‘ঘাঁটুফুল গাটুকালা কাটিলা কেয়া।
উকুন্ধ্য। চিরুন্ধ্য। বারাইল্লোয়া।
খড়ি কাশী বারিচা রামকলাথত।
ভিতপুঞ্জি বন নাঙ্গে আগাই।
মোহাশমুদ্র বনজাম শরই।
ঈশর মূল কাটিল চীকুত ॥’
মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, বন-কর্ত্তন : চ-ীমঙ্গল
মধ্যযুগের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর (১৫৪০-১৬০০) চ-ীমঙ্গল কাব্যের ‘বন-কর্ত্তন’ কবিতাটিতে বুনো গাছপালার একটি দীর্ঘ তালিকা পাওয়া যায়, যেগুলোর মধ্যে ঘাঁটুফুল (ভাঁটফুল), গাটুকালা (থানকুনি), কেয়া, উকুন্ধ্য (উচুন্টি/ফুলকুড়ি), চিরুন্ধ্য (চিরঞ্জী/পিয়াল), বারাইল্লোয়া (বেড়েলা/ কুরেটা), রামকলাথত (রামকলা), বন নাঙ্গে (বন নারাঙ্গা), আগাই (আগর), মোহাশমুদ্র (মহাসমুদ্র), শরই (শর/নলখাগড়া), ঈশর মূল প্রভৃতি গাছের সঙ্গে বনজামেরও নাম রয়েছে। সে কাব্যের নায়ক চীকুত (কালকেতু) ও ফুল্লরার উপাখ্যানটি অনেকেরই জানা। মধ্যযুগের সে কবিতাটিতে শতাধিক বন্যগাছের নাম আছে যে গাছগুলো বন কাটার সময় ধ্বংস করা হয়েছিল। মুকুন্দরামের কবিতায় যেরূপ বর্ণনা রয়েছে তা পড়ে মনে হয়, তিনি এ যুগে জন্মালে নিঃসন্দেহে একজন পুরোদস্তুর ঔপন্যাসিক হতেন।
মুকুন্দরামের পরবর্তীকালে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিভূতিভূষণের উপন্যাসগুলো সে অভাব পূরণ করে দিয়েছে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ধাত্রীদেবতা’ উপন্যাসের শুরুর দিকে রাঢ় অঞ্চলের নদী ও খালের ধারের জনহীন শ্মশান ও ঝোপঝাড়ের চমৎকার বর্ণনা রয়েছে। বিশেষ করে ময়ূরাক্ষী নদীর অববাহিকা ও গ্রামের কোণের দামোদর নদী বা খালের পাড়ে শেওড়া, হিস, বাবলা ও বনজামের দুর্ভেদ্য ঝোপের উল্লেখ রয়েছে। সেসব জঙ্গলে মেঠো পথের ধারে এসব বুনো গাছপালা যেন মানুষদের জঙ্গলে প্রবেশে প্রাকৃতিক প্রাচীর হয়ে দাঁড়াত! এমনকি তার ‘হাঁসুলীবাঁকের উপকথা’য় কোপাই নদীর পাড়ে বাস করা সাঁওতাল, কাহার, বাউরি ইত্যাদি অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষরা বনের যেসব ফলমূল সংগ্রহ করে ক্ষুধা মেটাত, সেগুলোর মধ্যে পাকা বনজাম ছিল অন্যতম।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘আরণ্যক’ উপন্যাসে বিহারের পূর্ণিয়া ও ভাগলপুরের অরণ্য অঞ্চলের গাছপালা এবং বন্য প্রকৃতির অসাধারণ বর্ণনা দিয়েছেন ছবির মতো করে, সেসব গাছপালার মধ্যেও তিনি বনজামের কথা লিখতে ভোলেননি। বুনো ঝোপঝাড়ের মধ্যে ঘন হয়ে জন্মানো বনজাম ও তিতজাম গাছের ছায়া দুপুরের রোদে ছিল শান্তির ঠিকানা। আজ সে জঙ্গলও নেই, জঙ্গলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো বন্য গাছপালারাও হারিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে আমরা হারাচ্ছি কবিতা, গান, গল্প ও উপন্যাস লেখার সেসব আদি ও অকৃত্রিম প্রাকৃতিক উপাদান।
এ রকমই এক আফসোস নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্দরবন খ্যাত জঙ্গলটার ভেতরে সেখানকার উদ্ভিদ গবেষক আব্দুর রহিমের সঙ্গে ঘুরছিলাম। গ্রীষ্মকাল, আবহাওয়া গরম থাকলেও সেই একটুকরো প্রাকৃতিক জঙ্গলের ভেতরে ছিল প্রশান্তির ছায়া। শিয়াকুল, বনবরই, বনখেজুর, শাল, বেওফুল, দাঁতরাঙা ইত্যাদি নানা প্রজাতির বন্য গাছপালায় ঠাসা সে জঙ্গল। রহিম ভাই সে জঙ্গলের ভেতর কয়েকটা বনজাম গাছ দেখিয়ে বললেন, ফল পাকলে লোকজন ঘুরতে এসে খেয়ে ফেলে, বীজ পাই না। বললাম, বীজের দরকারই বা কী? বুনো গাছ তো বনে প্রাকৃতিকভাবেই জন্মাবে, পাখিরা ফল খাবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। তাকে লাগানোর দরকার হয় না, শুধু ধ্বংস না করলেই হলো।
বনজামের গাছগুলো আমার চেয়েও খানিকটা উঁচু। সে গাছের ডালে ডালে থোকায় থোকায় ফুল ফুটেছে, ফল ধরা শুরু হয়নি। বুনো গাছ, অথচ ফুলগুলো কী চমৎকার। ফুলের রঙ ও গড়ন দেখে মনে হচ্ছে তারার মতো সে ফুলগুলো যেন চিনামাটি বা পোরসিলিনের তৈরি, চকচকে, উজ্জ্বল ও মসৃণ। ফুল-কুঁড়ির থোকাগুলো কিছুটা নতমুখী হয়ে রয়েছে, যেন তারা গাছের ধারক ধরিত্রীকে নত হয়ে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে। বনজামের গাছ পরেও দেখেছি বলধা গার্ডেনে। সেখানে দুই রকমের বনজাম গাছ আছে। এ গাছ দেখেছি ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ উদ্যানেও। উদ্যানের গাছগুলো রোপিত ও পালিত। তবে প্রাকৃতিকভাবে এখনো গ্রামের ঝোপঝাড়ে এ গাছ বেশ জন্মায়। বরগুনা, পিরোজপুর, ঝালকাঠির খালগুলোর পাড়েও এ গাছ জন্মাতে দেখেছি।
বনজামের ইংরেজি নাম শ্যুবাটন অ্যাড্রিসিয়া, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম অৎফরংরধ ংড়ষধহধপবধ ও গোত্র প্রিমুলেসী। এটি একটি চিরসবুজ গুল্ম বা ছোট বৃক্ষ প্রকৃতির উদ্ভিদ। গাছ দেড় থেকে ছয় মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। গাছ বেশ শাখায়িত ও ঝোপাল, ডালপালা লালচে। পাতা কিছুটা পুরু, চামড়ার মতো, শক্ত, মসৃণ, উপবৃত্তাকার থেকে লম্বাটে, গোড়া ও আগার দিক সরু। ফুল ফোটে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত। ফুলের রং গোলাপী। ফল ছোট মটর বুটের মতো, গোলকাকার, উপর-নিচে একটু চাপা, ভেতরে একটি বীজ থাকে। ফল প্রথমে গোলাপী বা লাল থাকে, পাকার পর কালো হয়ে যায়। শাঁস সাদা ও রস বেগুনি। প্রধানত বন্য আগাছা হিসেবে দেশের প্রায় সব জায়গায় জন্মে। বনজাম আমাদের এ অঞ্চলের দেশি গাছ।
লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ