ে ১৫ ওভারে গুটিকয় রান তুলতেন তারা। কিন্তু নব্বই দশক থেকেই ধীরে ধীরে এই ধারা বদলাতে থাকে। সাধারণ ভাবে ধারণা করা হয় যার শুরুটা করেছিলেন সনাৎ জয়াসুরিয়া ও শচিন টেন্ডুলকার। শুরুর ১৫ ওভারে পাওয়ার প্লে’র সুবিধা নিয়ে দ্রুত রানের গতি ছোটানোর শুরু করেন তারা। কিন্তু এ দুজনের আগেই যার শুরু করেছিলেন সাঈদ আনোয়ার। ১৯৯২ বিশ্বকাপটা ইনজুরির কারণে মিস না করলে হয়তো সেবারই দেখা যেত ওপেনার হিসেবে তার কীর্তি। জয়াসুরিয়া, শচিনরা যখন উঠে আসছেন ততদিনে ওপেনার হিসেবে ১ হাজার রান করে ফেলেছেন সাঈদ। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত ওপেনার হিসেবে তার স্ট্রাইক রেট ৮৫.০৩। ওই সময়ে আর কারও এত দ্রুত রান তোলার নজির নেই। তালিকায় দ্বিতীয়তে থাকা কৃষ্ণমাচারী শ্রীকান্তের ওপেনার হিসেবে স্ট্রাইকরেট ৭১.৭৪। কিন্তু শুরুর ৫ বছর ইনজুরি ও ওপেনে নিয়মিত সুযোগের অভাব সাঈদকে অনেকটা পেছনে ঠেলে দেয়। নয়তো ১ হাজার নয়, তার রান হতো আরও বেশি।

শুরুতে ওপেনার হিসেবে সুযোগ পেতেন না সাঈদ। নামতেন তিনে। কিন্তু ১৯৯০ এর বেনসন অ্যান্ড হেজেস সিরিজ ওপেনার সাঈদকে চেনায়। সেবার তিনে নেমে এক ম্যাচে ২৪ বলে ঝড়ো ৩৭ করলেন। পেয়ে গেলেন ওপেনে নামার সুযোগ। পরের ম্যাচেই ওপেনে নেমে ২৭ বলে করলেন ৩০। কিন্তু অধিনায়ক ইমরান খান আর তাকে নিচে নামাননি। প্রতিদানও দিয়েছেন সাঈদ, ওই সিরিজে ৯৯ বলে ১২৬, ৩৬ বলে ৪৩ করেছেন। পুরো সিরিটে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হিসেবে তৃতীয় হয়েছেন ঠিকই কিন্তু তার স্ট্রাইক রেট ১০৫.৩৯ এর ধারেকাছে কেউ ছিল না।

ওয়ানডেতে ওপেনিংয়ে ব্যাটিংয়ের ধরন যদি কেউ বদলে থাকেন তবে তা জয়াসুরিয়া, শচিন নন অবশ্যই সাঈদ। অভিষেকের পর পাকিস্তানের ১০৮ ওয়ানডের মাত্র ৪২টি খেলতে পেরেছিলেন। ইনজুরির কারণে দলে আসা-যাওয়া তাকে বাকি দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর পেছনে ঠেলে দেয়। ১৯৯২ বিশ্বকাপ মিস করে আরও পিছিয়ে যান। কিন্তু প্রথম ৪১ ইনিংসে ওপেনার হিসেবে ৬টি সেঞ্চুরি সাঈদকেই আধুনিক ওপেনার হিসেবে প্রমাণ করে। তবুও যদি কারও সন্দেহ থাকে তবে আরেকটি পরিসংখ্যান সাঈদের পক্ষে আছে। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৯ এই দশকে সর্বোচ্চ রান তোলার ওপেনারও এই পাকিস্তানি। এই সময়ে ১৬৬ ম্যাচে ৬৪২৭ রান তুলেছেন সাঈদ। একই সময়ে শচিন ১৪২ ম্যাচে করেছেন ৬২৭০ ও সনাৎ জয়াসুরিয়া ১৪৬ ম্যাচ খেলে করেন ৪৫২৭ রান।

এমন সাফল্যের পরও সাঈদ আনোয়ারের ক্যারিয়ার কিন্তু লম্বা হয়নি। মেয়ের অকাল মৃত্যুতে ভেঙে পড়া সাঈদ ক্রিকেট ছেড়ে বেছে নেন ধর্ম প্রচারের পথ। ২০০৩ বিশ্বকাপ খেলেই থেমেছেন মোট ২৪৭ ওয়ানডেতে ২০ সেঞ্চুরিতে ৮৮২৪ রান করে। আর ৫৫ টেস্টে ১১ সেঞ্চুরিতে করেছেন ৪০৫২ রান। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত