‘নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য’ ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সহযোগিতা করেছিল দাবি হেফাজতে ইসলামের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী বলেছেন, ‘ভারত মূলত তার ভূরাজনৈতিক স্বার্থে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সহায়তা করেছিল। তাই বলে কি গোলামি ও তাবেদারি করে ভারতের ঋণ শোধ করতে হবে আমাদের?’
তিনি বলেন, ‘আমাদের জাতীয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা দিল্লির গোলামি করার জন্য এদেশ স্বাধীন করেনি। আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, সার্বভৌমত্ব ও ইনসাফ কায়েম করার জন্যই তারা রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এদেশ স্বাধীন করেছিল। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক হতে হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে’।
বাবুনগরী বলেন, ‘গোলামি ও তাবেদারি করলে আমাদের জাতিগত আত্মমর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়- এই অবিসংবাদিত সত্য কথাটি আপনারা উপলব্ধির চেষ্ট করুন। এ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দলমত নির্বিশেষে লড়াই করতে আপামর জনগণ সর্বদা প্রস্তুত আছে। কোনো অপশক্তির হুমকি-ধমকিকে নায়েবে রাসুল ওলামায়ে কেরাম ও তৌহিদি জনতা পরোয়া করে না’।
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম, হাটহাজারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও যাত্রাবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মোদিবিরোধী আন্দোলনে পুলিশের হামলার প্রতিবাদ, নিহত ও আহতদের ক্ষতিপূরণ এবং মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে হেফাজতে ইসলাম আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে তি এসব বলেন। হাটহাজারী উপজেলা হেফাজতের ব্যবস্থাপনায় শুক্রবার বাদজুমা এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
হাটহাজারী ডাক বাংলো চত্বরে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাবুনগরী বলেন, ‘এ দেশ মুসলিমপ্রধান দেশ। এ দেশের পুলিশ গুলি করে নিরীহ মুসলমান হত্যা করবে, এটি বরদাশত করা যায় না। খুনি কর্মকর্তাদের তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। আলেম-ওলামা, মাদ্রাসার ছাত্র ও তৌহিদি জনতার ওপর পুলিশ গুলি চালিয়ে চরম ব্যর্থতা ও বর্বরতার পরিচয় দিয়েছে। শহীদদের রক্ত কখনো বৃথা যেতে পারে না। মোদিকে খুশি করার জন্য যারা দেশের নিরপরাধ প্রতিবাদী নাগরিকদের হত্যা করতে দ্বিধা করে না, তারা জালিম এবং অত্যাচারী। যারা ধর্ম ও মানবতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে না, তারা জনগণের কাছে সবসময় ঘৃণিত ও প্রত্যাখ্যাত’।
তিনি বলেন, ‘শহীদদের রক্তের বিনিময়ে এদেশে একদিন ইসলামের বিজয়-পতাকা উড়বেই, ইনশাআল্লাহ’।
১১ নাগরিকের বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশপ্রেমিক ও ধর্মপ্রাণ প্রতিবাদী জনতার আন্দোলনের বিরুদ্ধে একদল গণবিচ্ছিন্ন তথাকথিত বিশিষ্ট নাগরিকের বিবৃতিকে আমরা অমানবিক, উস্কানিমূলক ও গণবিরোধী বলে সাব্যস্ত করছি। এই বিবৃতি স্বৈরতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের নির্লজ্জ দালালির প্রমাণ বহন করে। হেফাজতে ইসলামের আহ্বানে দেশব্যাপী পালিত শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ও হরতালের কর্মসূচি চলাকালীন প্রতিবাদকারী আলেম সমাজ, মাদ্রাসাছাত্র ও ধর্মপ্রাণ মানুষদের ওপর বিনাউস্কানিতে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে তীব্র গণপ্রতিরোধ গড়ে ওঠে’।
‘‘পুলিশের গুলিতে হত্যাকাণ্ডের নিন্দা না জানিয়ে একতরফাভাবে প্রতিবাদী জনতার গণপ্রতিরোধকে আপনারা তথাকথিত ‘তাণ্ডব’ আখ্যা দিয়ে গণবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন’’।
তাদের বিরুদ্ধে বাবুনরী আরো বলন, ‘‘ইসলামবিদ্বেষ ও সেক্যুলার মতাদর্শে আপনারা এত অন্ধ যে, আপনাদের বিবৃতিতে পুলিশের গুলিতে শহীদ হওয়া ২০ নাগরিকের প্রতি কোনো ধরনের মানবিক সমবেদনা প্রকাশ পায়নি। বরং আপনারা বিবেকবুদ্ধি জলাঞ্জলি দিয়ে দালালির নজরানা পেশ করতে প্রতিবাদী ধর্মপ্রাণ গণমানুষের ওপর ‘সর্বশক্তি প্রয়োগে’র আহ্বান জানিয়ে প্রকারান্তরে জালিম ক্ষমতাসীনদের মানুষ হত্যায় উৎসাহ দিয়েছেন। এ জন্য ভবিষ্যতে আপনাদের অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে, ইনশাআল্লাহ’’।
হেফাজতের আন্দোলন দেশবিরোধী নয় দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমরা দেশকে ভালবাসি। দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আমরা কুনূতে নাযিলা এবং জুমার খুতবায় দেশের জন্য দোয়া করি’।
নিহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করে তিনি বলেন, ‘পুলিশের বর্বরোচিত হামলায় যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে এবং যে ৩৬ জনের নামে মামলা হয়েছে তাসহ হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে করতে হবে’।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ হাটহাজারী উপজেলা শাখার সভাপতি ও হাটহাজারী মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষা সচিব মাওলানা শোয়াইব জমিরীর সভাপতিত্বে ও উপজেলা সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন, যুগ্ন সম্পাদক মাওলানা এমরান সিকদার ও সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা কামরুল ইসলামের যৌথ সঞ্চালনায় এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হেফাজতের ত্রাণ ও পূণর্বাসন সম্পাদক মুফতী মুহাম্মদ আলী কাসেমী, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা নাছির উদ্দিন মুনির, কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মীর ইদ্রিস, কেন্দ্রীয় সহঅর্থ সম্পাদক আহসান উল্লাহ, কেন্দ্রীয় সহত্রাণ ও পূণর্বাসন সম্পাদক মাওলানা জুনাইদ বিন ইয়াহইয়া।
এতে আরো বক্তব্য রাখেন হেফাজতে ইসলাম হাটহাজারী পৌরসভা শাখার সভাপতি মাওলানা জাহাঙ্গীর আলম মেহেদী, সহসভাপতি মাওলানা হাফেজ আলী আকবর, হাটহাজারী উপজেলা সহসাধারণ সম্পাদক মাওলানা আব্দুল্লাহ, পৌর সাধারণ সম্পাদক নূর মোহাম্মদ, হেফাজত আমিরের ব্যক্তিগত সহকারী ও হাটহাজারী উপজেলা শাখার সহপ্রচার সম্পাদক, মাওলানা ইন’আমুল হাসান ফারুকী, মাওলানা সোহাইল চৌধুরী, মাওলানা হাফেজ আব্দুল মাবুদ, মাওলানা নজরুল ইসলাম, মাওলানা হাবিব উল্লাহ হাবিব প্রমুখ।
