হেফাজত তোষণের আত্মঘাতী রাজনীতি

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২১, ১০:৪৬ পিএম

বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনীতি কি তবে হেফাজতের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে? তারাই মূল রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে? স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদির আগমনকে কেন্দ্র করে হেফাজতে ইসলামের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ এবং এর রেশ ধরে দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে ব্যাপক সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রশ্নটি সৃষ্টি হয়েছে। হেফাজতের নেতাকর্মীরা কিন্তু শুধু প্রতিবাদ-বিক্ষোভেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি, তারা রীতিমতো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। জ্বালাও-পোড়াও-ভাঙচুর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা, হরতাল, সড়ক অবরোধ সবই করেছে। অন্যদিকে, হেফাজতের বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে গুলিতে বেশ কয়েকজন কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। অনাকাক্সিক্ষত এই ঘটনায় যেন হেফাজতের শক্তিমত্তা আর রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের দুর্বলতাই প্রকাশিত হয়েছে।

২৬ থেকে ২৮ মার্চএই তিন দিনে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় প্রথমে মোদিবিরোধী বিক্ষোভ-সংঘাত এবং দেশজুড়ে হেফাজতে ইসলামের ডাকা হারতালকে ঘিরে সহিংসতায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চট্টগ্রামে অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এর আগে নরেন্দ্র মোদির সফরকে ঘিরে যাতে বিশৃঙ্খলা না হয়, সে জন্য হেফাজতের নেতাদের ডেকেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সেই বৈঠকে ‘বিশৃঙ্খলা হবে না’হেফাজত নেতারা এমন আশ্বাসও দিয়েছিলেন। তারপরও কেন এমন সহিংসতার ঘটনা ঘটল? গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই বা কী করল?

গত ২৬ মার্চ সকালে নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় পা রাখার চার ঘণ্টার মধ্যেই বায়তুল মোকাররম এলাকায় সংঘর্ষ শুরু হয়। এর রেশ ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায়। সহিংসতার বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে আগাম কোনো তথ্য ছিল বলে মনে হয় না। নিরাপত্তার দিক থেকে বিষয়টি উদ্বেগজনক। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কেন ‘অস্ত্রের ভাষা’ প্রয়োগ করতে হলো? হেফাজতই বা কেন এমন বেপরোয়া হয়ে উঠল? কারা ইন্ধন জোগাল? সত্যিই কি ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির বিরুদ্ধে হেফাজত ক্ষুব্ধ? নাকি এটা হেফাজতের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রকাশ? মানলাম, মোদি খারাপ, সে গুজরাটের কসাই, সাম্প্রদায়িক ও দাঙ্গাবাজ। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে তাকে ডাকা উচিত হয়নি। কিন্তু এই কথা বলা কি হেফাজত নেতাদের মুখে মানায়? তারা নিজেরা কি বিভেদকামী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ঊর্ধ্বে? যে হেফাজত মোদিবিরোধী আন্দোলনে এমন সহিংসতা ছড়াল তাদের চরিত্র কেমন? মাত্র কয়েকদিন আগে হেফাজত নেতা মামুনুল হকের সমালোচনা করার অভিযোগে সিলেটের শাল্লায় মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে, হাজার হাজার লোক জড়ো করে কয়েকটি হিন্দু গ্রাম আক্রমণ করা হলো, শত শত বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হলো, সেটা কোন নীতি? এর বিরুদ্ধে হেফাজতের নেতাকর্মীরা কী বলেছিলেন? কী করেছিলেন? নিজেরা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধারকবাহক হয়ে আরেকজনকে ‘সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দেওয়াটা কি গর্হিত কাজ নয়?

মোদির বিরোধিতা করতে গিয়ে হেফাজতের নেতাকর্মীরা যা করেছেন, তা রীতিমতো ফৌজদারি অপরাধ। ২৬ থেকে ২৮ মার্চ তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করা হয় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অফিস ও স্থাপনায়। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় অনেক বাড়িঘর। রেলস্টেশন থেকে থানা, পুলিশ ফাঁড়ি, হিন্দুদের উপাসনালয়, ভূমি অফিস বাদ যায়নি কিছুই। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে সুরসম্রাট আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনও। হামলার টার্গেট ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোও। ভাঙচুর করা হয় জেলা পরিষদ ভবন, পৌরসভা ভবন, পৌর মিলনায়তন, সদর উপজেলা ভূমি অফিস, পুলিশ লাইন, সদর থানা, খাঁটি হাতা বিশ্বরোড হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি, শহরের কেন্দ্রীয় মন্দির শ্রী শ্রী আনন্দময়ী কালীবাড়ি, দক্ষিণ কালীবাড়ি, জেলা আওয়ামী লীগ ও সংসদ সদস্যের কার্যালয়, সরকারি গণগ্রন্থাগার, পানি উন্নয়ন বোর্ড, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি পাঠাগার চত্বর ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ভবন। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির প্রতি ছিল তীব্র ক্ষোভ। প্রতিটি প্রতিকৃতিই খুঁচিয়ে নষ্ট করা হয়েছে। হামলাকারীরা সিসিটিভি ক্যামেরাও খুলে নেয়। বলতে গেলে ওই তিন দিন যেন একাত্তরেরই খণ্ডচিত্র প্রত্যক্ষ করেছে জেলাবাসী। রীতিমতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

হেফাজতের বর্তমান নেতৃত্ব অনেক বেশি ঔদ্ধত্য দেখালেও ক্ষমতাসীনরা তাদের প্রতি এক ধরনের তোষণনীতি অব্যাহত রেখেছে। গত বছর ১৫ নভেম্বর খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্যকে মূর্তি আখ্যা দিয়ে তা অপসারণের দাবি তুলে ব্যাপক হম্বিতম্বি করলেও পার পেয়ে যান। তার বিরুদ্ধে না হয়েছে কোনো মামলা, না নেওয়া হয়েছে কোনো ব্যবস্থা। উল্লেখ্য, মামুনুল হকের বাবা আজিজুল হক ছিলেন নেজামে ইসলামের অন্যতম নেতা, যে দলটি ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা ও ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারণে বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীসহ নেজামে ইসলামের রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল বঙ্গবন্ধু সরকার।

হেফাজতের বর্তমান আমির জুনায়েদ বাবুনগরীও অনেক বেশি কট্টর ও সরকারবিরোধী। তার সঙ্গে জামায়াত-বিএনপির হট কানেকশন। এই সংগঠনটি এখন বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক দল ও শক্তিগুলোর একটি ঐক্যবদ্ধ প্লাটফরম হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশে যেহেতু ইসলামকেন্দ্রিক রাজনীতির একটা বাজার রয়েছে, তাই জামায়াতকে কোণঠাসা করার পর এই রাজনীতির বাজার এখন অনেকটাই হেফাজতের দখলে। জামায়াতের কর্মীসমর্থকরাও এখন অনেকে হেফাজতের ব্যানারে কাজ করে থাকেন। এক সময় নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা যেমন গোপনে আওয়ামী লীগ ন্যাপসহ বিভিন্ন দলে কাজ করতেন। তো এই হেফাজতকে হাতে রাখার জন্য ক্ষমতাসীনরা অত্যন্ত সচেষ্ট। গত এক দশক ধরেই এই প্রক্রিয়া চলছে। ক্ষমতাসীনরা জামায়াত-বিএনপির মতো হেফাজতকেও শত্রুপক্ষে ঠেলে দিতে চান না। ক্ষমতাসীনদের নীতি হচ্ছে: ছলে-বলে-কৌশলে হেফাজতকে হাতে রাখা। এ জন্য তারা মাদ্রাসায় অনুদান বাড়িয়ে, নেতাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে, তাদের দাবি-দাওয়া মেনে, হেফাজতকে পক্ষে রাখতে চায়।

কিন্তু হেফাজত বারবার ফস্কে যায়। কারণ তাদেরও ক্ষমতার নেশায় পেয়েছে। হেফাজতের নেতাদের ধারণা, এ মুহূর্তে তারাই দেশের সবচেয়ে সংঘবদ্ধ শক্তি। তাদের কাছে পাঁচ-দশ লাখ মানুষের জমায়েত করা তেমন কঠিন কাজ নয়। আওয়ামী লীগ ছাড়া যা আর কারও পক্ষে সম্ভব নয়। এই গর্বে হেফাজত নেতারা ধরাকে সরা জ্ঞান করা শুরু করেছেন।

এই দেশে হেফাজতের উত্থান ও হেফাজত নিয়ে ক্ষমতাসীনদের অবস্থান দেশকে এক গভীর সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন। একজন বিশ্লেষক বলেছেন, ‘হেফাজতের ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ নেই, দরকারও নেই। ক্ষমতায় যারা আছে তারাই হেফাজত হয়ে গেছে। তাই হেফাজতকে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব এদেশে। এটা পরিষ্কার যে, মন ও মননে বর্তমান শাসক দলই বড় হেফাজত। অনেকেই বলবেন, এটা শাসক দলের কৌশল! ফালতু কথা! শাসক দল কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে না, নিজেরাই পরিণত হয়েছে হেফাজতে। কিন্তু জনগণ তাদের বিশ্বাস করছে না, কখনো করবেও না। আর জনগণকে বিশ্বাস করানোর জন্য শাসক দল আরও বেশি, আরও বড় হেফাজত হবে।

এই এক দশকে দেখেছি, কীভাবে একটা দল নিজের অস্তিত্বকে ছুড়ে ফেলে অন্য অস্তিত্বে বিলীন হয়ে যায়। বিরাট বিপুল সংখ্যক অনুসারীকেও অন্যের কাছে বর্গা দিয়ে দেয়। আফসোস, এরা আর কখনোই নিজের ঠিকানা খুঁজে পাবে না, কখনোই নিজের ঘরে ফিরবে না! অন্যের ঘরই নিজের ঘর ভেবে বসবাস করবে! বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মিত হয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে ফেরা আর কখনোই সম্ভব নয়। বড়জোর মুক্তিযুদ্ধের নামে কিছু গান কবিতা গল্প চলবে, খণ্ডিত দুু’একজনের পূজা চলবে মাত্র; কিন্তু প্রবলভাবে অনুপস্থিত থাকবে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ!’

আসলে এক ধরনের রাজনৈতিক বিকৃতি সবকিছুই গ্রাস করছে। তথাকথিত প্রগতিশীলদের একটা অংশকেও দেখা গেছে জ্বালাও-পোড়াও আর লাশের মিছিলে বিকৃত আনন্দ অনুভব করতে। প্রগতিশীলদের প্রতি প্রশ্ন, মোদিকে বাংলাদেশে ঢুকতে না দিলে কি তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হতো? তার উগ্র হিন্দুত্ববাদী মানসিকতা বদলে যেত? বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িকতা দৃঢ় হতো? শাল্লায় হিন্দু বাড়িতে আক্রমণ হতো না?

আরেকটি কথা, যদি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন বাংলাদেশে আসতেন, তাহলে কি আপনারা প্রতিবাদ জানাতেন? খুন, গুম, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসকারী, বিরোধী মত দমনকারী স্বৈরশাসক হিসেবে কি তার বিরোধিতা করতেন? বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ভারতের সরকারকে। একাত্তরে বাংলাদেশকে অপরিসীম সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল তৎকালীন ভারত সরকার। সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী যদি একটা কলাগাছ থাকত সেই আসত। ঠিক এই বার্তাটি ক্ষমতাসীনরা ঠিকঠাক মতো বোঝাতে সক্ষম হয়নি। ফলে বুক খালি হলো কিছু মায়ের।

ক্ষমতাসীনরা যদি সতর্ক না হয়, সচেতন না হয়, তাহলে বলতেই হবে যে, সামনে আমাদের জন্য ভয়ানক বিপদ অপেক্ষা করছে। হেফাজত-তোষণ দিয়ে আর যাই হোক মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকিত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়।

লেখক লেখক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত