বন উজাড় এবং মাত্রাতিরিক্ত ভোগের কারণে গত ৫০ বছরেরও কম সময়ে পৃথিবীতে বন্যপ্রাণী কমে গেছে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। এর মধ্যে ভূপৃষ্ঠের ৭৫ শতাংশ এবং সমুদ্রগুলোর ৪০ শতাংশ প্রাণীই মানুষের হানায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের (ডব্লিউডব্লিউএফ) বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চিত্র। মানুষ এবং প্রকৃতি যে একে অপরের পরিপূরক, কভিড-১৯ মহামারী তা ভালোমতোই মনে করিয়ে দিয়েছে বলেও ডব্লিউডব্লিউএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ডব্লিউডব্লিউএফের সবশেষ লিভিং প্ল্যানেট রিপোর্টে বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান হারে বন উজাড় এবং কৃষিক্ষেত্রের বিস্তারের কারণে ১৯৭০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে গড়ে স্তন্যপায়ী, পাখি, উভচর, সরীসৃপ ও মাছের বিভিন্ন প্রজাতির ২০ হাজারের বেশি বন্যপ্রাণী কমেছে প্রায় ৬৮ শতাংশ।
বিবিসি জানিয়েছে, বন্যপ্রাণীর ‘সর্বনাশা এ পতনের’ হার কমার কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না এবং মানুষ যে হারে প্রকৃতি ধ্বংস করছে তা এর আগে কখনো দেখা যায়নি বলে সংস্থাটির প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
ডব্লিউডব্লিউএফের প্রধান নির্বাহী তানিয়া স্টিল বলেছেন, বনাঞ্চল ধ্বংস, বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক মাছ ধরা এবং বনে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার মতো কারণে বিশ্বে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা ‘হু হু করে কমছে’। তিনি বলেন, যাকে আমরা আমাদের বাড়ি বলছি, সেই পৃথিবীর সর্বনাশ করে চলেছি আমরা; নিজেদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও পৃথিবীতে টিকে থাকার সম্ভাবনাকে ঝুঁকিতে ফেলছি। প্রকৃতি এখন মরিয়া হয়ে আমাদের বিপদসংকেত পাঠাচ্ছে। বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার সময়ও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। লন্ডনের জুওলজিক্যাল সোসাইটির (জেডএসএল) বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিষয়ক পরিচালক ড. অ্যান্ড্রু টেরির ভাষ্য, বন্যপ্রাণীর সংখ্যার এ ক্রমাবনতিকে মানুষের কর্মকাণ্ডে পৃথিবীর যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে তার সুস্পষ্ট প্রমাণ। তিনি বলেন, যদি কোনো কিছুই না বদলায়, তাহলে সন্দেহাতীতভাবে বন্যাপ্রাণীর সংখ্যা কমতে থাকবে; একসময় তা বন্যপ্রাণীগুলোকে বিলুপ্ত করে দেবে এবং আমরা যে বাস্তুসংস্থানের ওপর নির্ভর করছি তার অখণ্ডতাকে ঝুঁকিতে ফেলবে। বাসস্থান ধ্বংস, বন্যপ্রাণীর ব্যবহার ও বেচাকেনাসহ এবারের মহামারীর আবির্ভাবের পেছনে যেসব কারণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, তার অনেকগুলো বন্যপ্রাণীর সংকোচনের পেছনেও দায়ী বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।
তবে এখনো যদি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যায় এবং উৎপাদন ও খাদ্য গ্রহণের প্রক্রিয়া বদলে ফেলা যায় তাহলে বিপন্ন বন্যপ্রাণীর বাসস্থান ধ্বংস হওয়া বন্ধ এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেওয়াও সম্ভব হবে বলে বিজ্ঞানীদের বেশকিছু মডেলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
ডব্লিউডব্লিউএফের এ প্রতিবেদনে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা বাড়ছে না কমছে সে সংক্রান্ত তালিকা ব্যবহার করা হলেও এতে কী পরিমাণ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে, সে সংক্রান্ত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। তবে প্রতিবেদনটিতে চার হাজারের বেশি মেরুদণ্ডী প্রাণীকে নিয়ে গবেষণা করে ১২৫ জন বিজ্ঞানী জানিয়েছেন, মিঠাপানিতে বসবাসকারী প্রাণীর সংখ্যা কমেছে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৮৪ শতাংশ। এরপর সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত প্রজাতির মধ্যে রয়েছে কঙ্গোর গরিলা এবং ঘানার আফ্রিকান ধূসর তোতা।
প্রতিবেদনমতে, বিশ্বের অন্য অঞ্চলগুলোর তুলনায় লাতিন আমেরিকার ও ক্যারিবীয় অঞ্চলেই বন্যপ্রাণীর পরিমাণ সবচেয়ে বেশি হ্রাস পেয়েছে। অঞ্চলটির সরীসৃপ, উভচর ও পাখি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে বলে জানিয়েছে ডব্লিউডব্লিউএফ।
