চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) হিসাবরক্ষণ বিভাগে দুই খাতে ২৭ কোটি টাকার চেক নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে ২৪ কোটি টাকার চেক ব্যাংকের নির্ধারিত হিসাব নম্বরে জমা না দিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দেওয়া এবং করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের কাছ থেকে পাওয়া ৩ কোটি টাকার চেক এস্টেট শাখার দোকান ভাড়ার হিসাব নম্বরে জমা দেওয়া হয়েছে বলে তথ্য মিলেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে চসিকের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. সাইফুদ্দিনের বিরুদ্ধে সম্প্রতি একটি অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক।
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত ওই অভিযোগপত্রে বলা হয়, চট্টগ্রাম নগরীতে কভিড-১৯ মহামারী মোকাবিলার জন্য সরকারের কাছ থেকে পাওয়া ৩ কোটি টাকা চসিকের এস্টেট শাখার দোকান ভাড়ার হিসাব নম্বরে জমা করেন চসিকের প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা মো. সাইফুদ্দিন। এসব সরকারি টাকা রাজস্ব তহবিলে সংমিশ্রণের কারণে ডিভিশনাল কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস হতে আপত্তি আসে এবং হিসাবটি বন্ধ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এছাড়াও প্রায় ২৪ কোটি টাকার ১৪টি চেক অ্যাসাইনমেন্টকৃত হিসাব নম্বরে (ইউসিবিএল, কুমিল্লা শাখা) পরিশোধ না করে সরাসরি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রানা বিল্ডার্স লিমিটেড এবং মেসার্স রানা বিল্ডার্স অ্যান্ড সালেহ আহমদ জেভির নামে পরিশোধ করা হয়। এসব অভিযোগে গত ৩১ জানুয়ারি চসিকের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. সাইফুদ্দিনের বিরুদ্ধে একটি বিভাগীয় মামলা (নং ০১/২০২১) করা হয়েছে।
চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দেওয়া অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, অভিযুক্ত সাইফুদ্দিনকে ইতিপূর্বে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হলেও তার জবাব সন্তোষজনক ছিল না। তাই তার আচরণ চাকরি বিধিমালা, ২০১৯ এর বিধি ৪৯(ক) (খ) মোতাবেক অসদাচরণ পর্যায়ভুক্ত ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই বিধি অনুযায়ী তার জবাব সাত কার্যদিবসের মধ্যে দিতে বলা হয়। একই সঙ্গে শুনানিতে কোনো কিছু জ্ঞাত করাতে চাইলে বা আত্মপক্ষ সমর্থনে কোনো সাক্ষ্য উপস্থাপন করতে চাইলে লিখিতভাবে তা জানাতে বলা হয়।
এ প্রসঙ্গে চসিকের ভারপ্রাপ্ত সচিব ও প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মুফিদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চসিকের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. সাইফুদ্দিনের বিরুদ্ধে কভিড মহামারী মোকাবিলায় সরকারের দেওয়া ৩ কোটি ও ২৪ কোটি টাকার ১৪টি চেক নিয়ে অনিয়ম হওয়ায় তাকে শোকজ করা হয়েছিল। কিন্তু শোকজের সন্তোষজনক জবাব তিনি দিতে পারেননি। পরবর্তীকালে তার বিরুদ্ধে একটি বিভাগীয় মামলা করেছেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহোদয়। ইতিমধ্যে এ মামলার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আরেকটি জবাব দিয়েছেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
চেক নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চসিকের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. সাইফুদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মূলত করোনা মহামারী মোকাবিলায় চসিকের জন্য সরকারি অনুদান হিসেবে যেই ৩ কোটি টাকা সরকারি অনুদান আসে, তা কোন ব্যাংকে রাখতে হবে তার স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা ছিল না। তখন করোনা মোকাবিলায় তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের দিকনির্দেশনায় চসিকের আইসোলেশন সেন্টার খোলা হয়েছিল। সেটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তারাই এসব খরচ বা দেখভাল করেছিল। এখানে আমার কোনো হাত নেই।’
মেয়রকে করপোরেশনের আয়ন-ব্যয়নের কর্ণধার উল্লেখ করে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘মেয়র মহোদয়ের (তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন) নির্দেশনা ছাড়া করপোরেশনের টাকা খরচ করার কোনো এখতিয়ার নেই। উনি যেখানে বলেছেন, সেখানে জমা করেছি। এ টাকা তো করপোরেশনের অ্যাকাউন্টেই রাখা হয়েছে, কারো ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে তো রাখা হয়নি। যা করা হয়েছে, তা উদ্দেশ্যমূলক, এখানে অনিয়মের কিছু নেই।’
১৪টি চেক ব্যাংকে জমা না দিয়ে সরাসরি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার প্রসঙ্গে মো. সাইফুদ্দিন বলেন, ‘পিসি রোডের কাজের বিল বাবদ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে যেই ১৪টি চেক দেওয়া হয়েছিল, সেখানে আগাম চেকও ছিল। করপোরেশনের উপরস্থদের নির্দেশনা ছাড়া এসব চেক দেওয়া হয়নি। তৎকালীন মেয়র ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশনার বাইরে আমি কিছু করিনি।’
