করোনার সময়ে চট্টগ্রামের হাসপাতাল ও করোনা শনাক্তকরণ ল্যাব থেকে মেডিকেল ও বেসরকারি হাসপাতালের রোগীদের সাধারণ বর্জ্য সংগ্রহ করে নিরাপদ স্থানে পরিশোধনের পর ধ্বংস করছে ‘চট্টগ্রাম সেবা সংস্থা’ নামক এক প্রতিষ্ঠান।
যখন কেউ কিছু করছে না কোভিড-১৯ আতঙ্কে, এ সংস্থাটি সামান্য অর্থের বিনিময়ে ঝুঁকি নিয়ে মাসের পর মাস এসব বিপদজনক বর্জ্য নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার কাজটি এখনও অব্যাহত রেখেছে।
চট্টগ্রামে প্রথম কোভিড-১৯ শনাক্ত হয় ৩ এপ্রিল। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা। এরমধ্যে চমেক, পার্কভিউ, ইম্পেরিয়াল ও সিটি করপোরেশনের আইসোলেশন সেন্টারে চিকিৎসা নেয়া করোনা রোগীর চিকিৎসা বর্জ্য ও হাসপাতালের রোগীদের সাধারণ বর্জ্য ঝুঁকি নিয়ে সরিয়েছে সংস্থাটি।
চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে মাসিক একটি অর্থের বিনিময়ে বর্জ্য অপসারণ করলেও করোনার সময়ে ব্র্যাকের ১২টি করোনা বুথ থেকে পাঁচমাস কোনো চার্জ ছাড়াই সেবা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক মিয়া মাহমুদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাসপাতালগুলোতে ১১ ধরনের বর্জ্য তৈরি হয়। এসব বর্জ্য পরিবেশের জন্য যেমন ক্ষতিকর তেমনি মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও থাকে। করোনা সময়ে সেবা সংস্থা যদি এই কাজটি না করতো তাহলে এসব যত্রতত্র ছড়িয়ে যেত। এতে পরিবেশের মারাত্মক প্রভাব পড়তো। করোনার সময়ে হাসপাতাল বর্জ্যগুলো যে সেবা সংস্থা এসব বর্জ্য ধ্বংস করেছে তারা পরিবেশের জন্য উপকার করেছে। এই কাজটি করে তারা সত্যি সাহসিকতা ও মানবিকতার দৃষ্টান্ত রেখেছে।
তিনি বলেন, তারা হালিশহরের আনন্দবাজারের তাদের ডাম্পিংয়ে বর্জ্যগুলো ধ্বংস করে। তারা ভবিষ্যতে যদি আধুনিক ইনসিনেরেটর স্থাপন করে তাহলে আরও ভালো হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনার সময়ে চট্টগ্রাম সেবা সংস্থার চেয়ারম্যান জমির উদ্দিনসহ মোট ৩৫ কর্মচারী সরাসরি বর্জ্য সংগ্রহ ও ধ্বংস করার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে চেয়ারম্যান কোভিড আক্রান্ত হলেও বর্জ্য সংগ্রহকারী কর্মীরা কেউ করোনা আক্রান্ত হয়নি। এ জন্য সুরক্ষা সামগ্রী আর নিজেদের সচেতনতাকেই বড় করে দেখছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা কর্মচারীরা।
চট্টগ্রাম সেবা সংস্থার চেয়ারম্যান জমির উদ্দিন বলেন, করোনা সময় মানুষ যখন বাসা থেকে বের হতে ভয় পেত।
বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতালের দরজা যখন বন্ধ, তখন আমরা চমেক হাসপাতাল, ইম্পেরিয়াল, সিটি করপোরেশনের আইসোলেশন সেন্টার, হলি ক্রিসেন্টসহ বেসরকারি আরো হাসপাতালের বর্জ্য সংগ্রহ করেছি। অনেক এলাকায় হাসপাতাল রয়েছে, সেসব এলাকায় লোকজন বর্জ্য সংগ্রহ করতে যেতে দেয়নি আমাদের কর্মীদের। আমি গিয়ে বুঝিয়েছি যে, এসব মেডিকেল বর্জ্য নিয়ে যেতে না পারলে তো আপানাদের ক্ষতি। তারপর বর্জ্য সংগ্রহ করেছে কর্মীরা। এই সংস্থাটি হাসপাতালগুলোর বর্জ্য সংগ্রহের বিনিময়ে যে অর্থ পায় তা দিয়ে চলে।
তিনি বলেন, স্বাভাবিক সময়ে যেই কাজ ২ ঘণ্টায় হয়ে যেত, করোনা সময়ে হাসপাতাল বর্জ্য সংগ্রহ করতে আমাদের কর্মীদের সময় লেগেছে ৬-৮ ঘন্টা। তারমধ্যে অনেক বেসরকারি হাসপাতাল বন্ধ ছিলম তারপরও কর্মীদের বেতন দিয়েছি, বোনাস দিয়েছি। একমাত্র সে সময়ে মেয়র আজম নাছির উদ্দিন ও আমার ভাই সাবেক কাউন্সিলর গিয়াস উদ্দিন যে ঝুঁকি নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, সেই কাজে আমিও অংশ নিয়েছি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী। শুধু মানবিকতার কারণে। নিজে করোনা আক্রান্ত হয়েছি তবে, কোনো কর্মী সংক্রমিত হয়নি।
২০১৫ সালে অনুমোদন পাওয়া চট্টগ্রাম সেবা সংস্থাটি ২০১৭ সালে ১০০টি এবং সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেড়শ সরকারি বেসরকারি হাসপাতাল এবং ক্লিনিক থেকে মেডিকেল বর্জ্য অপসারণ করে ৫০০ থেকে পাঁচহাজার টাকার বিনিময়ে।
তবে করোনার সময়ে অর্থ দিয়েও যেখানে মানুষ কাজের লোক পায়নি সেখানে সংস্থাটি প্রশংসনীয় কাজ করেছে জানিয়ে চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার প্রকোপ শুরু হলে মানুষ হাসপাতালের আশেপাশে যেত না মৃত্যুর ভয়ে, রাস্তায় বের হতো না। তখন চট্টগ্রাম সেবা সংস্থা ঝুঁকি নিয়ে চমেক হাসপাতাল, নমুনা শনাক্তকরণ বুথ এবং বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল থেকে মেডিকেল বর্জ্য অপসারণ করেছে। তাদের এই অবদান সত্যি প্রশংসার দাবি রাখে। করোনার সময়ে চমেকের মতো বড় হাসপাতালে বিভিন্ন রোগী ভর্তি অব্যাহত ছিল, বেসরকারি হাসপাতালের রোগীর চিকিৎসা ও সাধারণ বর্জ্যগুলো অপসারণ করে তারা স্বাস্থ্য ঝুঁকি হ্রাস করেছে।
চট্টগ্রাম সেবা সংস্থার ম্যানেজার ইসমাইল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ওই সময়ে হাসপাতালগুলো কর্মীদের নিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে বর্জ্য অপসারণের দায়িত্ব পালন করেছি। কর্মীদের পিপিই পরিয়ে এবং প্রতিটি হাসপাতালের বর্জ্য অপসারণ করে জীবানুনাশক স্প্রে করে তাদের সুরক্ষিত রেখেছি। মনে সাহস ছিল আর সচেতনতাকে পুঁজি করে আমাদের কর্মীরা এই কাজটি করেছে। সে সময়ে আমাদের দুটি গাড়িতে এসব বর্জ্য অপসারণ করা হতো। ল্যাবগুলোতে নমুনা সংগ্রহের পর বর্জ্যগুলো আমাদের কর্মীরা নিয়ে আসতো। হাসপাতাল থেকে সাধারণ বর্জ্য মেডিকেল বর্জের মধ্যে অ্যানাটমিক্যাল বর্জ্য, ক্লিনিক্যাল বর্জ্য, ব্যান্ডেজ তুলাসব বর্জ্য আমরা বিভিন্ন ধাপে পরিশোধন করে ধ্বংস করেছি ডাম্পিং স্টেশনে।
