ভারতীয় ক্রিকেট দলের অস্ট্রেলিয়া সফর মানেই যেন ক্রিকেট আর বিতর্কের হাত ধরাধরি করে হাঁটা! অতীতের মতো দুই দলের বর্তমান সিরিজেও নানা বিতর্কিত ঘটনা খবরের শিরোনাম হচ্ছে।
দুই দলের সিরিজ বিতর্কহীনভাবে শেষ হবে এ যেন অকল্পনীয়!
চলমান সিডনি টেস্টের কথাতেই আসা যাক। শনিবার ও রবিবার গ্যালারি থেকে জাসপ্রিত বুমরাহ ও মোহাম্মদ সিরাজের উদ্দেশে বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্য শোনা গিয়েছে বলে অভিযোগ জানিয়েছে বিসিসিআই।
লিখিতভাবে সেই অভিযোগ জানানো হয়েছে। মাঠ থেকে ৬ জন দর্শককে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
ভারতীয় দল চতুর্থ টেস্ট খেলবে ব্রিসবেনে। সেখানে গিয়ে কঠোর করোনা বিধি মানতে রাজি নয় দলটি। লিখিতভাবে তা তারা জানিয়েও দিয়েছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে। ব্রিসবেনের সেই ম্যাচ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক টিম পেইনও ভারতের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন।
অতীতে ফিরে গেলেও এমন উত্তেজনার নানা গল্প সামনে আসবে। সে রকম কিছু ঘটনাতেই চোখ ফেরানো যাক-
ঘটনা-১
১৯৮১ সালে ফেরা যাক। সুনিল গাভাস্কারের নেতৃত্বে ভারতীয় দল সেবার প্রথম অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সিরিজ ড্র করে ফেরে। কিন্তু বিতর্ক তৈরি হয় দ্বিতীয় ইনিংসে গাভাস্কারের আউট নিয়ে।
ডেনিস লিলির বল গাভাস্কারের প্যাডে লাগলে আউটের সিদ্ধান্ত জানান আম্পায়ার রেক্স হোয়াইটহেড। গাভাস্কার বারবার ব্যাট দিয়ে প্যাডে আঘাত করে বুঝিয়ে দিতে চান বল ব্যাটে লেগেছে।
আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন গাভাস্কার। এমন সময় লিলি তার উদ্দেশে কিছু বলেন। গাভাস্কার ফিরে এসে চেতন চৌহানকে বলে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে।
অধিনায়কের সঙ্গে ফেরার পথ ধরেন চেতন। দলের ম্যানেজার শহীদ দুরানি বাউন্ডারি পেরোনোর আগেই বুঝিয়ে ফেরত পাঠান অপরাজিত চৌহানকে। ম্যাচটি জিতে সিরিজে সমতা ফেরায় ভারত। তৈরি হয় ইতিহাস।
ঘটনা-২
সাল ১৯৯৯। সে বার ভারতীয় দলের নেতৃত্বে ছিলেন শচিন টেন্ডুলকার। বিতর্ক ফের ভারত অধিনায়ককে ঘিরেই। বল করছিলেন অজি পেসার গ্লেন ম্যাকগ্রা। স্কোরবোর্ড বলবে অ্যাডিলেডে প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি শচিনকে এলবিডব্লু করেছিলেন।
সে দিন শচিনের পায়ে নয়, বল লেগেছিল কাঁধে। বাউন্সার ভেবে ডাক করতে গিয়েছিলেন শচিন। কিন্তু বল লাফায়নি। এসে লাগে শচিনের কাঁধে। আউটের আবেদন জানায় অস্ট্রেলিয়া। ড্যারিল হার্পার আঙুল তুলে দেন। আজও প্রশ্ন ওঠে সেই আউট নিয়ে।
ঘটনা-৩
সাল ২০০৮। সিডনি টেস্ট। কুখ্যাত মাঙ্কিগেট বিতর্ক। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ভারতের সিরিজ খেলতে গিয়ে সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনা বোধ হয় এটাই। বলা ভালো এই সিরিজটাই।
কী ঘটেছিল সিডনি টেস্টে? অস্ট্রেলীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী হারভাজান সিং ব্যাট করার সময় অস্ট্রেলিয়ার অলরাউন্ডার অ্যান্ড্রু সাইমন্ডসকে ‘বাঁদর’ বলেন। বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্য করার জন্য শুধু মাঠের আম্পায়ার নয়, হারভাজানের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানায় অস্ট্রেলিয়া বোর্ডও।
এতটাই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল মাঠে, যে ম্যাচ শেষে ভারত অধিনায়ক অনিল কুম্বলের সঙ্গে হাত পর্যন্ত মেলায়নি অস্ট্রেলিয়া দল।
সেই ঘটনায় অ্যাডিলেডের ফেডেরাল কোর্টে মামলা চলে। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সাইমন্ডসের জন্য সাক্ষী দিয়েছিলেন রিকি পন্টিং, ম্যাথু হেডেন এবং মাইকেল ক্লার্ক। হারভাজানের পক্ষে ছিলেন শচিন।
আইসিসির বিচারপতি জন হেনসেন হারভাজানকে নির্দোষ বলে ঘোষণা করেন। সেই রায়ে অবশ্য খুশি হতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া।
ঘটনা-৪
সেই ম্যাচেই ঘটে আরো একটি বিতর্কিত ঘটনা। যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলি। আম্পায়ারের একের পর এক ভুল সিদ্ধান্তের শিকার হয়ে ম্যাচটি হেরে যায় ভারত।
দ্রাবিড়ের পায়ে বল লেগে ক্যাচ যায় উইকেটকিপার গিলক্রিস্টের হাতে। আউটের সিদ্ধান্ত জানান আম্পায়ার স্টিভ বাকনার। সৌরভের আউটের সময় আম্পায়ার ছিলেন মার্ক বেনসন। স্লিপে সৌরভের ক্যাচ নিয়েছিলেন মাইকেল ক্লার্ক। তবে আম্পায়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। পন্টিং আঙুল তুলে দেখান আউট। আম্পায়ারও সেই সিদ্ধান্তই জানান।
ম্যাচের শেষে অধিনায়ক কুম্বলের বক্তব্য বিখ্যাত হয়ে যায় সেই সময়। তিনি বলেছিলেন, ‘এই ম্যাচে একটি দলই ক্রিকেটের স্পিরিট বজায় রেখে খেলেছে।’
ঘটনা- ৫
সাল ২০১২। সিডনিতে বিরাট কোহলি দর্শকদের মধ্যমা দেখিয়ে ফেলেন। তার সেই বিতর্কিত ছবি ছড়িয়ে পড়ে সংবাদপত্রে। ম্যাচ রেফারির ঘরে ডাক পড়ে কোহলির। ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলেন তিনি। শাস্তির মুখে পড়তে হয়নি তাকে।
ঘটনা- ৬
অস্ট্রেলিয়ার মাঠে ঘটে যাওয়া ওপরের ঘটনাগুলো ছাড়াও আরো একটি ঘটনা রয়েছে, যা বোধ হয় উপভোগই করেন ভারতীয় সমর্থকেরা। তবে সেটি ঘটে দেশের মাটিতে। ২০০১ সালে ভারতে আসে স্টিভ ওয়াহর অস্ট্রেলিয়া। সদ্য ভারত অধিনায়ক সৌরভ পাল্টা আক্রমণের কৌশল নিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। টসের সময় অজি অধিনায়ককে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিয়েছিলেন সৌরভ।
বিতর্ক দেখা দেয় সেই ঘটনা ঘিরে। পরবর্তী সময় সৌরভ জানান ব্লেজার আনতে ভুলে গিয়েছিলেন, ড্রেসিংরুমে তাই দেরি হয়। তবে সেই সিরিজের ফলাফল বুঝিয়ে দেয়, অস্ট্রেলিয়াকে পাল্টা আক্রমণের কৌশল কাজে দিয়েছিল।
সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা
