ক্রিকেটের বাইবেলখ্যাত ‘উইজডেন’ কদিন আগে বেশি বয়সে ক্যারিয়ার শুরু করা ক্রিকেটারদের একটি তালিকা প্রকাশ করে। তাতে খুব বেশি নামি ক্রিকেটার ছিলেন না। মাইকেল হাসি, সাঈদ আজমল এ দুজনই ছিলেন পরিচিত। এবার উইজডেন প্রকাশ করল অল্প বয়সে টেস্ট অভিষিক্ত যারা নিজেদের কিংবদন্তিতে রূপান্তর করেছেন তাদের তালিকা। সেই একাদশটির নাম ‘উইজডেন টিনেজ রায়ট ইলেভেন’। এই দলের প্রত্যেকের টেস্ট অভিষেক হয়েছে তরুণ বয়সে। সেই নক্ষত্ররাজিতে আছেন বাংলাদেশের একজন, মুশফিকুর রহিম। উইজডেনের চোখে তরুণ বিপ্লবীদের একজন এই উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান। এ ছাড়া এই দলের অধিনায়ক পাকিস্তান কিংবদন্তি ইমরান খান। বাকিরা হচ্ছেন অস্ট্রেলিয়ার নিল হার্ভে ও প্যাট কামিন্স, ভারতের শচিন টেন্ডুলকার ও অনিল কুম্বলে, ইংল্যান্ডের ডেনিস কম্পটন, দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রায়েম পোলক, উইন্ডিজের গ্যারি সোবার্স, নিউজিল্যান্ডের মার্টিন ক্রো ও পাকিস্তানের ওয়াসিম আকরাম।
উইজডেনের এই একাদশ বাছাইয়ে কিছু নিয়ম ছিল। এক দেশ থেকে দুজন ক্রিকেটারকে নেওয়া যাবে না। আবার বিবেচনায় নেওয়া হয়নি ক্রিকেটারদের তরুণ বয়সের পারফরম্যান্স। তার চেয়ে পুরো ক্যারিয়ারের কীর্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। টিনএজ বয়সে টেস্ট অভিষেক হলেও বয়স ৩০ পেরিয়েও যারা দলের অন্যতম ভরসা ছিলেন তাদেরই বিবেচনা করা হয়েছে। এইসব বিচারেই তরুণ বিপ্লব নামে সেরা একাদশ প্রকাশ করেছে এই হিসাবে চলে এসেছেন মুশফিকুর রহিম। মাত্র ১৮ বছর ১৭ দিন বয়সে ক্রিকেটারদের স্বপ্নের মাঠ লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হয়েছিল মুশফিকের। ৩০ পেরিয়ে এখনো বাংলাদেশের ব্যাটিংলাইনের সেরা ভরসা তিনি। ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত ৭০ টেস্ট খেলেছেন মুশফিক। ৩৫.৭৭ গড়ে তার রান ৪৪১৩। হাফসেঞ্চুরি ২১টি, সেঞ্চুরি ৭টি। এর মধ্যে তিনটিকে ডাবলে রূপান্তর করেছেন তিনি। সেঞ্চুরিকে একাধিক দ্বিশতকে রূপান্তর করা একমাত্র বাংলাদেশিও এই ব্যাটসম্যান।
মুশফিকের ক্যারিয়ারের কিকস্টার্ট কিন্তু ভালো ছিল না। মাত্র ১৯ রানে তার টেস্ট অভিযান শুরু হয়। প্রথম ২০ ইনিংসে মাত্র দুটি হাফসেঞ্চুরি। অবশ্য নিজেকে শুধরে পরের ২০ ইনিংসেও বদলে যাওয়া মুশফিককে দেখা যায়। এই সময়ে তার প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি আসে। বাকি চার হাফসেঞ্চুরির ইনিংসে একটি ছিল ৯৫ রানের। তার পাশাপাশি পঞ্চাশ ছোঁয়া ইনিংসও ছিল বেশ কয়েকটি। এরপরে সময়ের সঙ্গে নিজেকে আরও পরিণত করেছেন মুশফিক। ২০১৩ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গল টেস্টে ঠিক ২০০ করেন। এ ছাড়া ২০১৮তে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঢাকায় ক্যারিয়ারে সর্বোচ্চ অপরাজিত ২১৯ এবং গত বছর একই ভেন্যুতে জিম্বাবুয়ের সঙ্গেই ২০৩ রানে অপরাজিত থাকেন।
উইজডেনের তরুণ বিপ্লবীরা
নিল হার্ভে : এই একাদশ একটু পিছিয়ে আছে স্পেশালিস্ট ওপেনার না থাকায়। সেজন্য তিনে খেলা ব্যাটসম্যানদের ওপেনে রাখা হয়েছে। তাতে প্রথমে আছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার নিল হার্ভে। ১৯৪৮ সালে অভিষিক্ত এই ক্রিকেটার ৭৯ টেস্টে ৪৮ গড়ে করেছেন ৬১৪৯ রান। তরুণ বয়সেই অ্যাশেজে সেঞ্চুরি করেছেন। স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের সঙ্গে জুটি বেঁধে টেস্ট জেতানোর কৃতিত্বও আছে তার।
শচিন টেন্ডুলকার : হার্ভের সঙ্গে ওপেনার হিসেবে রাখা হয়েছে শচিন টেন্ডুলকারকে। টেস্টে ওপেন না করলেও ওয়ানডেতে দারুণ ওপেনিং ক্যারিয়ার তার। মাত্র ১৬ বছর বয়সে অভিষিক্ত শচিন ২০১৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ও সাফল্যময় ক্যারিয়ার পার করেছেন। ২০০ টেস্টে ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বোচ্চ রান স্কোরারও তিনি, ১৫ হাজার ৯২১। ক্রিকেটের তিন ফরম্যাট মিলিয়ে সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি করা একমাত্র উদাহরণ এই শচিন।
ডেনিস কম্পটন : মাত্র ১৯ বছর বয়সে হাফসেঞ্চুরি দিয়ে টেস্ট ক্যারিয়ার শুরু করেন এই ইংলিশ কিংবদন্তি। ১৯৩৯ সালে হয়েছেন উইজডেনের চোখে বর্ষসেরা ক্রিকেটার। তার ক্যারিয়ারের ১৭ সেঞ্চুরির ১৫টিই এসেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। ৭৮ টেস্টে ৫০ গড়ে ৫৮০৭ রান তার।
মার্টিন ক্রো : বিংশ শতাব্দীতে নিউজিল্যান্ডের ক্লাসিক ব্যাটসম্যান বলা হয় তাকে। ১৯৮২তে মাত্র ১৯ বছর বয়সে টেস্ট অভিষেক তার। ক্যারিয়ারের প্রথম ৫ ইনিংসেই এক অঙ্কের বেশি রান করতে পারেননি ক্রো। কিন্তু আশির দশকে নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ৭৭ টেস্টে ৪৫ গড়ে তার রান ৫৪৪৪।
গ্রায়েম পোলক : দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যানের টেস্ট অভিষেক ১৯ বছর বয়সে। বর্ণবাদ ২৬ বছর বয়সেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নির্বাসিত করে তাকে। না হলে তার ক্যারিয়ার আরও উঁচুতে যেত। যে ২৩ টেস্ট তিনি খেলেছেন তাতেই ৬০.৯৭ গড়ে রান করেছেন ২২৫৬।
গ্যারি সোবার্স : ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার বলা হয় স্যার গারফিল্ড সোবার্সকে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে অভিষেক হলেও চার বছরে মাত্র একটি হাফসেঞ্চুরি করেছিলেন। কিন্তু ২১ বছরে পা রাখার পরই বদলে যান। পকিস্তানের বিপক্ষে টানা তিন ইনিংসে ৩৬৫*, ১২৫, ১০৯ রান করে নিজের জাত চেনান। ৯৩ টেস্টে ৫৭ গড়ে করেছেন ৮০৯২ রান ও নিয়েছেন ২৩৫ উইকেট।
ইমরান খান : এই একাদশে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্য অধিনায়ক। ইতিহাসের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডর। অথচ তরুণ অবস্থায় মাত্র ১ টেস্ট খেলেছেন তিনি। শুরুর দিকে বেশ ধীর ছিল তার ব্যাটিং-বোলিং গড়। প্রথম ৯ টেস্টে ব্যাটে ২২ গড় এবং বলে ৪৩ গড় তার। কিন্তু পাকিস্তান ইমরানকে চিনেছিল। তাই শেষ ৫৩ টেস্টে ব্যাটিংয়ে ৫৩ গড় এবং বোলিংয়ে ১৯ গড় তোলেন ইমরান খান। মোট ৮৮ টেস্টে ৩৭.৬৯ গড়ে ৩৮০৭ রান তার, উইকেট ৩৬২টি।
অনিল কুম্বলে : ইমরান খানের মতো ২০ বছর আগে একটি মাত্র টেস্ট খেলা ক্রিকেটার অনিল কুম্বলে। কিন্তু ক্যারিয়ার শেষ করেছেন ১৩২ টেস্টে ৬১৯ উইকেট নিয়ে। ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ উইকেটশিকারির এক টেস্ট ইনিংসের সবকটি (১০ উইকেট) নেওয়া মাত্র দ্বিতীয় বোলার তিনি।
ওয়াসিম আকরাম : ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা বাঁহাতি পেসার। তাকে সুইং সম্রাটও বলা হয়। আর সবার মতো অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেকে পরিণত করতে হয়নি ওয়াসিম আকরামকে। শুরু থেকেই বিশ্ব শাসন করেন তিনি। মাত্র ১৮ বছর বয়সে নিজের দ্বিতীয় টেস্টেই এক টেস্টে ১০ উইকেট নেন। ১০৪ টেস্টে তার সংগ্রহ ৪১৪ উইকেট। রান করেছেন ২৮৯৮, তবে তার ক্যারিয়ার সেরা ২৫৭* আট নম্বরে নেমে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ড।
প্যাট কামিন্স : এই একাদশে জায়গা পাওয়া বর্তমান সময়ের দ্বিতীয় ক্রিকেটার। ১৮ বছর বয়সে অভিষেকে আলোড়ন তুলেছিলেন এই অজি। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অভিষেক টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ৭৯ রানে ৬ উইকেট নেন। কিন্তু ইনজুরিতে পড়ে প্রায় ৬ বছর দলের বাইরে ছিলেন। তবুও হাল ছাড়েননি। ফিরে এসে অস্ট্রেলিয়ার সেরা পেসারদের একজন হয়েছেন ৩২ টেস্টে ১৫৩ উইকেট নিয়ে।
