বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বিরোধ

প্রধানমন্ত্রীর সফরে মুহুরীর চর নিয়ে নতুন আশা

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৩৫ এএম

ফেনীর পরশুরামের বিলোনিয়া সীমান্তে মুহুরী নদীর বুক চিরে জেগে উঠেছে ‘মুহুরীর চর’। জমির কাগজপত্রে মালিক স্থানীয় বাংলাদেশিরা। তবে ভারতের আপত্তির কারণে তারা সেটি আবাদ করতে পারেন না এমনকি প্রাণভয়ে সেখানে যেতেও পারেন না। এদিকে বাংলাদেশ ও ভারতের জরিপ দল একাধিকবার মাঠপর্যায়ে কাজ করেছে। সীমারেখা নির্ধারণে বসানো হয়েছে ৪৪টি অস্থায়ী খুঁটি। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হয়েছে একাধিক বৈঠক। ১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব স্থলসীমান্ত চুক্তি, ২০১১ সালের প্রটোকল এবং পরবর্তী যৌথ জরিপের পরও মুহুরীর চর ঘিরে দুই কিলোমিটার সীমান্ত অংশের বিরোধের সমাধান হয়নি।

বাংলাদেশ ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ-ত্রিপুরা সীমান্তের ৮৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে পরশুরামের মুহুরী নদী এলাকায় দুই কিলোমিটার অংশ অমীমাংসিত রয়েছে। ২০১০-১১ জরিপ মৌসুমে দুই দেশের যৌথ জরিপের মাধ্যমে মুহুরী নদী এলাকার ইনডেক্স ম্যাপ প্রস্তুত করে উভয় দেশের কারিগরি পর্যায়ে স্বাক্ষর করা হয়। পরে ২০১৩-১৪ মাঠ মৌসুমে ওই অমীমাংসিত এলাকায় যৌথ জরিপ চালিয়ে ৪৪টি খুঁটি স্থাপন করে সীমানা চিহ্নিত করা হয়।

দুই দেশের সরকারের সম্মতি পেলে সেখানে পাকা সীমান্ত পিলার নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেটি আর বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তের এই অংশের জমি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। স্থানীয় জমির মালিকদের অভিযোগ, কাগজপত্রে মালিকানা থাকলেও তারা বহু বছর ধরে নিজেদের জমিতে যেতে বা চাষাবাদ করতে পারছেন না। দীর্ঘদিন  ধরে অস্থায়ীভাবে বসানো এসব খুঁটির অনেকগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। কিছু খুঁটির সঙ্গে লাগানো জরিপ নম্বরের ধাতব পাতও মরিচা ধরে বিবর্ণ হয়ে গেছে।

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সহকারী জরিপ কর্মকর্তা পারভেজ মিয়া জানান, বিরোধপূর্ণ মুহুরী চরের সীমানা বিরোধ নিরসনে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে মাঠপর্যায়ে সীমানা নির্ধারণ, জরিপ ও সীমান্ত চিহ্ন স্থাপনের কাজ হয়েছে। এ-সংক্রান্ত জরিপ প্রতিবেদন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।

চরের আয়তন ৯২ দশমিক ১৪ একর : সরকারি নথি অনুযায়ী, মুহুরী চরের আয়তন ৯২.১৪ একর। ২০১১ সালের স্থলসীমান্ত প্রটোকলসংক্রান্ত তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের অংশ ৭১ দশমিক ৯৪ একর এবং ভারতের অংশ ২০ দশমিক ২০ একর। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে দুই দেশের জরিপ বিভাগ মুহুরীর চরে যৌথ জরিপ পরিচালনা করে। এর আগে ২০১০-১১ জরিপ মৌসুমেও যৌথ জরিপের মাধ্যমে ইনডেক্স ম্যাপ প্রস্তুত করা হয়েছিল। তবে স্থানীয় পর্যায়ে চরের জমির দখল ও ব্যবহার নিয়ে ভিন্ন চিত্র রয়েছে। স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, ৯২ দশমিক ১৪ একরের মধ্যে প্রায় ৩১ দশমিক ১৮ একর বাংলাদেশের দখলে, ৮ একর ভারতের দখলে এবং বাকি ৫২ দশমিক ৯৬ একর জমি অমীমাংসিত অবস্থায় রয়েছে।

নদীর গতিপথ পরিবর্তনে জটিলতার সূত্রপাত : মুহুরীর চর বিরোধের পেছনে রয়েছে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির সময় সীমান্ত নির্ধারণে মুহুরী নদীর মধ্যস্রোতকে ভিত্তি ধরা হয়। পরে নদীর গতিপথ পরিবর্তন, ভাঙন ও পলি জমে নতুন চর সৃষ্টি হয়। এতে পুরনো সীমারেখা, নদীর বর্তমান অবস্থান এবং বাস্তব ভূমি ব্যবহারের মধ্যে জটিলতা তৈরি হয়। ১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব স্থলসীমান্ত চুক্তিতে মুহুরী নদী-বিলোনিয়া অংশের সীমারেখা নির্ধারণে নদীর মধ্যস্রোতের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। দুই দেশ নিজ নিজ পাশে বাঁধ নির্মাণ করে নদীর গতিপথ স্থিতিশীল রাখার বিষয়েও সম্মত হয়। ২০১১ সালের প্রটোকলে মুহুরী নদী-বিলোনিয়া অংশের সীমারেখা আরও নির্দিষ্ট করা হয়। এতে বিদ্যমান সীমান্ত পিলার থেকে নির্ধারিত রেখা, একটি শ্মশানের সীমানা এবং এরপর মুহুরী নদীর বিদ্যমান মধ্যস্রোত অনুসরণের কথা উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের নিজ নিজ পাশে বাঁধ নির্মাণ এবং জিরো লাইনে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার বিষয়েও সম্মতির কথা বলা হয়। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে পুরনো নদী খাত, নতুন চর এবং সীমান্তরেখার অবস্থান নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, সেটিই মুহুরীর চর বিরোধের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১৯৭৪-এর চুক্তি থেকে ২০১১-এর প্রটোকল : বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত সমস্যার সমাধানে ১৯৭৪ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তি হয়। ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর দুই দেশ ওই চুক্তির একটি প্রটোকল স্বাক্ষর করে। প্রটোকলটি ১৯৭৪ সালের চুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এতে মুহুরী নদী-বিলোনিয়া সেক্টরের সীমারেখা নির্ধারণের বিস্তারিত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১৫ সালে ভারতের সংসদে সংবিধানের ১০০তম সংশোধনী পাসের মাধ্যমে ১৯৭৪ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তি ও ২০১১ সালের প্রটোকল বাস্তবায়নের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এরপর দুই দেশের মধ্যে ছিটমহল বিনিময়সহ স্থলসীমান্ত চুক্তির বড় অংশ বাস্তবায়িত হলেও মুহুরীর চরের দুই কিলোমিটার সীমান্ত অনিষ্পন্ন থেকে যায়। ২০১৬ সালের বাংলাদেশ-ভারত স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ মুহুরীর চরের দুই কিলোমিটার সীমান্তের স্ট্রিপ ম্যাপ দ্রুত স্বাক্ষরের জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানায়। সে সময় ভারত নতুন করে জরিপের বিষয়ে আপত্তি তুলেছিল বলে জানা গেছে।

জমির মালিকানা আছে, দখল নেই : মুহুরীর চর বিরোধের ভুক্তভোগী স্থানীয় জমির মালিকরা। তাদের দাবি সিএস ও বিএস খতিয়ান, দলিলসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও সীমান্ত বিরোধের কারণে তারা নিজেদের জমিতে যেতে পারছেন না। উত্তর কাউতলী গ্রামের ফকির নুর মোস্তফার পরিবারের প্রায় ১০ একর জমি রয়েছে মুহুরীর চরে। তিনি জানান, ‘আমাদের ভাইদের বেশিরভাগ জমি মুহুরীর চরে। ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে এসব জমিতে চাষাবাদ করতে পারছি না।’ স্থানীয় বাসিন্দা দাউদুল ইসলাম ফকির বলেন, ‘সিএস ও বিএস খতিয়ান থাকা সত্ত্বেও আমরা জমির মালিক হয়েও জমিতে যেতে পারছি না। ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তের কারণে সেখানে দখলে যেতে পারছি না।’

৫৮ দিন গুলিবিনিময়ের সাক্ষী মুহুরীর চর : মুহুরীর চর নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। জানা যায়, ১৯৭৯ থেকে ১৯৯৯ সালের ২২ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মুহুরীর চর ঘিরে তৎকালীন বিডিআর ও বিএসএফের মধ্যে ৫৮ দিন গুলিবিনিময় হয়। ১৯৯৪ সালের ১৫ জানুয়ারি বিএসএফের গুলিতে বাউর পাথর গ্রামের বেয়াধন বিবি নিহত হন। স্থানীয়দের ভাষ্য ১৯৮৯ সালে নুরুল আলম নামে এক বাংলাদেশি কৃষক নিজের জমিতে ঘাস কাটতে গেলে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন। এরপর মুহুরীর চরের জমিতে বাংলাদেশি কৃষকদের যাতায়াত ও চাষাবাদ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। চরে নিজেদের জমির অধিকার ফিরে পেতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশি নাগরিক আহত ও আটকের ঘটনাও ঘটেছে।

সীমান্ত বিরোধে বাড়ছে অপরাধের ঝুঁকি : মুহুরীর চর সীমান্তে স্থায়ী ও দৃশ্যমান সীমারেখা না থাকায় সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়েও জটিলতা রয়েছে। এ কারণে চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশসহ সীমান্ত অপরাধের ঝুঁকি রয়েছে। ২০১৬ সালের বাংলাদেশ-ভারত স্বরাষ্ট্র সচিবপর্যায়ের আলোচনাতেও মুহুরীর চরসহ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধের বিষয় গুরুত্ব পেয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে নতুন প্রত্যাশা : এদিকে ফেনীর মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচব্যবস্থার উন্নয়নে এক হাজার ৫৪২ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। প্রকল্পটি উদ্বোধন করতে আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফেনী আসবেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে মুহুরীর চরের জমির মালিকদের মধ্যেও নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের সীমান্ত জটিলতার বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনা হলে দুই দেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

নিজ কালিকাপুর গ্রামের বাসিন্দা ও উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আলমগীর মজুমদার বলেন, মুহুরীর চরে শতাধিক বাংলাদেশি কৃষকের জমি রয়েছে। একসময় অনেকের ভিটেমাটিও ছিল সেখানে। এখন তারা নিজেদের জমিতে যেতে পারছেন না। ‘বাংলাদেশি কৃষকদের জমিগুলো উদ্ধার করে চাষাবাদের আওতায় আনা গেলে তারা নতুন করে জীবন ফিরে পাবেন। তাদের রুটি-রুজির ব্যবস্থা হবে।’

স্থানীয় কৃষকদের দাবি, দুই দেশের বিদ্যমান চুক্তি ও প্রটোকলের আলোকে মুহুরীর চরের সীমান্তরেখা চূড়ান্ত করা, স্থায়ী সীমান্ত পিলার স্থাপন এবং বাংলাদেশি মালিকানাধীন জমির বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান হতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত