বন্দরে বিদেশি বিনিয়োগ

জাতীয় স্বার্থে স্বচ্ছতা দরকার

আপডেট : ০৪ জুন ২০২৬, ১২:৩৬ এএম

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর কৌশলগত স্থাপনাগুলোর একটি। অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, বিনিয়োগ, জ¦ালানি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাসহ জাতীয় স্বার্থের দিক থেকে এর গুরুত্ব অপরিসীম। শিল্পের কাঁচামালসহ জরুরি আমদানি এবং রপ্তানির জন্য প্রধান বন্দর হিসেবে ব্যবহৃত হয় বলে একে সার্বক্ষণিক চালু রাখার পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা উন্নততর করে বন্দরজট কমানোর তাগিদ আছে। একই কারণে সেবার মান বাড়ানোর জন্য এখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা বেড়ে চলেছে। দেশ রূপান্তরে বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্দরে বিদেশিদের বিনিয়োগের যে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে, তা প্রধানত ইতিমধ্যে গড়ে তোলা সুবিধা কাজে লাগিয়ে টার্মিনালগুলো পরিচালনার জন্য।

দেশের অর্থনীতিতে গতি আনার ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা আছে বে-টার্মিনাল, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর ও লালদিয়া টার্মিনাল। বে-টার্মিনাল প্রকল্পের আওতায় দুটি টার্মিনালে বিনিয়োগের জন্য সরকারের সঙ্গে দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড ও সিঙ্গাপুরের পোর্ট অব সিঙ্গাপুর সমঝোতা স্মারক সই করেছে। পতেঙ্গার লালদিয়া চরে বিনিয়োগের বিষয়ে চুক্তি করেছে ডেনমার্কের মায়ের্সক কোম্পানি। একই এলাকায় দেশীয় কোম্পানি এমজিএইচ একটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের জন্য চুক্তি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। কিন্তু সময়সাপেক্ষ নতুন বিনিয়োগের স্থলে ডিপি ওয়ার্ল্ড ও জেদ্দাভিত্তিক রেড সি গেটওয়েসহ (আরএসজিটি) কয়েকটি বিদেশি কোম্পানি এখন আগ্রহী বিদ্যমান টার্মিনালগুলো পরিচালনায়। বন্দরের সবচেয়ে আধুনিক টার্মিনাল হলো নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), যা ‘রেডিমেড’ অবস্থায় রয়েছে। প্রধানত এ দুটি  টার্মিনাল পরিচালনায় আসতে চায় বিদেশি কোম্পনিগুলো। ডিপি ওয়ার্ল্ড চায় এনসিটি ও সিসিটি। আবার আরএসজিটি-ও সরকারি-বেসরকারি যৌথ মালিকানায় সিসিটি পরিচালনায় আগ্রহী। বিদেশিদের এমন আগ্রহের কারণ যে অস্পষ্ট, তা নয়। তারা আসলে ন্যূনতম বিনিয়োগে ‘ব্যবস্থাপনার মান’ কিছুটা উন্নত করে লগ্নি করা টাকা দ্রুত তুলে লাভে যেতে চায়। বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনারের ৪৪ শতাংশ এনসিটিতে, ৩৬ শতাংশ জিসিবিতে (জেনারেল কার্গো বার্থ), ১৬ শতাংশ সিসিটিতে এবং প্রায় ৪ শতাংশ পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে হ্যান্ডলিং হয়েছে। ড্রাফট ও আধুনিক ইকুইপমেন্ট বেশি থাকায় বড় জাহাজগুলো এনসিটি ও সিসিটিতে ভিড়ে এবং কনটেইনারও বেশি হ্যান্ডলিং করে। নতুন বন্দরের চেয়ে এখানেই বিনিয়োগ হয়তো অনেক সুবিধাজনক মনে করছে বিদেশিরা।

বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি আমরাও মনে করি, নতুন টার্মিনাল পুরোদমে চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত বন্দরের বর্তমান সুবিধাদি পুরোমাত্রায় সচল রাখতেই হবে। সেবার মান বাড়াতে যদি বিদেশি বিনিয়োগ নিতেই হয়, তাতে বিদেশিদের সঙ্গে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের অংশীদার রাখা যেতে পারে। এতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বিকাশ লাভ করবে, দেশের টাকা দেশে থাকবে।

আরও কয়েকটি বিষয়ে নজর রাখাও গুরুত্বপূর্ণ বলে আমরা মনে করি। চট্টগ্রাম বন্দর ও মিয়ানমারের রাখাইনসহ পুরো বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর অঞ্চলে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির নজর আছে। কৌশলগত কারণে তারা এ অঞ্চলে নিজ নিজ প্রভাব জারি রাখতে চায়। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে প্রভাবের প্রতিযোগিতা আছে। বিদেশি বিনিয়োগকারী কোম্পানি যারা আসতে চায়, তারা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে কেবলই বন্দর পরিচালনার মাধ্যমে ব্যবসা করতে এলে আমরা সতর্কতার সঙ্গে স্বাগত জানাতে পারি। তবে এক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থের দিক থেকে পক্ষপাতহীন সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হয়ে কারা আসছে, সরকার ও সরকারের বাইরে প্রভাবশালী কেউ দেশের স্বার্থের বাইরে শুধুই ব্যক্তি ও গোষ্ঠী-স্বার্থে সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করছে কি না, সেসব বিষয়ে সরকারকে অবহিত থাকতে হবে। জাতীয় স্বার্থে নাগরিকদের পক্ষে এটুকু আশা আমরা করতেই পারি। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত