ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী উলফাত আরা তিন্নির রহস্যজনক আত্মহত্যার তিন দিন পার হয়ে গেলেও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে মামলার প্রধান আসামি জামিরুল ইসলাম।
রবিবার বিকেলে ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার শেখপাড়া বাজার সংলগ্ন নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এখনো শোকের মাতম চলছে পরিবারটিতে।
ছোট মেয়েকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা হালিমা বেগম। তিনি বলেন, মেয়েটাকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন ছিল। ওর বাবা মারা যাওয়ার পর আমার পরিবার পুরুষ শূন্য। সবে মেয়েটা পড়ালেখা শেষ করল। একটা বড় চাকরি নিয়ে আমার পরিবারের হাল ধরতে চেয়েছিল তিন্নি। ওকে নিয়ে আমার অনেক বড় স্বপ্ন ছিল।
হালিমা বেগম বলেন, বৃহস্পতিবার তিন্নি এক বান্ধবীর বিয়ের অনুষ্ঠানে কুষ্টিয়া গিয়েছিল। অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরে রাত ৮টার দিকে। এর কিছু সময় পর মেজো মেয়ে মুন্নীর তালাক প্রাপ্ত স্বামী জামিরুল গোপনে তিন্নির রুমে ঢোকে এবং খাটের নিচে লুকিয়ে থাকে। তিন্নি বাইরে থেকে এসে পোশাক বদল করে বাসার নিচ তলায় তার সঙ্গে দেখা করে ও একটু বসে। এরপর ঘুমাতে তার রুমে যায়।
তিন্নির মা ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আরও বলেন, এরপর তিন্নি বুঝতে পারে তার খাটের নিচে কেউ লুকিয়ে আছে। লোকটি খাটের নিচ থেকে বের হয়ে একপর্যায়ে তিন্নিকে জাপটে ধরে। শুরু হয় ধস্তাধস্তি, এ সময় চিৎকার দেয় তিন্নি।
এর পরের ঘটনার বর্ণনা দেন তিন্নির মেজো বোন মুন্নী। তিনি জানান, বোনের চিৎকারে তিনি ছুটে যান তিন্নির রুমের সামনে। কিন্তু রুম ছিল ভেতর থেকে আটকানো। মুন্নী বলেন, অনেক চেষ্টা করে দরজার লক ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখি সেখানে জামিরুল। তখনো তারা ধস্তাধস্তি করছে। বাধা দিতে গেলে সে আমাকে মারতে আসে। আমি অন্য রুমে গিয়ে আত্মরক্ষা করি। এরপর অনেক সময় চলে তিন্নির রুমে তাণ্ডব। পরে রুম থেকে বের হয়ে আমাকে ও আমার মাকে খুঁজতে থাকে সে। একপর্যায়ে প্রতিবেশীদের উপস্থিতি টের পেয়ে রাত ১১টার দিকে জামিরুল পালিয়ে যায়।
পরিবারের হাল ধরতে চেয়েছিলেন তিন্নি!
ভাই না থাকায় চাকরি পেয়ে পরিবারের হাল ধরতে চেয়েছিলেন তিন্নি। কাঁদতে কাঁদতে তিন্নির মা হালিমা বেগম বলেন, আমি আর কী নিয়ে থাকব। অনেক চেষ্টা করেছি তাকে বিয়ে দিতে। কিন্তু সে কোনো সময় রাজি হয়নি। শুধু বলত, মা দোয়া করো আমি চাকরি পেয়ে সংসারের যেন হাল ধরতে পারি।
শৈলকুপার শেখপাড়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মৃত ইউসুফ আলীর মেয়ে তিন্নি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী ছিলেন। তিন্নির স্বজনদের অভিযোগ, তার বোনের সাবেক স্বামী শেখপাড়া গ্রামের কুনুরুদ্দীনের ছেলে জামিরুল ও তার তিন সহযোগী জোর করে তিন্নিদের বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর চালায়। এ সময় তিন্নির শোবার ঘরে ঢুকে তার শ্লীলতাহানি করায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তিনি। এ ঘটনার পর পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে প্রেরণ করলেও মামলার প্রধান আসামি এখনো পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়নি। এই নিয়ে তিন্নির পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
এ ব্যাপারে ওসি (তদন্ত) মহসীন আলী জানান, তিন্নির মা হালিমা বেগম চিহ্নিত ৮ জনসহ অজ্ঞাত আরও ৫/৬ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদেরকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে প্রেরণ করা হয়। মামলার প্রধান আসামি জামিরুলকে গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরও জানান, নিহত তিন্নির পরিবারকে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
