পেকুয়া-চকরিয়ায় অবৈধ ফিশিং ট্রলার তৈরির হিড়িক, নির্বিকার বন বিভাগ

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২০, ০২:২০ এএম

কক্সবাজার জেলার চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার উপকূলজুড়ে অবৈধভাবে ফিশিং ট্রলার তৈরির হিড়িক পড়েছে। সরকারি বনায়নের গাছ ও কাঠ ব্যবহার করে অবৈধভাবে এসব ফিশিং ট্রলার তৈরি হলেও ‘রহস্যজনক’ কারণে নীরব ভূমিকায় রয়েছে বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন!

দীর্ঘদিন ধরে এই দুই উপজেলার উপকূলজুড়ে বন নিধনের সঙ্গে জড়িত কয়েকটি সিন্ডিকেট সরকারি বনাঞ্চল থেকে গর্জনসহ বিভিন্ন প্রকার গাছ কাঠ কেটে এসব অবৈধ ফিশিং ট্রলার তৈরির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। পেকুয়া ও চকরিয়ার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৭/৮ কিলোমিটারের ভেতরেই এসব ফিশিং ট্রলার তৈরির কাজ চলমান থাকলেও স্থানীয় বন বিভাগ ও প্রশাসন নীরব রয়েছে। ফলে বন নিধনকারী চক্র বেপরোয়াভাবে অবৈধ ফিশিং ট্রলার তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই পেকুয়া ও চকরিয়ার বনাঞ্চল বৃক্ষ শূন্য হয়ে বিরান ভূমিতে পরিণত হবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় পরিবেশবাদীরা। 

অভিযোগ উঠেছে, চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগ ও চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের অধীন পেকুয়া উপজেলার বারবাকিয়া রেঞ্জ এবং চনুয়া রেঞ্জ, চকরিয়ার ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জে কর্মরত কতিপয় অসৎ কর্মচারীকে ম্যানেজ করে অসাধু কাঠ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট দীর্ঘ দিন ধরে ফিশিং ট্রলার তৈরির ব্যবসা চালাচ্ছে। এক একটি ফিশিং ট্রলার তৈরি শেষে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়। সারা বছরই পেকুয়া ও চকরিয়ার উপকূলীয় এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে নদীর তীরে বন বিভাগের অনুমতি ব্যতীত অবৈধ ফিশিং ট্রলার তৈরির রমরমা বাণিজ্য চললেও তা বন্ধে স্থানীয় বন বিভাগ ও প্রশাসন কোন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় বন বিভাগের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে দুর্লভ ও মূল্যবান গর্জন গাছ (মাদার ট্রি) কেটে লম্বা তক্তা চিরাই করে ফিশিং ট্রলার তৈরির কাজে ব্যবহার করছে। প্রতিটি ফিশিং ট্রলারেই বনাঞ্চলের গাছ ও কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে। পেকুয়া উপজেলার টইটং ইউনিয়নের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৪-৫ কিলোমিটারের ভেতরেই পশ্চিম টইটং খালের বেড়িবাঁধের উপরে বড় আকারের ১১টি ফিশিং ট্রলার অবৈধভাবে তৈরি করা হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, পেকুয়া উপজেলার পশ্চিম টইটং ও দক্ষিণ পুইছড়ি এলাকার অবৈধ স’মিল ব্যবসায়ী আলমগীর, ইদ্রিস, মহিউদ্দিন ও মকছুদের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট টইটং খালের বেড়িবাঁধে ওই ট্রলার তৈরির কাজ করছে। ফিশিং ট্রলার তৈরিতে বন বিভাগের লিখিত অনুমতির বাধ্যবাধকতা থাকলেও তারা কেউ অনুমতি নেয়নি।

ফিশিং ট্রলার তৈরির সঙ্গে জড়িত কয়েকজন শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিনিধিকে জানান, প্রতিটি ফিশিং ট্রলার তৈরির ক্ষেত্রে স্থানীয় বন বিভাগের কর্মচারীদের ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। বন বিভাগের কর্মচারীরা মাঝে মাঝে এসে টাকা নিয়ে যায়।

শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চকরিয়ায় বন বিভাগের সংরক্ষিত বাগানের গর্জন গাছ কেটে এনে স'মিলে চিরাই করে ফিশিং বোট তৈরি করা হচ্ছে। চকরিয়ার মাতামুহুরি নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন পয়েন্টে বনাঞ্চলের গাছ নিধন করে ২০/৩০টি ট্রলার তৈরি করা হচ্ছে।

ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মালুমঘাট ক্রিশ্চিয়ান হাসপাতালের পশ্চিম পাশে বন বিভাগের গর্জন গাছ দিয়ে ডুমখালী এলাকার বশির আহম্মদ, শাহারবিল ইউনিয়নের চোয়ারফাঁড়ি-রামপুর এলাকায় আক্কাস আহম্মদ সওদাগর, সাইফুল্লাহ মানিক, কৈয়ারবিল খোজাখালী এলাকার বাচ্চুমিয়া, কৈয়ারবিলের খিলছাদক এলাকার জসিম উদ্দীন, বেলাল উদ্দীন, বদরখালী এলাকার একাধিক ব্যক্তি গর্জন গাছ দিয়ে ফিশিং ট্রলার তৈরিতে জড়িত।  

চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের চনুয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা জুয়েল চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এসব ফিশিং ট্রলার তৈরির সরকারি কোন অনুমতি নেই। বন বিভাগের কর্মচারীরা ফিশিং ট্রলার তৈরির সঙ্গে জড়িতদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা আদায় করে ট্রলার তৈরির সুযোগ করে দিচ্ছে কিনা জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি ও তার অফিসের কোন কর্মচারী এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নাই। 

চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এস এম গোলাম মাওলার সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অবৈধ ফিশিং ট্রলার তৈরি হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে তার কাছে কোন তথ্য নাই। এগুলো চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের কাজ। তারাই ভালো জানতে পারবে।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন পেকুয়া উপজেলার বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা আবদুল গফুর মোল্লার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, পেকুয়া উপজেলার যে সব স্থানে অবৈধ ফিশিং ট্রলার তৈরি করা হচ্ছে তা উপকূলীয় বন বিভাগের আওতাধীন এরিয়ায় পড়ছে। এখানে আমাদের করার কিছুই নেই।   

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত