জাতীয় তিনটি দিবসকে কেন্দ্র করে আমরা মাসব্যাপী নানা আনুষ্ঠানিকতা পালন করে থাকি। ডিসেম্বর বিজয়ের মাস, ফেব্রুয়ারি ভাষার মাস এবং মার্চ স্বাধীনতার মাস। এরই ধারাবাহিকতায় ফেব্রুয়ারি ভাষার মাস। তাই মাসজুড়ে প্রচার মাধ্যমগুলো মাতৃভাষা বাংলা নিয়ে সরব হয়ে ওঠে। প্রকাশ ও প্রচার করে ভাষা, ভাষা আন্দোলন নিয়ে নানা নিবন্ধ-প্রবন্ধ, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে বহুবিধ প্রচারণা। এ মাসের দৃশ্যমান কাজটি করে বাংলা একাডেমি। মাসব্যাপী বিশাল পরিসরে আয়োজন করে একুশের বইমেলা। একাডেমির অস্থায়ী মঞ্চে প্রতিদিন নানা বিষয়ভিত্তিক প্রবন্ধ পাঠ ও আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন থাকে। বাংলা একাডেমি এই কার্যক্রম গত অনেক বছর ধরে নিয়মিত করে আসছে। আমাদের
মাতৃভাষার জন্য এত আবেগ-আয়োজনের পরও স্বীকার করতে হয়; পরিপূর্ণ রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় বাংলা ভাষা আজও সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে অধিষ্ঠিত হতে পারেনি। এই দায় স্বীকারে আমাদের অনেক ক্ষোভ-হতাশা নিশ্চয় আছে এবং সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চয় থাকবে। থাকাটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়।
যে রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা, সে রাষ্ট্রে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার অবাধ প্রচলন কেন আজও সম্ভব হয়নি? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা শাসকরা স্পষ্ট না করে; অনেকটা এড়িয়ে গেলেও ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে বাংলা ভাষার মহিমা প্রকাশে কিন্তু কার্পণ্য করে না। সর্বস্তরের মানুষের সুরে সুর মিলিয়ে বাংলা ভাষার জয়গান গেয়ে থাকেন। কিন্তু তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের অন্তর্গত মৌলিক কাজটি না করে নির্লিপ্ত থাকেন। কেননা স্বাধীন দেশে রাষ্ট্রের বদল ঘটেনি। রাষ্ট্র তার সাবেকি চেহারা-চরিত্র নিয়ে বহাল তবিয়তে। আমরা পাকিস্তানি রাষ্ট্র ভেঙে নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছি সত্য, তবে রাষ্ট্রের চরিত্র-কাঠামোর পরিবর্তন করতে পারিনি। রাষ্ট্র অতীতেরই ধারাবাহিক। আর আমাদের শাসকশ্রেণিও তথৈবচ। আমাদের শাসকরা যে শ্রেণির প্রতিনিধি সে শ্রেণির কাছে বাংলা নয়, ইংরেজি ভাষার প্রতি দুর্বলতা-ভালোবাসা অপরিসীম। তাদের সন্তানরা বাংলা মাধ্যমের শিক্ষাক্রমে যুক্ত সেটাও ধারণার অতীত। তাদের ভবিষ্যৎ দেশে নেয়, বিদেশে। সে লক্ষ্যেই তারা ইংরেজি-নির্ভর। বাংলা ভাষা তাদের কাছে কেবল অগ্রহণীয় নয়, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যেরও বটে। বচনে-ভাষণে তারা যতই বাংলার পক্ষে আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করুক না কেন বাস্তবতার সঙ্গে তার কোনোই মিল নেই। যা নির্ভেজাল রাজনৈতিক প্রতারণা মাত্র।
আমাদের শ্রেণিবিভক্ত সমাজের চিত্রটি অপ্রকাশ্য নয়, রীতিমতো মোটাদাগে দৃশ্যমান। আমাদের শিক্ষাক্রমে তিনটি ভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতির শিক্ষাক্রম শক্তপোক্তভাবে শেকড় বিস্তার করে আছে। বিত্তবান শ্রেণি এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শিক্ষাক্রম ইংরেজি মাধ্যমে। দরিদ্র শ্রেণিকে চিরস্থায়ী দারিদ্র্যের বৃত্তে রাখার ফন্দি-সুলভ আরবি ভাষার মাদ্রাসা শিক্ষাক্রমে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। একমাত্র মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমে বাংলা ভাষার সর্বাধিক প্রচলন রয়েছে। এই তিন ধারার শিক্ষাক্রমের বিস্তার ঘটানো হয়েছে শ্রেণিবিভক্তি-বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখার অভিপ্রায়েই। অথচ একটি স্বাধীন দেশে মাতৃভাষা নির্ভর একধারার শিক্ষাক্রম প্রচলনের স্বপ্ন এদেশের মানুষ দেখেছিল। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের কাক্সিক্ষত স্বপ্ন থেকে কত দূর-দূরান্তে।
আমরা ইংরেজি ভাষা পরিত্যাগের পক্ষে নই। ভাষা শিক্ষায় ইংরেজি যুক্ত থাকতে পারে। তাই বলে মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে ইংরেজি ও আরবি ভাষাকে প্রধান অবলম্বন করে শিক্ষাক্রম তো আমাদের জাতীয় চেতনার পরিপন্থী। এটা আমাদের তথাকথিত জাতীয়তাবাদী শাসকদের বিজাতীয় দৃষ্টিভঙ্গিরই নির্জলা বহিঃপ্রকাশ। যে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা নিয়ে আমরা গর্ব করি, এই তিন ধারার শিক্ষাক্রমে সেই গর্ব কেবল খর্ব নয়, মøান হয়ে যায়। যাদের আত্মদানে মাতৃভাষা এবং স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে; বিদ্যমান শিক্ষাক্রম তো তাদের আত্মদানের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। আমরা চাই মাতৃভাষাকেন্দ্রিক একমুখী শিক্ষাক্রম। সেটা বিদ্যমান ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠা আমাদের ‘জাতীয়তাবাদী’ শাসকদের অধীনে সম্ভব হবে কি?
আমাদের দুই প্রধান শাসক দলে স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদীদের আশ্রয় জুটেছে। ভোটের রাজনীতির নিয়ামক শক্তিরূপেই তারা পেয়েছে অবাধ আশ্রয়-প্রশ্রয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দাবিদার বর্তমান সরকার হেফাজতে ইসলামের ঘৃণিত আবদার রক্ষায় পাঠ্যপুস্তকে ব্যাপক রদবদল ঘটিয়ে শিক্ষাক্রমে সাম্প্রদায়িক শিক্ষার পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের ধর্মনিরপেক্ষ-মুক্তচিন্তার মানস গঠনের বিপরীতে সাম্প্রদায়িকতার পঙ্কিল পথে ঠেলে দেওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে। ক্ষমতার মোহে পরিণতির বিষয়টি সামান্য বিবেচনা পর্যন্ত করেনি। আওয়ামী ওলামা লীগ নামক সাম্প্রদায়িক সংগঠনটি বর্তমান শাসক দলের অঙ্গ সংগঠন রূপেই নির্ভাবনায়-নিরবচ্ছিন্নভাবে সাম্প্রদায়িক কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ সংগঠনটির সাম্প্রদায়িক এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী নানা ভূমিকা ও কর্মকা-ে শাসক দল নিশ্চুপ। জনমনে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। আওয়ামী ওলামা লীগের দায় সংগত কারণেই শাসক দলের এড়ানোর সুযোগ নেই। বলার অপেক্ষা রাখে না এই বাস্তবতার বদল না ঘটলে একুশের চেতনা-মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠার কোনোই সুযোগ নেই।
ভাষার মাস অতিক্রমের পর মার্চ মাসকে আমরা স্বাধীনতার মাসে নামে অভিহিত করে থাকি। মাসজুড়ে স্বাধীনতা নিয়ে প্রচার মাধ্যমগুলো সরব হয়ে ওঠে। আমাদের স্বাধীনতা বহু ত্যাগ-আত্মত্যাগে প্রতিপক্ষ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করেই অর্জিত হয়েছে। দয়া-দক্ষিণায় আসেনি। অধিক ত্যাগের এই স্বাধীনতা প্রকৃতই কি এদেশের সমষ্টিগত মানুষকে স্বাধীন করেছে? কেবল পৃথক ভূখ-ের স্বাধীনতা ছাড়া সমষ্টিগত মানুষের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি। আমাদের অর্জিত স্বাধীনতা কতিপয়ের স্বাধীনতায় সীমিত। সমষ্টি সেখানে স্বাধীনতা বঞ্চিত। শাসকশ্রেণির অবাধ ক্ষমতা আর একচ্ছত্র অধিকার হয়েছে। পাকিস্তানি আমলের স্বদেশি পেটি বুর্জেয়া শ্রেণি স্বাধীন দেশে বুর্জোয়া হতে পেরেছে, স্বাধীনতার সুফলে। তবে এদের বুর্জোয়া হওয়ার প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়াধীনে ঘটেনি। ঘটেছে লুণ্ঠন-দুর্নীতিসহ নানাবিধ অনৈতিক পন্থাবলম্বনে। সে কারণে এদের জাতীয় বুর্জোয়াও বলা যাবে না। লুণ্ঠন-দুর্নীতির পঙ্কিল পথ ও পন্থায় এবং ঘৃণ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির সুযোগে এরা সংঘবদ্ধ একটি লুটেরা বুর্জোয়া শ্রেণি রূপে নিজেদের অর্থ-সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে। আমাদের শাসকশ্রেণি এই শ্রেণিরই প্রতিনিধি। সে কারণে তারা পরস্পর হরাত্মা। তাই দেশে শ্রেণি শোষণ যেমন বিদ্যমান তেমনি বহুমাত্রিক রূপ লাভও করেছে।
সমষ্টিগত মানুষ স্বাধীন বা স্বাধীনতার সুফলভোগী হতে না পারার কারণ অনুসন্ধান করা মোটেও অসহজ নয়। বাংলাদেশে শতকরা আশিভাগ মানুষ বঞ্চিত অধিকার ও ক্ষমতা বঞ্চিত। ক্ষুদ্র বিশভাগের মধ্যে দশভাগের করতলে অর্থ-বিত্ত এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। বাকি দশভাগ স্বশ্রেণিতে টিকে থাকার অভিলাষে এক ধরনের টানাপড়েনে ব্যস্ত। স্বীয় অবস্থানকে নিরঙ্কুশ রাখতে তারা শাসক দলের পাল্লার ওজন বুঝে দল পাল্টায়। একবার এদিকে আরেকবার ওদিকে ঘুরপাক করে। তাদের চরিত্র মুৎসুদ্দি বললেও ভুল হবে না। এই আশি ও বিশ ভাগের মধ্যে ব্যবধান ঘোচাতে কোনো সংস্কারে ফল লাভ হবে না। একমাত্র উপায়টি হচ্ছে ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। আমরা সশস্ত্র বিপ্লব মুক্তিযুদ্ধে সম্পন্ন করেছি। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের এই স্বাধীনতায় সমষ্টিগত মানুষের স্বাধীনতা এবং মুক্তি নিশ্চিত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের অসম্পূর্ণ কাজটি হলো সমাজ বিপ্লব সম্পন্ন করা। সমাজ বিপ্লবই একমাত্র পথ। একমাত্র এ পথেই সমষ্টিগত মানুষের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে। সব মানুষের সমঅধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।
আমাদের ভাষা এবং স্বাধীনতার পাশাপাশি মাস দু’টিতে এটাই হোক আমাদের লক্ষ্য ও প্রত্যাশা। বাংলা ভাষার মর্যাদা সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠা এবং সব মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্য। এই সত্যটি আমাদের বিবেচনায় নিতেই হবে। এছাড়া যে আমাদের সামনে বিকল্প পথ বলে আর কিছু নেই। এটা যেন আমরা ভুলে না যাই।
লেখক নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত
