মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২১, ১১:২২ পিএম

মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও যৌন নির্যাতন নিয়ে খোলামেলাভাবে কথা বলা শুরু করা উচিত। সম্প্রতি এক শিশুকে বেদম মারধরের ভিডিও চিত্র ভাইরাল হওয়ার পর জনসমাজে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এর আগেও বেশ কিছু নির্যাতনের ঘটনা আমাদের নজরে এসেছে। মাদ্রাসায় যেসব নির্যাতনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং এসব অনিয়ম, অনাচার সমাজে ভয়াবহ রকমভাবে বেড়েছে। মাদ্রাসার ঘটনাগুলো তার টুকরো প্রতিচ্ছবি। মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন নিয়ে কথা বলা মানে এই শিক্ষাব্যবস্থার বিরোধিতা করা না। বরং ধর্মীয়, সামাজিক ও আইনগত বিধিবিধান মেনেই একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা সমাধানের পথ বাতলে দিতে পারে মাদ্রাসাগুলো।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুটিকে অমানবিকভাবে মারধরের দৃশ্য আঁতকে ওঠার মতো। এ রকম ভিডিও ইদানীং মাঝেমধ্যে দেখা যাচ্ছে। শুধু শারীরিক নির্যাতন না, যৌন নির্যাতনেরও শিকার হচ্ছে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। যৌন নির্যাতনের বেশ কিছু তথ্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসেছে। মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের তথ্য তেমন একটা প্রকাশ্যে আসে না। এসব নিয়ে খুব বেশি কথাবার্তাও হয় না। মাদ্রাসা, বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসাগুলো যেন বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপ। ওই সমাজের তথ্য বাইরে আসে না। বাইরের সমাজও তাদের প্রতি কোনো আগ্রহবোধ করে না। সরকারও এ সমাজকে খুব বেশি ঘাঁটাতে চায় না। মাদ্রাসাগুলোয় কী হচ্ছে না হচ্ছে এসব নিয়ে কর্র্তৃপক্ষও পরিষ্কার করে কিছু বলে না।

কওমি মাদ্রাসার সাবেক কয়েকজন শিক্ষার্থী গত দুই বছরে ফেইসবুকে ধারাবাহিকভাবে তাদের ওপর ঘটে যাওয়া যৌন নির্যাতনের বিবরণ দিয়েছেন। নিয়মের কঠিন বেড়াজালে বড় হওয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে একজন তার সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ফেইসবুকে। ওই সাবেক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, কোরআনে হাফেজ হওয়ার জন্য তিনটি মাদ্রাসায় তিনি সাত বছর অবস্থান করেছিলেন। এ সময় তিনি পাঁচবার যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন শিক্ষক ও সিনিয়র শিক্ষার্থীদের দ্বারা। গত বছর এক শিক্ষার্থী জানিয়েছিলেন, তার ওপর যৌন নির্যাতনের তথ্য। এখন হয়তো দু-একটি ঘটনা প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু এ ধরনের অনেক যৌন নির্যাতনের ইতিহাস বয়ে বেড়াচ্ছে মাদ্রাসাগুলো। হুট করেই এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বলাৎকার বেড়ে যায়নি। এসব প্রতিষ্ঠানে যৌন নির্যাতনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। অন্তত কয়েকজন মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এমনই মনে হয়েছে।

তবে এসব ঘটনা নিয়ে এক ধরনের নীরবতা লক্ষ করা যাচ্ছে সবার মধ্যেই। কেমন একটা রাখঢাক অবস্থা। কিছু দেখিনি, জানি না, বা কোনো অভিযোগ পাইনি, এমন ভান করছেন সবাই। সরকার খুব বেশি কথা বলছে না। ওদিকে মাদ্রাসাগুলোর কর্র্তৃপক্ষ ও শীর্ষস্থানীয় আলেমরা বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। উভয় পক্ষ মনে করছে, এ বিষয় নিয়ে খোলামেলাভাবে কথা বললে দেশের ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে। কিন্তু চুপ থাকা বা নীরবতা সমস্যার সমাধান বয়ে আনবে না। বরং পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহতার দিকে নিয়ে যাবে।

ফেনীর মাদ্রাসাশিক্ষার্থী নুসরাতের কথা আমাদের এখনো মনে আছে। মাদ্রাসা অধ্যক্ষের বাজে প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তাকে নির্মমভাবে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। নুসরাত জীবন দিয়ে প্রতিবাদ করেছেন। এর আগে তিনি থানায় অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু তার অভিযোগ আমলে না নিয়ে তাকে হেনস্তা করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাকে মেরেই ফেলা হয়। এমন অনেক নুসরাত আছেন যারা মুখ বুজে নির্যাতনের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। সামাজিক ও বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে সব খুলে বলতে পারছেন না। কিছুদিন আগে এক সংবাদে দেখলাম, নির্যাতনের শিকার এক শিশু মাদ্রাসাশিক্ষার্থী ফের মাদ্রাসায় পাঠালে আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছে।

এসব ঘটনা থেকে পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে আঁচ করা যায়। শুধু মাদ্রাসাই না, সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়ও যৌন নিগ্রহ, নির্যাতন ও ধর্ষণের তথ্য পাওয়া যায়। এমনিতেই সাম্প্রতিক সময়ে দেশে যৌন নির্যাতন আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের ঘটনাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সরকারের সঙ্গে মাদ্রাসা কর্র্তৃপক্ষও এগিয়ে আসতে পারে। অনেকেই যৌন নির্যাতনের ঘটনা মাদ্রাসাগুলোর বিরুদ্ধে অপপ্রচার বলে মন্তব্য করছেন। মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অপপ্রচার ও বিদ্বেষ থাকতেই পারে। কিন্তু মাদ্রাসাগুলোয়ও অপরাধ হতে পারে। মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা কোনো অপরাধ করতে পারে না এমন ভাবা ঠিক না। তাদের মধ্যেও অপরাধের প্রবৃত্তি আছে এবং এটাই স্বাভাবিক। তাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে অপরাধকে এড়িয়ে গেলে, অস্বীকার করলে বা ঢেকে রাখলে সংকট থেকে মুক্ত হওয়া যাবে না। বরং অপরাধ আরও বাড়বে।

বিভিন্ন সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে জানা যাচ্ছে, আবাসিক মাদ্রাসাগুলোয়ই যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। আর এদের বেশির ভাগই সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশ থেকে আসা। সাধারণ শিক্ষার ব্যয় বহন করতে না পেরে অনেক অভিভাবকই সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠিয়ে থাকেন। ধর্মীয় চেতনা থেকেও শিক্ষার্থীদের মাদ্রাসায় পাঠানো হয়। তাই সমস্যাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করার আগেই। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে এমন কিছু করা যাবে না যাতে করে মাদ্রাসাশিক্ষা ব্যাহত হয়। মাদ্রাসার সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের রুটি, রুজি ও শিক্ষার ভবিষ্যৎ জড়িত রয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও ব্যবস্থা নেওয়ার উদাহরণ আমাদের সামনেই আছে। মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতন রোধ করা খুব কঠিন কাজ হওয়ার কথা না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল শিক্ষার্থীরা। ধর্ষককে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এই অভিজ্ঞতার আলোকে মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

গত শতকে আয়ারল্যান্ডের ক্যাথলিক কেয়ার সেন্টার, ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুল ও এতিমখানাগুলোয় ভয়াবহ আকারে শিশু যৌন নির্যাতন ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯৩০ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিন হাজার শিশুকে যৌন নির্যাতন করে প্রিস্ট ও সিস্টাররা। পুলিশ তদন্তে সঠিক তথ্য বের করতে ব্যর্থ হলে একজন বিচারকের নেতৃত্বে কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন ২৫০টি প্রতিষ্ঠানের এক হাজার মানুষের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। অনেকেই কমিশনের কাছে শৈশবের যৌন নির্যাতনের দুঃসহ ঘটনার সাক্ষ্য দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া থেকে আয়ারল্যান্ডে উড়ে যান। আইরিশ হাইকোর্টের বিচারক শন রায়ানের ২৬০০ পাতার প্রতিবেদন আইরিশ ক্যাথলিক চার্চের যৌন নির্যাতনের বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসে।

যৌন নির্যাতনের ঘটনা তদন্তে আমাদের দেশেও প্রয়োজনে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিশন গঠন করা যেতে পারে। কারণ দেশের মাদ্রাসা ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা নেহাতই কম না। সব মিলিয়ে দেশের মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। আর শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫ লাখের কাছাকাছি। মাদ্রাসা ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সারা দেশে এসব মাদ্রাসা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আসে। দুর্গম এলাকায়ও অনেক মাদ্রাসা আছে।

মাদ্রাসায় অধিকাংশ সময় আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে থাকতে হয়। মুহাদ্দিস, মুফতি, হাফেজ, মাওলানা, আলেম হওয়ার জন্য লাখ লাখ শিক্ষার্থী এসব মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ইসলামি ধর্মতত্ত্ব তারা বিশদভাবে পাঠ করেন। তাদের বিশাল এক জ্ঞানভা-ার নিয়ে গবেষণা করতে হয়। দীর্ঘ সময় শেষে মাদ্রাসাশিক্ষা শেষে অর্জিত জ্ঞান জনমানসে ছড়িয়ে দেওয়ার মহান দায়িত্ব নিয়ে তারা বেরিয়ে যান। আলেম, মুফতি, মাওলানারা সমাজে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হন। কিছু কিছু লোকের কুপ্রবৃত্তি ও বিচ্যুতির দায় পুরো আলেম সমাজ নিতে পারে না। শৈশবে যৌন নির্যাতনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাদের মেধা ও মননের বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যৌন নির্যাতন রোধে মাদ্রাসার আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রয়োজনে সরকারি নজরদারির মধ্যে আনতে হবে। অন্যথায় আবাসিক ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে সরকার। মাদ্রাসা কর্র্তৃপক্ষও এ নিয়ে তাদের প্রস্তাব দিতে পারে। সবাইকে আলোচনার টেবিলে রাখতে হবে এবং আলাপ শুরু করতে হবে। এটি জরুরি এবং দ্রুতই শুরু করতে হবে।

পরিশেষে একটি কথা বলা জরুরি। মাদ্রাসার বিভিন্ন অন্যায়-অনিয়ম নিয়ে কথা বলা মানে ধর্মের সমালোচনা করা না। বরং ইসলাম ধর্ম ও ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টির জন্যই এসব অপরাধ বন্ধ করতে হবে। ইসলাম ধর্মে শিশু ও যৌন নির্যাতন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বরং এসব কুপ্রবৃত্তিসম্পন্ন মাদ্রাসার শিক্ষকদের অপকর্মের সুযোগ নিয়ে অনেকেই ইসলাম সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক বাজে মন্তব্য করছেন। বিদ্বেষ ছড়ানো বন্ধের জন্য এসব অপকর্ম রোধ করা জরুরি।

লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত