এক সময় এই দেশে একটা রেওয়াজ প্রচলিত ছিল সামাজিক মুখরোচক কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ছোট্ট দু’পাতার কবিতা প্রকাশ হতো। এসব কবিতার বিষয় ছিল, ‘ভাবির সঙ্গে দেবরের পলায়ন’- এমন সব মুখরোচক হালকা রসের কবিতা। একবার এমনই এক কবিতা ছাপল, জাহাঙ্গীর নামে এ ছেলেকে নিয়ে। সিরাজগঞ্জে গ্রামের মধ্যে হইচই পড়ে গেল।
ঘটনাটা হলো গ্রামের এক ছেলে জাহাঙ্গীর, বয়সে কম। কিন্তু বিধাতার রসিকতায় জাহাঙ্গীর পঁচিশ বছরের যুবকের মতো সবল ও দীর্ঘ। জাহাঙ্গীর তার পাশের বাড়ির বিধবা প্রমীলা মাসির সঙ্গে রাতে ঘুমাত। জাহাঙ্গীরের মা-বাবা বেশ খুশি। কারণ রাতে জাহাঙ্গীর পাশের বাড়ির একা বিধবা মাসির সঙ্গে ঘুমাতে গেলে মা-বাবার ঘুমের সময়টা নির্বিঘ্নে নিশ্চিতে পার হতো। গোল বাধল তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের সামাজিক পরিবেশের কারণে, বিধবা প্রমীলা মাসি কিছুদিন হয় জায়গা-জমি সব বিক্রি করে ভারতের কলকাতায় চলে গেছেন। জাহাঙ্গীরের বাবা-মা প্রমীলা মাসির বাড়িতে আসা নতুন প্রতিবেশীর অবিবাহিত মেয়ে রাহেলার সঙ্গে জাহাঙ্গীরকে ঘুমাতে পাঠালেন। রাহেলার বাবা-মা বেশ খুশি হলেন। যুবতী মেয়ে রাহেলা গ্রামের বাড়িতে একা ঘুমানোর চেয়ে জাহাঙ্গীর থাকলে একটু হলেও নিরাপত্তা পাওয়া যাবে। কিন্তু বিধিবাম, মাঝ রাতে ঘুমন্ত রাহেলার ওপর পুরুষত্ব জাহির করতে গেলে রাহেলার ঘুম ভেঙে যায়। রাহেলার হইচইয়ে সবাই এসে হতবাক।
প্রাকৃতিক কারণে স্বাভাবিকভাবেই বয়ঃপ্রাপ্তির পর প্রতিটি পুরুষ ও রমণীর কামনা-বাসনা জাগবে, সেটাই তো স্বাভাবিক।
কিন্তু বাংলাদেশে ধর্ষণ কী কারণে সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হচ্ছে! তিন বছরের শিশুকে ধর্ষণ! এ কোন যৌন বিকৃতি! শুধু কি তাই, মৃতের সঙ্গে যৌনমিলন। একে তো ধর্ষণ বলা যাবে না। মৃতের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সঙ্গম, মৃতের আবার ইচ্ছা! তাহলে এই যৌন বিকৃতি কেন? মাদ্রাসার শিক্ষক দ্বারা কোমলমতি ছাত্রদের ওপর বলাৎকার! তা আবার নিয়মিত। ভাবা যায়! আবার অনেক গ্রামে দেখা যায়, ছাগল-ভেড়া, মুরগিকে তরুণের বলাৎকার! কেন? কারণ পৃথিবীর যে কোনো উন্নত দেশে, জার্মান, ফ্রান্স, আমেরিকা, রাশিয়া, ব্রাজিল, ব্যাংকক এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও প্রায় প্রতিটি বড় বড় শহরে মফস্বলে বারাঙ্গনালয় বা নারী-পুরুষের মিলনের ব্যবস্থা রয়েছে। পৃথিবীর সব দেশেই, সব সভ্য-সমাজে, যৌবনের কামনা-বাসনা মেটানোর জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠে এমনি সব প্রতিষ্ঠান। যার ফলে সমাজে ব্যাধিরূপে ধর্ষণের প্রকাশ কমে আসে।
আজ থেকে প্রায় দু’হাজার বছর আগে, ইতালির পম্পেই শহর ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতে ধ্বংস হয়। সেই পম্পেই শহরেও তরুণ, যুবা-পুরুষ সবার শারীরিক ক্ষুধা মেটানোর জন্য ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু আমাদের দেশে কেবল ধনীদের জন্য নিশ্চিতে যৌনমিলনের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু আপামর সাধারণ যুব সমাজের কী হবে? সাধারণের পক্ষে তো সম্ভব নয় প্লেন চার্টার করবার। কেউ কেউ আবার প্রাইভেট প্লেনে চড়ে বিদেশে পাড়ি জমান আজ ব্যাংকক, কাল ব্রাজিল, পরশু মুলাঁ-ঘুঁজ। কিন্তুআম জনতা, বিদেশ দূরে থাক নিজ দেশের পিউ কাঁহার কাছেও ভিড়তে পারে না। তথাকথিত পাঁচতারা হোটেলে রুম বুক করতে পারে না। তাহলে সমাজের এই ধর্ষণ উপদ্রব কমবে কীভাবে?
বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের ডাকসাইটে নেতানেত্রীরা বলেছেন, মৃত্যুদ- দিয়ে ধর্ষণ রোধ করা যাবে না। ধর্ষণ রোধে শিল্প-সংস্কৃতির সুবাতাস ঘরে ঘরে ছড়িয়ে দিতে হবে। তবেই সমাজ সুন্দর হবে, ধর্ষণ কমবে। কারণ আপনারা একটু চোখ ফেরালেই দেখবেন বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনে মাঝে মাঝে ভিডিও ভাইরাল হয় কিন্তু কোনো ধর্ষণ নেই। শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনে ধর্ষণের কোনো স্থান নেই। বর্তমানে ধর্ষণের পরিণামে, পরিণয় বা বিবাহ ধর্ষণরোধে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ রাখবে বলে আমাদের সবার বিশ্বাস। ধর্ষণের উপদ্রব কমাতে বিবাহ এক বিপ্লব আনবে বলেই মনে হচ্ছে। এই যে সেদিন ‘ফেনীতে কারাগারের ফটকেই হলো ধর্ষণের মামলার আসামি ও ভুক্তভোগীর বিয়ে। উচ্চ আদালতের এক আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বৃহস্পতিবার এই বিয়ে হয়’ (প্রথম আলো, শেষ পাতা, ২০ নভেম্বর ২০২০)। সাধু! সাধু! দারুণ এক খবর! অবিশ্বাস হলেও সত্য ঐ একই দিন, ‘ঢাবি শিক্ষার্থী ধর্ষণে মজনুর যাবজ্জীবন। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) আফরোজ ফারহানা আহমেদ অরেঞ্জ’। (সমকাল, প্রথম পাতা, ২০ নভেম্বর ২০২০)। সত্যি সেলুকাস! কী বিচিত্র এই দেশ!
সেদিন শুনলাম, লাইলী বলছে, ‘মজনু ভাই, আব্বা তো, তোমার লগে আমার বিয়া দিত না।’
‘তা হইলে কী করি?’ ‘এক কাম করো।’/ ‘কী? কী? কী কাম?’/ ‘তুমি আমারে পাট-ক্ষেতে নিয়া ধর্ষণ করো।’/ ‘তুই এইডা কী কস! লাইলী। ধর্ষণ করলে পুলিশ আমারে ধরব না!’/ ‘হ, ধরব। তারপর বড়গো রায়ে আমাগো বিয়া হইব। চিন্তা কি।’/ ‘উহ! লাইলী তুই ঠিকই কইছস, আই লাব ইয়ু। ধর্ষণ করলে ধর্ষণ মামলার আসামি ও ভুক্তভোগীর বিয়ে’।/ ‘কিন্তু লাইলী, একটা কথা।’/ ‘কী কথা কও?’/ ‘মাঝে মাঝে যে দেখি গ্যাং-রেপ, মানে এক তরুণীরে কয়েকজন তরুণ ধর্ষণ করে। তখন বড়রা কার লগে ভুক্তভোগীর বিয়া দিব।’/ ‘ক্যা, মজনু ভাই, তুমি জি বাংলার সিরিয়াল দেখছ না, যারা তরুণীরে ধর্ষণ করব সবার লগে।’
লেখক : চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং রম্য লেখক
