২০ বছর আগে কেরানীগঞ্জ থেকে আসা নগরীর আমবাগানের বস্তিতে থাকেন তৃতীয় লিঙ্গের হিরা। পরিবার থেকে আলাদা হয়ে দীর্ঘদিন চট্টগ্রামে তিনি। চকবাজার থেকে মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত পান-সিগারেট বিক্রি করতেন করোনার আগে। কিন্তু করোনা শুরু হওয়ার পর পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব।
হিরা বলেন, বর্তমানে ভিক্ষা করে চলি, টাকা পয়সা নাই ব্যবসা করতে পারছি না।
সংকটে অন্যরাও। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ পেয়েও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের মিলছে না কর্মসংস্থান। ফলে বহুমুখী সংকটে চট্টগ্রামের হিজড়া পল্লীগুলোতে ঘনিয়েছে ঘোর অমানিশা। প্রশিক্ষণ পেয়ে সেলুন, দোকান কিংবা হস্ত শিল্পের ব্যবসা করলেও তা এখন পুঁজির অভাবে বন্ধ।
প্রায় সাত বছর আগে হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সরকার। গত বছর প্রথমবারের মতো নিজ লৈঙ্গিক পরিচয়ে ভোটার তালিকায় নাম অর্ন্তভুক্তির সুযোগ দেওয়া হলেও বাস্তবতা ভিন্ন।
অপরদিকে, মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এসব মানুষের সত্যিকারের বসবাস এবং জীবিকা নির্বাহের পথগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে মানবেতরভাবে কাটছে তাদের দিন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি ও বেসরকারি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হলেও কর্মসংস্থান নেই। যার ফলে বাধ্য হয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামছে তৃতীয় লিঙ্গের এসব মানুষ।
চট্টগ্রাম জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের তথ্যমতে, তৃতীয় লিঙ্গের এসব মানুষকে সেলাই, ব্লক-বাটিক, কম্পিউটার ও বিউটিফিকেশনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রতিবছর ৫০ জনকে এই প্রশিক্ষণ দেয়া হলেও গত বছর করোনার কারণে এসব বন্ধ ছিল। এর আগে ১৯-২০ অর্থবছরে প্রশিক্ষণার্থী বেড়ে দাঁড়ায় ১০০ জনে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ( প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ ওয়াহিদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, তৃতীয় লিঙ্গের এসব মানুষ বর্তমানে জীবনের সাথে যুদ্ধ করছে। তাদের কোনো চাকরি কিংবা আয়ের পথ নেই। তবে তাদের প্রশিক্ষিত হিসেবে গড়ে তুলতে ৫০ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই পর্যন্ত আমাদের অধিদপ্তরের অধীনে চট্টগ্রামে তৃতীয় লিঙ্গের ৩০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এই প্রশিক্ষণার্থীদের কর্মসংস্থানের জন্য প্রত্যেককে ১০ হাজার এবং দৈনিক ৩০০ টাকা যাতায়াত ভাতাসহ মোট ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এদের মধ্যে অনেকে দোকান দিয়েছে। তবে করোনার কারণে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গত বছর হয়নি।
তিনি বলেন, এসব মানুষ প্রশিক্ষণ শেষে দোকান কিংবা কিছু করার চেষ্টা করে কিন্তু সাধারণ মানুষ তাদের সহজভাবে গ্রহণ না করায় মুখ থুবড়ে পড়ে উদ্যোগগুলো। তবে এবার আমরা তাদের জন্য ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিচ্ছি। এই প্রশিক্ষণ দিয়ে তৃতীয় লিঙ্গের এসব মানুষের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম নগরীর, স্টেশন রোড, কদমতলী, সিআরবি, আমবাগান, পাহাড়তলী, আকবরশাহ, খুলশীসহ বেশি কয়েকটি এলাকায় তৃতীয় লিঙ্গের এসব মানুষের বাস।
নগরীর ডবলমুরিং থানাধীন বারো কোয়ার্টার এলাকায় দীর্ঘদিন থাকেন তৃতীয় লিঙ্গের মালতী। সমাজসেবা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে হস্ত শিল্পের একটি ব্যবসাও শুরু করেছিল। ব্যাগ, শো পিসের ওই দোকান করোনার কারণে বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের দোকানে সাধারণ মানুষ কম আসতে চায়। আমরা সাবলম্বী হতে চাইলেও মানুষের মনোভাবে কারণে পারছি না। তাই অনেকে খারাপ কাজ করে, কেউ ভিক্ষা করে। আমরা চাই চাকরি কিন্ত কেউ তো দেয় না।’
খুলশী ওয়্যারলেস কলোনির বস্তির এক বাসায় গিয়ে দেখা যায়, একসঙ্গে সাতজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের বাস। দুই রুমের ওই বাসায় তৃতীয় লিঙ্গের ঝিলিক বলেন, ভাত রান্না করে এক সময় কয়েকটি কারখানার মানুষকে দিতাম। করোনার কারণে সবশেষ। কেউ ভাতের হোটেলে চাকরি দিলেও করতাম কিন্তু এই সুযোগ কেউ দিচ্ছে না। প্রশিক্ষণ পেয়েছি বিউটিফিকেশনের কিন্তু কেউ কাজে নিচ্ছে না।
তৃতীয় লিঙ্গের এসব মানুষদের জীবনমান উন্নয়নে কর্মরত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির (বন্ধু) চট্টগ্রামের কো-অর্ডিনেটর হুমায়ুন কবির বলেন, তাদের আমরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। তবে তারা যে কাজ করে খাবে এই সুযোগটা বর্তমানে পাচ্ছে না। করোনায় পুঁজি হারিয়েছে, অনেকে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতো সেখান থেকেও ছাঁটাই হয়েছে। সাধারণ মানুষ তাদের যদি সুযোগ দিত তাহলে তারা চাকরি এবং ব্যবসা করেই জীবিকা নির্বাহ করতো। তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই বলেই তারা এখনও পিছিয়ে।
