সরকার কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নে যান্ত্রিকীকরণ এবং খাতটিতে আগ্রহ বাড়াতে নারী ও তরুণদের বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এজন্য ২০১৩ সালে করা জাতীয় কৃষিনীতি ফের হালনাগাদ করেছে। তবে হালনাগাদেও উপেক্ষিত রয়েছেন শারীরিক প্রতিবন্ধীরা। নারী ও তরুণদের মতো শারীরিক প্রতিবন্ধীদের কৃষি খাতে উৎসাহিত করা উচিত। এতে সহজেই অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া এ জনগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থানের আওতায় আনা সম্ভব হবে। তাদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে কৃষি সচিব মো. মেজবাহুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধীদের জীবনমান উন্নয়নে নানা সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। দুই বছর আগে জাতীয় কৃষি নীতিমালা হালনাগাদ করা হয়েছে। সেখানে প্রতিবন্ধীদের বিষয়ে কিছুই নেই। ভবিষ্যতে দ্বৈততা না হলে কৃষি খাতে প্রতিবন্ধীদের অগ্রাধিকারের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তবে এজন্য বিশদ পরীক্ষা-নিরীক্ষার দরকার রয়েছে।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, কৃষিপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতে উদ্বুদ্ধ করতে সরকার কৃষকদের বিভিন্ন সহায়তা দিচ্ছে। এজন্য কৃষিসেবা সংক্রান্ত পৃথক নীতিমালা ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে ২০১৩ সালে জাতীয় কৃষিনীতি প্রণয়ন করা হয়। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ২০১৮ সালে এটির হালনাগাদ হয়। ২০১৩ সালে ছিল না এমন অনেক বিষয় এতে সংযুক্ত করা হয়। ২০১৩ সালে জাতীয় কৃষিনীতিতে ১৮টি অধ্যায়ে ৬৩টি অনুচ্ছেদ ছিল। তবে হালনাগাদে অধ্যায় বেড়ে ২২টি এবং ১০৬টি অনুচ্ছেদের সঙ্গে উপ-অনুচ্ছেদও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমাজে কথিত দুর্বল অবস্থান দেখিয়ে কৃষি খাতে প্রতিবন্ধীদের কোনো সহায়তার সুযোগ রাখা হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেশিরভাগ প্রতিবন্ধী কৃষিপণ্য উৎপাদনে সাফল্য পেলেও তা বিক্রি করে নিজ পরিবারে তেমন আর্থিক অবদান রাখতে পারেন না। আর এর পেছনে দায়ী প্রতিবন্ধীদের কৃষিপণ্য বাজারজাতে নানা প্রতিবন্ধকতা। বাজারসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতি, সম্পর্ক না থাকা, বাজার সম্পর্কে তথ্যের অভাব ও সংরক্ষণ পদ্ধতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ না থাকায় তারা উৎপাদিত পণ্যের সঠিক দামও পান না।
প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, আমাদের দেশে প্রতিবন্ধীরা নানা কুসংস্কারের বলি হচ্ছেন। এজন্য সরকারও তাদের কৃষি খাতের জন্য অপাঙ্ক্তেয় মনে করে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার পথ রুদ্ধ রাখে। প্রতিবন্ধীরা জমি, জলাশয়, মূলধন, কৃষির আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকেও বঞ্চিত। মোদ্দা কথা প্রতিবন্ধীদের কৃষি খাতে অংশগ্রহণের সহায়ক পরিবেশই তৈরি করা হয়নি। দেশে প্রতিবন্ধীর অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩ রয়েছে। কিন্তু জাতীয় কৃষিনীতিসহ এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন নীতিমালায় তাদের অধিকার, সরকারি সেবা ও সুযোগ-সুবিধার বিষয় উল্লেখ করা হয়নি।
এ বিষয়ে বেসরকারি সংস্থা লেপ্রসি মিশনের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর জিপ্তাহ বৈরাগী বলেন, ‘একজন প্রতিবন্ধী যদি একইসঙ্গে কৃষকও হন, তাকে দুটি সুবিধা দিতে সমস্যা কোথায় আমার বুঝে আসে না। এখানে দ্বৈততার সুযোগ নেই। কারণ প্রতিবন্ধীদের এগিয়ে নিতে সমতানীতির চেয়ে ন্যায্যতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। আর সরকারকেই এজন্য সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে।’ এ বিষয়ে পরিকল্পনা বিভাগের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. সামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসন্ন অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০২০-২০২৫) পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির মূল স্রোতে আনার বিষয়ে নানা পদক্ষেপের উল্লেখ থাকবে। অনেক জায়গায় প্রতিবন্ধীরা কৃষিক্ষেত্রে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ রাখছেন। তাদের জন্য আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। ফলে নতুন পরিকল্পনাতে দারিদ্র্যসীমা কমিয়ে আনতে প্রতিবন্ধীদের স্বনির্ভর করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।’
