কাভানের নিঃসঙ্গতার অবসান হলো। সঙ্গীহীন এক দশক ও ৩৫ বছরের বন্দি জীবন থেকে মুক্তির স্বাদ পেল পৃথিবীর ‘সবচেয়ে নিঃসঙ্গ হাতি’। সেই শৈশব থেকে মানুষকে বিনোদন দিতে দিতে ক্লান্ত সে। এখন তার ঠাঁই হয়েছে কম্বোডিয়ার প্রাণী অভয়াশ্রমের উন্মুক্ত পরিবেশে।
অতিমাত্রায় স্থূল ও নানান জটিলতায় ভোগা প্রাণীটিকে পাকিস্তানের চিড়িয়াখানার দুঃসহ জীবন থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কম্বোডিয়ায়।
এ উপলক্ষে শুক্রবার পাকিস্তান যান পপ তারকা চের। তিনি কাভানকে নতুন জীবনে স্বাগত জানিয়েছেন। পরে কম্বোডিয়ার বিমানবন্দরে নেমে বলেন, “আমি অত্যন্ত খুশি ও গর্বিত যে সে এখন এখানে।”
কম্বোডিয়ায় হাতিটির ঠাঁই হয়েছে একটি সুরক্ষিত বন্যপ্রাণী অভয়াশ্রমে যেখানে খোলা আকাশের নিচে আরও হাতির দল থাকে।
প্রাণী কল্যাণ নিয়ে কাজ করা সংস্থা এফপিআই-এর পশু চিকিৎসক ড. আমির খলিল বলেন, পাকিস্তান থেকে যাওয়ার সময় কাভানের আচরণ ছিল একজন নিয়মিত ভ্রমণকারীর মতো।
তিনি বলেন, কাভানকে খুব একটা বিপর্যস্ত মনে হচ্ছিল না, বরং সে খেয়েছে এবং বিমান ভ্রমণের সময় কিছুটা ঘুমিয়েছে।
কম্বোডিয়ার উপপরিবেশ মন্ত্রী নেথ ফেকাত্রা বলেছেন, কাভানকে স্বাগত জানাতে পেরে তার দেশ অত্যন্ত আনন্দিত।
“খুব বেশি দিন তাকে বিশ্বের সবচেয়ে নিঃসঙ্গতম হাতি থাকতে হবে না। আমরা আশা করছি স্থানীয় হাতির সঙ্গে তার প্রজননের ব্যবস্থা করতে পারবো। এটি এ জাত সংরক্ষণের একটি প্রচেষ্টা।”
ওদিকে অভয়াশ্রমের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার আগে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা কাভানকে কলা ও তরমুজ দেয় এবং তারা প্রার্থনা ও পবিত্র পানি ছিটিয়ে তাকে আশীর্বাদ করে।
কয়েক বছর ধরে প্রাণী অধিকারকর্মী ও বিভিন্ন সংগঠনের দাবি মুখে পাকিস্তানি চিড়িয়াখানা ছাড়ার সুযোগ পেল কাভান। এ বিষয়ে আদেশ দেয় পাকিস্তানের আদালত।
গত ৩৫ বছর ধরে চিড়িয়াখানায় রয়েছে কাভান। ২০১২ সালে হারায় সঙ্গীকে। প্রাণীটি অতিরিক্ত ওজন, অপুষ্টিসহ নানা ধরনের সমস্যায় ভুগছিল। আচরণগত জটিলতাও তৈরি হয়েছে।
বলা হচ্ছে, পাকিস্তানের শেষ এশিয়ান হাতি কাভান। তাই সে ছিল পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। তাকে দেখতে ভিড় জমে থাকত। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের উপার্জন হতো ঢের। আর মানুষের অর্থের লোভে এত বছর কাভানের কেটেছে শিকলে বন্দি অবস্থায়।
চিড়িয়াখানায় যাতে দর্শনার্থীদের ভিড় থাকে সেই জন্য হাতিটির ওপর নির্মম অত্যাচার চালাতো কর্তৃপক্ষ। খাবার-দাবারের ওপর ছিল কর্তৃপক্ষের চরম ঔদাসীন্য। দিনের পর এভাবে থাকতে থাকতে কাভান মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়ে। বছরের পর বছর ধরে শুধু অবহেলা ও অত্যাচার সয়েছে।
গত মে মাসে পাকিস্তানের হাই কোর্ট মারগাজার চিড়িয়াখানাকে কাভানকে মুক্তি দিতে নির্দেশ দেয়। ওই সময় চিড়িয়াখানায় প্রাণীদের রাখার ব্যবস্থার সমালোচনা করা হয়। এর পর সেপ্টেম্বরে শারীরিক পরীক্ষার পর কাভানের শোচনীয় অবস্থার কথা জানা যায়।
আদালতের পক্ষ থেকে বলা হয়, কাভানকে যেন কোনো অরণ্যে ছেড়ে দেওয়া হয়। যাতে সে মুক্তির স্বাদ পায়। এমন জায়গায় তাকে ছাড়তে হবে যেখানে খাবার ও পানির সরবরাহ থাকবে। আর সেই নির্দেশ মেনে এবার কাভানকে কম্বোডিয়ার ২৫ হাজার একরের বিশাল পশু সংরক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়।
শ্রীলঙ্কা সরকার ১৯৮৫ সালে কাভানকে উপহার হিসেবে পাকিস্তানে পাঠায়। ওই সময় তার বয়স ছিল এক বছর। শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে সাবেক শাসক জেনারেল জিয়া-উল-হক হাতিটি গ্রহণ করেন।
নিঃসঙ্গ কাভান পাগলের মতো আচরণ করতে থাকে ২০০২ সাল থেকে। পরে সে সঙ্গী হিসেবে পায় সহেলি নামের একটি হাতিকে। সহেলি ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে যায়।
সহেলি ২০১২ সালে মারা গেলে কাভান ‘নিঃসঙ্গতম হাতি’ হয়। তখন থেকে তার আচরণ বেশি খারাপ হতে থাকে। এক সময় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ তাকে শিকল পরায়।
