নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে সংঘটিত সর্বাধিক আলোচিত ও বিস্ময়কর ঘটনাগুলোর মধ্যে ‘মিরাজ’ অন্যতম। সুরা বনি ইসরাইলে একে ‘ইসরা’ বা রাত্রিকালীন ভ্রমণ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সুরা নজমেও এর বর্ণনা রয়েছে। এছাড়া হাদিস ও জীবনচরিত গ্রন্থাবলিতে মিরাজের বিস্তারিত বিবরণ বিপুল সংখ্যক সাহাবিদের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। বস্তুত আল্লাহতায়ালা যেভাবে চেয়েছেন, সেভাবে নবী করিম (সা.)-কে রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন এবং তাকে নিজের কিছু নিদর্শন পর্যবেক্ষণ করিয়েছেন অন্তত এতটুকু কথা দ্বিধাহীনচিত্তে নিঃসঙ্কোচে মেনে নেওয়া এবং বিশ্বাস করা পবিত্র কোরআন ও রিসালাতের প্রতি বিশ্বাসের অনিবার্য দাবি।
মিরাজের ঘটনা
উম্মুল মুমিনিন হজরত খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পরে এবং আকাবার শপথের আগে মিরাজের ঘটনা ঘটে। ৬২১ খ্রিস্টাব্দের (নবুয়তের দ্বাদশ বছরে) হজের সময় নবী মুহাম্মদ (সা.) মিনার কাছে আকাবা উপত্যকায় মদিনার ১২ সদস্যের এক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই সময় তারা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং কিছু বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। মদিনার ওই লোকদের এ শপথ আকাবার প্রথম শপথ নামে পরিচিত।
মিরাজের ঘটনার সুনির্দিষ্ট সালের ব্যাপারে কিছুটা মতভেদ থাকলেও ঘটনাটি হিজরতের এক বছর আগে রজব মাসের ২৭ তারিখ রাতে (২৬ তারিখ দিবাগত রাতে) সংঘটিত হয়েছিল এ ব্যাপারে অধিকাংশ ইমাম ও ঐতিহাসিকরা একমত। মিরাজের রাতে আল্লাহতায়ালা তার প্রিয় বান্দা ও রাসুলকে তার একান্ত সান্নিধ্যে নেওয়ার অলৌকিক ব্যবস্থা করেন, তাকে বেহেশত-দোজখসহ অসংখ্য নিদর্শন দেখান, তার সঙ্গে একান্তে কথা বলেন, তার অন্তর নূর, প্রজ্ঞা ও হেকমত দ্বারা পরিপূর্ণ করে দেন, মানবতার কল্যাণের নিমিত্তে তাকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও সুরা বাকারার শেষ তিন আয়াত হাদিয়া প্রদান করা হয়।
ইসরার বিবরণ
মিরাজের ঘটনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন হযরত জিবরাইল (আ.) ও হজরত মিকাইল (আ.)। তারা ওই রাতে উম্মে হানির ঘরে গভীর ঘুমে থাকা নবী মুহাম্মদকে (সা.) পবিত্র কাবা চত্বরে নিয়ে যান। সেখানে তারা নবী করিমকে (সা.) মহাভ্রমণের উপযোগী করার লক্ষ্যে আল্লাহর হুকুমে আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায় ‘সিনা চাক’ করেন। এরপর তারা তাকে বোরাক নামক দ্রুতগামী বাহনে করে বায়তুল মোকাদ্দাসে নিয়ে যান। সেখানে নবী করিম (সা.) অনেক নবীর নামাজের জামাতে ইমামতি করেন। সবাইকে সালাম করে এবার তিনি বোরাকে করে বায়তুল মামুরসহ (ফেরেশতাদের কেবলা) অনেক কুদরত ও নিদর্শন দেখে সিদরাতুল মুনতাহায় উপনীত হন। আল্লাহ যা বলার তা তার বান্দাকে বলেন, যা দেখানোর তা দেখান, যা দেওয়ার তা প্রদান করেন। মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের সর্বোচ্চ সম্মান, আল্লাহর পরম ভালোবাসা, প্রভুর জন্য চরম ত্যাগের অনুভূতি, হিজরতের পরে একটি ইসলামি সমাজ বিনির্মাণের অনুপ্রেরণা, উম্মতের কল্যাণার্থে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং উম্মতে মুহাম্মদির জন্য মহান আল্লাহর বিশেষ করুণাসংবলিত বাণী সুরা বাকারার শেষ তিন আয়াত নিয়ে নবী করিম (সা.) আল্লাহর নির্ধারিত উপায়ে সেই রাতেই ফিরে আসেন পৃথিবীতে।
মিরাজের প্রেক্ষাপট
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মক্কি জীবনের শেষভাগে আকাবার শপথের আগে সংঘটিত হয়েছিল মিরাজ। সে সময়ের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে মিরাজের রয়েছে গভীর যোগসূত্র। কারণ, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মক্কি জীবনের শেষভাগে কাফেরদের বিরোধিতা তীব্র আকার ধারণ করে। এক পর্যায়ে কাফেররা নবী করিম (সা.)-এর বংশের সঙ্গে সব ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। নবুয়তের সপ্তম বছরের এ অবরোধে আবু তালিব উপত্যকায় কার্যত মুসলমানরা বন্দি হয়ে পড়েন। নবুয়তের দশম বছর নবী করিম (সা.)-এর কষ্টের জীবনসাথী এবং তার অর্থনৈতিক বড় অবলম্বন হজরত খাদিজা (রা.) ইন্তিকাল করেন। এ সময় নবী করিম (সা.)-এর অন্যতম অভিভাবক আবু তালেবও ইন্তিকাল করেন। আবু তালেব মুসলমান না হলেও কাফেরদের অত্যাচারের মুখে সব সময় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতেন। মানসিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবলম্বন হাতছাড়া হওয়ার পর রাসুল (সা.) ও সাহাবিদের ওপর কাফেরদের অত্যাচারের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। মক্কার ভূমি মুসলমানদের জন্য ক্রমান্বয়ে সঙ্কীর্ণ হতে থাকে।
এমতাবস্থায় মদিনা থেকে একটি আশার আলো দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু সে আলো ছিল বেশ ক্ষীণ। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) এক বুক আশা নিয়ে তায়েফে দাওয়াত দিতে গেলেন। কিন্তু তায়েফবাসী দাওয়াত তো গ্রহণ করলই না, বরং নবীকে মেরে রক্তাক্ত করল। এমন অবস্থায় যখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জাগতিক সব অবলম্বন হাতছাড়া, মক্কাবাসীদের ইমান গ্রহণের বিষয়ে আশাহত, গোটা আরব তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ, তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে, চরম দুঃখ-কষ্টে সান্ত¡না দেওয়া ও আশার বাণী শোনানো স্ত্রীও পরপারে, বংশের অভিভাবকও ইন্তেকাল করেছেন ঠিক তখন আল্লাহতায়ালা নবী করিম (সা.)-এর সব দুঃখ-কষ্ট ভুলানোর জন্য এবং নবুয়ত-রিসালাতের কঠিন কাজকে আরও সুদৃঢ় করার জন্য তাকে তার পরম সান্নিধ্যে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভে তিনি তৃপ্ত হন, অসংখ্য নিদর্শন দর্শনে তিনি হিকমত ও প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ হন। আল্লাহর সান্নিধ্যে এসে তিনি একটি আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণ এবং বিরুদ্ধবাদীদের মোকাবিলায় ইস্পাতের মতো দৃঢ়তা প্রদর্শনের যোগ্যতা অর্জন করেন। মহান আল্লাহর ভালোবাসায় তিনি সবকিছু করার মনোবল অর্জন করেন। মিরাজের পরই আকাবার শপথের মাধ্যমে হিজরতের পটভূমি তৈরি হয়। মিরাজের পরে নাজিল হয়- মিরাজ সম্পর্কিত বনি ইসরাইল সুরা। এ সুরায় ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ঐতিহাসিক চৌদ্দ দফা নাজিল হয়। এ নির্দেশিকার আলোকে নবী করিম (সা.) সাহাবিদের গড়ে তুলেন এবং হিজরতের পর একটি আদর্শ ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেন।
মিরাজের ফলাফল
আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.)-এর প্রতি ইমান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মিরাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মিরাজের ঘটনায় ইমানদারদের ইমান আরও বেড়েছে। পক্ষান্তরে সন্দেহ পোষণকারীরা যুক্তির পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে মুসলিমদের থেকে আলাদা হয়ে গেছে। বস্তুত আদর্শ ও নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাসহীন একটি গোষ্ঠী দিয়ে ইসলামি সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব নয়। আর এ জন্য মক্কি ও মাদানি জীবনের সন্ধিক্ষণে ওই কঠিন সামাজিক প্রেক্ষাপটে এ পরীক্ষাটি একান্ত দরকার ছিল। জাগতিক সব অবলম্বন হাতছাড়া হওয়ার পর নবী করিম (সা.) তার মহান প্রভুর সান্নিধ্যে গিয়ে ভালোবাসার এক অভাবনীয় শক্তি লাভ করলেন। আল্লাহর খেলাফত প্রতিষ্ঠার কঠিন কাজে মিরাজ নবী করিমকে (সা.) সাহস ও শক্তি জুগিয়েছে। প্রত্যক্ষ জ্ঞান এবং আল্লাহর পরম সান্নিধ্য তার মনে ‘প্রশান্তি’ দিয়েছিল। ফলে হিজরতের সময় সাওর গুহায় যখন তিনি ছিলেন দুজনের একজন, বদর প্রান্তরে যখন তিনি তিনশ’ তেরো জন সৈন্য নিয়ে কাফেরদের বিশাল বাহিনীর মোকাবিলা করেন, তাবুকে রোম পরাশক্তির বিরুদ্ধে যখন তিনি অগ্রসর হয়েছিলেন তখনো তিনি ছিলেন অনড়, অটল ও ভাবনাহীন। তার এ চারিত্রিক দৃঢ়তায় মিরাজের ভূমিকা অপরিসীম। তাই মিরাজ একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিস্ময়কর ঘটনা। মক্কি জীবনের শেষভাগের এ ঘটনার ফল ছিল সুদূরপ্রসারী।
মিরাজের শিক্ষা
মিরাজ আল্লাহতায়ালার অপার মহিমা ও কুদরতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মিরাজ হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চতম মর্যাদার সাক্ষ্য বহন করে। উম্মত দরদী নবী মিরাজের রাতেও আমাদের কল্যাণের কথা ভেবেছেন। এভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এ উদারতা আমাদের তার ভালোবাসায় উজ্জীবিত করে। মিরাজ মহাকাশ গবেষণার নবদিগন্ত উন্মোচিত করে। মিরাজের ঘটনার বিবরণ সংবলিত সুরা বনি ইসরাইলের তৃতীয় ও চতুর্থ রুকুতে বর্ণিত ১৪ দফার শিক্ষা ও মিরাজ পরবর্তী সময়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কর্মকৌশল আমাদের একটি আদর্শ কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রেরণা জোগায়। মিরাজের সর্বোৎকৃষ্ট দান হলো- দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। নামাজের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। নামাজের মাধ্যমে চরিত্র সংশোধিত হয় এবং যথাযথভাবে নামাজ কায়েমের মাধ্যমে একটি ইসলামি সমাজের ভিত্তি রচিত হয়। তাই নামাজের ব্যাপারে সব ধরনের উদাসীনতা ঝেড়ে ফেলে নামাজে নিষ্ঠাবান হওয়া মিরাজের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এছাড়া মিরাজের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো-
এক. আল্লাহতায়ালার অসীম ক্ষমতার ওপর নিঃশঙ্কচিত্তে বিশ্বাস স্থাপন করা। আল্লাহতায়ালা ইচ্ছা করলে সবকিছু পারেন এবং তার ক্ষমতা অপরিসীম। এই চেতনা মাথায় রেখে আল্লাহর ভয়কে অন্তরে সদা জাগরূক রাখা এবং সে অনুযায়ী কাজ করা।
দুই. হজরত রাসুলুল্লাহর (সা.) মর্যাদাকে উপলব্ধি করে পরিপূর্ণভাবে তার অনুসরণ করা এবং তাকে পূর্ণাঙ্গভাবে জীবনের আদর্শ বানানো।
তিন. আল্লাহতায়ালার অস্তিত্ব, জান্নাত, জাহান্নামের মতো বিষয়গুলো যা মানুষের চোখের সামনে দৃশ্যমান নয়, সেগুলোতে পরিপূর্ণভাবে ইমান আনা এবং এতে কোনো প্রকার সন্দেহ না রাখা।
অন্যদিকে সুরা বনি ইসরাইলের ১৪টি মূলনীতি ইসলামি সমাজ ব্যবস্থার মূলনীতি হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মূলনীতিগুলোর মাধ্যমে যে বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়েছে তা হলো-
মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম-মিসকিনদের সঙ্গে আচরণের বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা। বিশেষ করে তাদের অধিকারের বিষয়গুলো।
আল্লাহতায়ালার ইবাদত-বন্দেগি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করলে মুমিন জীবন বরবাদ হতে বাধ্য। তাই আল্লাহ ছাড়া অন্যসব সত্তার ইবাদতকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সম্পদ ব্যবহারের সুষম নীতিমালা ঘোষণা করা হয়েছে এবং অপচয় ও কৃপণতাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ব্যভিচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ধরনের উপকরণ, পথ-পন্থা ও মাধ্যমকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
রিজিকের বিষয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা এবং রিজিকের জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।
অনুমাননির্ভর কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে, যা সবধরনের ভুলের সূত্রপাত করে।
নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা চূড়ান্ত পর্যায়ের বিপর্যয় সৃষ্টি করে, তা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
লেনদেন, বেচা-বিক্রির ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা, অনৈতিকতার সব পথ রুদ্ধ করে ওজনে কমবেশি করাকে হারাম করা হয়েছে।
পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষা, সম্পর্কের হক আদায়ের অন্যতম মূল শর্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষার ওপর জোরালোভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
অহংকার সব ধরনের অরাজকতার মূল উৎস। দাম্ভিক মানুষ সর্বদা মানুষের সঙ্গে ভুল আচরণ করে। তাই অহংকার থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
মিরাজের ঘটনা শুধু একটি অলৌকিক ঘটনা কিংবা কাহিনী নয়। বরং মুমিন জীবনের জন্য চরম শিক্ষণীয় একটি নিদর্শন। আল্লাহতায়ালার চরম ক্ষমতার ছোট্ট একটি নিদর্শন থেকে শেখার রয়েছে অনেক কিছু। মিরাজের সময় রাসুল (সা.) জাহান্নামের এক একটি দলের অপরাধ ও শাস্তির যে ঘটনাগুলো চাক্ষুষ করেন, শুধু সেগুলোও যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তাহলে আল্লাহর শাস্তির ভয়েও সমাজ সংশোধিত হতে বাধ্য। কিন্তু মানুষ এ বিষয়ে উদাসীন। তাই আসুন, মিরাজের শিক্ষা নিজে মেনে চলি, অন্যকেও মেনে চলার আহ্বান জানাই।
