মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার তিন বছরের বেশি পেরিয়ে গেলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে উল্লেখযোগ্য কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি নেই। ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর ওআইসির মাধ্যমে জাতিসংঘের গণহত্যা সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ গাম্বিয়ার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে করা মামলায় যে আশার সঞ্চার হয়েছিল সেক্ষেত্রেও অগ্রগতি খুব সামান্যই। এদিকে, গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্লেনারি সেশনে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যে প্রস্তাব পাস হয়েছে, তাতে আশাবাদী হওয়ার চেয়ে নিরাশার ভাগই বেশি। কেননা, চীন ও রাশিয়ার মতো বিশ^ পরাশক্তিগুলো এবারও মিয়ানমারের পক্ষেই ভোট দিয়েছে। অন্যদিকে, ভারত ও জাপানের মতো আঞ্চলিক পরাশক্তি ও বাংলাদেশের মিত্র দেশগুলো ভোটদানে বিরত থেকে প্রকারান্তরে মিয়ানমারের পক্ষই নিয়েছে। অবশ্য, কূটনীতিবিদরা বলছেন জাতিসংঘের নতুন এই প্রস্তাবে নতুন ৯টি দেশের আগের অবস্থান পরিবর্তন করে মিয়ানমারের বিপক্ষে ভোটদান অবশ্যই ইতিবাচক ঘটনা। সাধারণ পরিষদের প্লেনারি সেশনে ১৩০-৯ ভোটে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। নতুন করে প্রস্তাবের পক্ষে অর্থাৎ মিয়ানমারের বিপক্ষে ভোট দেওয়া দেশগুলো হলো ক্যামেরুন, ইকুইটরিয়াল গিনি, কেনিয়া, লেসেথো, মোজাম্বিক, নামিবিয়া, তানজানিয়া, পালাউ ও সলোমন আইল্যান্ড।
রাখাইনে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি পর্যালোচনায় গঠিত কফি আনান কমিশনের সদস্য লেটিটিয়া ফন ডেন আসুম এক টুইটে ফল বিশ্লেষণ করে লিখেছেন, এই ৯ দেশ ২০১৯ সালে একই ধরনের অন্য প্রস্তাব গ্রহণের সময় ভোটদানে বিরত থেকেছিল। এবার তারা অবস্থান বদলালো। লক্ষ করবার মতো বিষয় হলো, কেবল ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াই নয়, ভুটান, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মতো ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীরাই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ন্যায্য দাবির পক্ষে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে আসছে না। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের নীরবতা ও চীনের মিয়ানমারের পক্ষে ভোট দেওয়া হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন দেশের কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ভৌগোলিকভাবে ক্ষুদ্র আয়তনের কিন্তু অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে ১১ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হলেও এ বিষয়ে বিশ্ব পরাশক্তি ও দাতাগোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা মোটেও সন্তোষজনক নয়। এই মুহূর্তে বাংলাদেশই এককভাবে দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি শরণার্থীকে আশ্রয়দাতা দেশ। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরগুলো পরিচালনা করতে গিয়ে কক্সবাজার জেলার
প্রাকৃতিক পরিবেশের যে ক্ষতি হয়েছে, তা আর কোনো দিনই পূরণ হবে না। বনভূমি তো উজাড় হয়েছেই, সামাজিক যে ক্ষতি হয়েছে, তাও অপূরণীয়। এমতাবস্থায় শরণার্থী শিবিরগুলোর জীবনমান উন্নয়নে এবং নিরাপত্তা বিধানের স্বার্থে উপকূলীয় দ্বীপ ভাসানচরে অন্ততপক্ষে ১ লাখ রোহিঙ্গাকে স্থানান্তরের প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার। ভাসানচরে নির্মাণ করা হয়েছে ১২০টি গুচ্ছগ্রাম। তাতে শেড হাউজের সংখ্যা ১ হাজার ৪৪০। সরকার তো রেশন দিচ্ছেই। ২২টি এনজিও সাহায্য সামগ্রী নিয়ে সেখানে গেছে। কিন্তু একদিকে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের বিরোধিতা করা, আরেকদিকে ১০ বছরের জন্য রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করার লক্ষ্যে দাতা গোষ্ঠীর ৬০০ মিলিয়ন ডলার বা ৬০ কোটি ডলারের তহবিল গঠনের প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগের বদলে আরও দশ বছর কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার দাতাদের তৎপরতায় প্রশ্ন উঠছে যে, দাতারা কি চায় যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশেই থাকুক? একইভাবে এই প্রশ্নও করা যায় যে, এই দাতা দেশগুলো তাহলে রোহিঙ্গা শরণার্থী গ্রহণে ইচ্ছুক নয় কেন? ২০২০ সালের ২২ অক্টোবরে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার মধ্যস্থতায় যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো দাতাদের এই অবস্থানকেও তাই প্রশ্ন করা জরুরি।
অন্যদিকে, পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে রোহিঙ্গা সংকট দূর করতে যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, সেখানে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য একটি ‘নিরাপদ অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন। কিন্তু পরে দেখা গেল, সে রকম কিছুর নিশ্চয়তা বা আন্তর্জাতিক কোনো গ্যারান্টি ছাড়াই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক সই করেছে। আন্তর্জাতিক বা বহুপক্ষীয় উদ্যোগের বদলে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার সিদ্ধান্তটি যে সঠিক ছিল না সেটা এখন বলাই যায়। বিদায় ২০২০ সালের আগস্টে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব নতুন করে আন্তর্জাতিক তদারকিতে আরাকান রাজ্যে একটি নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু ভারতের মতো বৃহৎ প্রতিবেশী এবং চীন ও রাশিয়ার মতো বিশ^ পরাশক্তির সমর্থন ছাড়া যে এসব কোনো প্রস্তাবই সামনে এগুবে না সেটা বলাই বাহুল্য। এমতাবস্থায় আঞ্চলিক এবং বৈশি^ক পর্যায়ে কূটনীতি জোরদার করা ছাড়া বাংলাদেশের সামনে আর কোনো বিকল্প আছে কি?
