নেইল ফেয়ারব্রাদার : ইংল্যান্ডের মাইকেল বেভান

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০২:১৭ এএম

রোহান কানহাইয়ের খেলা পছন্দ করতেন বলে সুনিল গাভাস্কার ছেলের নাম রেখেছিলেন রোহান গাভাস্কার। ভারতীয় কিংবদন্তির ছেলে বাস্তব জীবনে রোহান বা গাভাস্কারের কোনোটাই হতে পারেননি। নেইল ফেয়ারব্রাদার কিন্তু ভালো ওয়ানডে ব্যাটসম্যান হতে পেরেছিলেন। মা অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি নেইল হার্ভের খেলা খুব পছন্দ করতেন। ছেলের নাম তাই রেখেছিলেন ‘নেইল হার্ভে ফেয়ারব্রাদার’। স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে ছেলে হার্ভের মতো ব্যাটসম্যান হবে। তেমনটা না হলেও সাদা বলের ক্রিকেটে তার কৃতিত্ব অন্য এক অস্ট্রেলিয়ানকে মনে পরাতে বাধ্য। মাইকেল বেভানের মতো ফেয়ারব্রাদারও ছিলেন ‘গ্রেট ফিনিশার’।

নিখুঁতভাবে ইনিংস শেষ করা দেখে বেভানের নাম হয়েছিল ওয়ানডে ক্রিকেটের ‘পাইজামা পিকাসো’। ফেয়ারব্রাদার ততটা নিখুঁত ছিলেন না। যতটুকু ছিলেন তাতেই মনে হতো, ‘ইংল্যান্ডস ইকুয়াভেলেন্ট অব মাইকেল বেভান।’

গত শতাব্দীর নব্বই দশকে গ্রাহাম গুচের ওয়ানডে দলের মেরুদ- ছিলেন ফেয়ারব্রাদার। ’৯২ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড দলের সাফল্য এসেছিল তার কারণেই। হার্ভের মতোই ছিলেন বাঁ-হাতি। বটম হ্যান্ড টেকনিক আর আউট-সাইড অফ স্টাম্পে দুর্বলতার কারণে টেস্টে সফল হতে পারেননি।

ফেয়ারব্রাদারের টেস্ট এবং ওয়ানডে অভিষেক হয়েছিল ১৯৮৭তে। ভারতের বিপক্ষে শারজায় প্রথম ওয়ানডে খেলেন এপ্রিলে। দুই মাস পর পাকিস্তানের বিপক্ষে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে তার টেস্ট অভিষেক। তিন বল খেলে মোহসিন কামালের বলে এলবিডব্লিউ হন। (মোহসিন কামাল বাংলাদেশের সাবেক কোচ)। ১১ টেস্টে একটা মাত্র হাফসেঞ্চুরি করতে পেরেছিলেন। ১৯৯৩ সালে চেন্নাই টেস্টে তার ৮০ রান সত্ত্বেও ইংল্যান্ড হেরেছিল। ওয়ানডের তুলনায় টেস্ট গড় (১৫.৬৪) যাচ্ছেতাই।

১৯৬৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর নেইল ফেয়ারব্রাদারের জন্ম ল্যাঙ্কারশায়ারের ওরিংটনে। মাত্র ১৭ বছরে হয়েছিল তার ফার্স্ট ক্লাস অভিষেক। প্রথম নজরে আসেন ছিয়াশিতে। সেই মৌসুমে ৪৮.৬৮ গড়ে রান করেছিলেন। তিন সেঞ্চুরির সঙ্গে আটটি হাফসেঞ্চুরিও ছিল। ফলে চারজাতির শারজা টুর্নামেন্টের জন্য তাকে দলে নেওয়া হয়। ২ এপ্রিল ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেকে করেছিলেন ১৪ রান। পরবর্তী ম্যাচগুলোতেও কিছু করতে পারেননি। প্রথম হাফসেঞ্চুরি করেন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পরের বছর মার্চে। ওটা ছিল ফেয়ারব্রাদারের অষ্টম ওয়ানডে।

ফেয়ারব্রাদার সত্যিকারের হিরো হয়ে ওঠেন ১৯৯১ সালের ২৭ মে। লর্ডসে সেদিন ভিভ রিচার্ডসের উইন্ডিজের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেছিলেন। ১০৯ বলে তার ১১৩ রানের ইনিংসের কারণে ৫৩ বল হাতে রেখে ৭ উইকেটের জয় পেয়েছিল গুচের দল। এখন সেই জয়ের গুরুত্ব বোঝা সম্ভব নয়। উইন্ডিজের দাপট তখনো প্রবল। দলে ছিলেন কার্টলি অ্যামব্রোস, কোর্টনি ওয়ালশ এবং ম্যালকম মার্শালের মতো কিংবদন্তির পেসার। অমন পেস আক্রমণের বিপক্ষে ২৬৪ রান তাড়া করে ৫৩ বল হাতে রেখে ইংল্যান্ড জয় তুলেছিল ফেয়ারব্রাদারের মাস্তানিতে। সেই মাস্তানি বিরানব্বই বিশ্বকাপেও অব্যাহত ছিল। ফাইনালে তার ৬২ রানের ইনিংস পাকিস্তানের হাত থেকে প্রায় বিশ্বকাপ ছিনিয়েই নিয়েছিল। সেই বিশ্বকাপে ফেয়ারব্রাদারের স্কোর ছিল যথাক্রমে ২৪, ১৩*, ৬৩, ৭৫*, ২০, ২৮, ৬২। বৃষ্টির কারণে গ্রুপ পর্বে পাকিস্তান এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ব্যাট করেননি। অপরাজিত ৭৫ রানের ইনিংস খেলেছিলেন অন্যতম ফেভারিট দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। যে ইনিংস না খেললে ইংল্যান্ড হয়তো সেমিফাইনালেই উঠতে পারত না।

১৯৯২ বিশ্বকাপের পরের বছরই ঢাকায় আবাহনীর হয়ে খেলতে এসেছিলেন ফেয়ারব্রাদার। ১৯৯৩ সালের ৩ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগের আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ ‘ফেয়ারব্রাদার ম্যাচ’ হিসেবে খ্যাতি পেয়ে যায়। তার ৮৬ বলে ৯০ রানে আবাহনী করে ৪৫ ওভারে ৪ উইকেটে ২৪০। শ্রীলঙ্কার সামারাসেকেরার ৭৮ রান সত্ত্বেও মোহামেডানকে ২২৩ রানে আটকে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ জয় তুলে নেয় আবাহনী।

১৯৯২ বিশ্বকাপের পরেই মূলত ওয়ানডে স্পেশালিস্টের খ্যাতি পেয়ে গিয়েছিলেন ফেয়ারব্রাদার। তার ১২ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার সেই খ্যাতির নিদর্শন। ইংল্যান্ডের হয়ে ৭৫ ম্যাচে ৩৯.৪৭ গড়ে ২০৯২ রান করেছেন। এই পরিসংখ্যানে অবশ্য মিডল অর্ডারে তার একার লড়াই কিংবা টেল এন্ডারদের নিয়ে ম্যাচ জেতানোর কথা লেখা নেই। ’৯৬ এবং ’৯৯ বিশ্বকাপেও খেলেছিলেন ফ্রেয়ারব্রাদার।

ফার্স্ট ক্লাসে দারুণ সফল ফেয়ারব্রাদার। ৪১ গড়ে ২০ হাজারের ওপর রান করেছেন। সেঞ্চুরি ৪৭টি। এই পারফরম্যান্সের অর্ধেক টেস্টে করতে পারলেও তার নেইল হার্ভে ফেয়ারব্রাদার নামটা সার্থক হতো। তবে ১৯৯০ সালের একটা দিনে হার্ভেকে ছাপিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সেদিন ওভালে সারের বিরুদ্ধে ৩৬৬ রানের ইনিংস খেলেন। ল্যাঙ্কারশায়ারের পক্ষে এক দিনেই করেছিলন ৩১১ রান। প্রত্যেক সেশনে করেছিলেন সেঞ্চুরি। ২০০২ সালে ফার্স্ট ক্লাস থেকে অবসর নেন ফেয়ারব্রাদার। এরপর প্রশাসক হিসেবে স্টুয়ার্ট ব্রড, জস বাটলার এবং জো রুটের মতো প্রতিভা তুলে এনেছেন। কিন্তু ফেয়ারব্রাদারের পরিচিত আটকে আছে সাদা বলের গ-িতেই। যেখানে তিনি ছিলেন ইংল্যান্ডের পাইজামা পিকাসো।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত