টেনিসে মার্টিনা হিনগিস যা করেছেন তাতেই অমর হয়ে থাকবেন। কিন্তু নিষ্কলুষ অমরত্ব তার ভাগ্যে নেই। থাকত যদি ড্রাগ নিয়ে কলঙ্কিত না হতেন। তাছাড়া ক্যারিয়ার নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতাও বারবার ডুবিয়েছে তাকে।
মোট তিনবার আন্তর্জাতিক টেনিস থেকে অবসর নিয়েছেন এই সুইস। প্রথমবার ২০০৩-এ। যখন তিনি ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে। সেরেনা উইলিয়ামস তখন টেনিস বিশ্ব শাসন শুরু করছেন। পাওয়ার টেনিসকে কৌশল আর বুদ্ধিমত্তায় কীভাবে পরাস্ত করতে হয় সেই উদাহরণ তৈরি করেছিলেন হিনগিস। যা দেখে অবাক হন বরিস বেকারের মতো কিংবদন্তিরা। সেই সময় ইনজুরি তাকে এতটাই বিব্রত করেছিল যে বিরক্ত হয়ে টেনিস ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। বলেছিলেন, ‘টেনিসে আর ফেরার কোনো ইচ্ছে নেই।’ কিন্তু অবসর ভেঙে তিনি আবার কোর্টে ফেরেন ২০০৬ সালে। এরপর কোকেন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। দু’বছর নিষিদ্ধ হন। ২০০৭-এ আবার অবসর। এবং ছয় বছর পরে পুনরায় ফিরে আসেন টেনিস কোর্টে। ২০১৩ সালে হিনগিসের প্রত্যাবর্তন এতটাই সাফল্যমন্ডিত ছিল যে টেনিস ভক্তরা আফসোস করে বলেছিলেন, ‘নিরবচ্ছিন্ন ভাবে খেললে হয়তো তার শিরোপা সংখ্যা ডাবল হতো।’ দ্বিতীয়বার কোর্টে ফেরার পর টানা চার বছর টেনিস খেলেছেন হিনগিস। প্রচুর সাফল্যও পেয়েছেন কিন্তু গ্র্যান্ডসø্যাম এককের শিরোপা আর জিততে পারেননি। অথচ হিনগিস নারী টেনিসে হাতেগোনা সেই ৬ জন খেলোয়াড়ের একজন, যিনি সিঙ্গেলস ও ডাবলস দু’বিভাগেই বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর ছিলেন।
২০১৭’র অক্টোবরে ডব্লিউটিএ ফাইনালে টেনিস থেকে শেষবারের মতো অবসরের ঘোষণা দেন হিনগিস। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকিয়ে লেখেন, ‘ভাবতে খুব অবাক লাগছে যে, ২৩ বছর আগে পেশাদার টেনিস শুরু করেছিলাম। এরপরে এমন অনেক মৌসুম এসেছে, যখন পেশাদার আর ব্যক্তিগত দুই দিক থেকেই অনেক কিছু পেয়েছি। আমার বিশ্বাস এবার থেমে যাওয়ার সময় হয়েছে। সিঙ্গাপুরে এই টুর্নামেন্টে শেষ ম্যাচ খেলার পরেই অবসর নিতে চাই।’
আজ সুইজারল্যান্ডে চল্লিশতম জন্মদিনের (১৯৮০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর) কেক কাটছেন হিনগিস। ক্যারিয়ারজুড়ে অবসরের যে নজির স্থাপন করেছেন তাতে কভিড পরবর্তী টেনিসে তাকে আবার কোর্টে দেখার সম্ভাবনা এখনই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। হিনগিস যার সঙ্গে জুটি গড়ে মাত্র তিন বছর আগে ডাবলস জিতেছেন সেই লিয়েন্ডার পেজ কিন্তু ৪৭ বছর বয়সেও চুটিয়ে খেলছেন পেশাদার টেনিস।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সবমিলিয়ে ৩৫টা শিরোপা জিতেছেন সুইস তারকা, যার মধ্যে গ্র্যান্ডসø্যামের ৫টি একক আর ২০টি ডাবলস। শুরুই করেছিলেন কনিষ্ঠতম গ্র্যান্ডসø্যাম জয়ী হিসেবে। ১৯৯৭ সালে মাত্র ১৬ বছর ৩ মাস বয়সে জিতেছিলেন অস্ট্রেলিয়ান ওপেন। বিংশ শতাব্দীতে আর কেউ হিনগিসের চেয়ে কম বয়সে এই কীর্তি গড়তে পারেননি।
১৯৯৬ সালে উইম্বলডন ডাবলসে হেলেনা সুকোভার সঙ্গে যখন চ্যাম্পিয়ন হন হিনগিস, তখনো তার বয়স ষোল বছর পূর্ণ হয়নি (১৫ বছর ৯ মাস)। ষোলতে পা রেখে তিনি যা করেছিলেন তা বিস্ময়কর। প্রথমে জেতেন অস্ট্রেলিয়ান ওপেন। এরপর ফরাসি ওপেনের ফাইনালে ৬-৪, ৬-২ এ পরাজিত হন ইভা মায়োলির কাছে। ক’মাস পরে জেতেন উইম্বলডন। আর বছর শেষের ইউএস ওপেন জিতে মৌসুমের সমাপ্তি টানেন। ১৯৯৭ সালে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ডাবলসেও শিরোপা জিতেছিলেন হিনগিস। মেয়েদের টেনিস র্যাঙ্কিংয়ের নাম্বার ওয়ানও হয়েছিলেন।
ক্যারিয়ারের প্রথম পর্বে হিনগিস ছিলেন উইলিয়ামস বোনদের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী। এরপর ইনজুরি, ড্রাগ আর অবসরের ধাক্কায় তিনি ডাবলসে ঘাঁটি গড়েন। সেখানেও হয়ে ওঠেন কিংবদন্তি।
টেনিসই মার্টিনা হিনগিসের জীবন। ভালোবাসাও। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘টেনিস ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে কোনোদিন ভাবিনি। আমার রক্তে টেনিস। যতবার জন্মাব, টেনিসই খেলব।’
