একজন শিরিন আক্তার দৌড়ে চলেছেন, অপ্রতিরোধ্য গতিতে। রেকর্ড টানা ১২ বারের দ্রুততম মানবী তিনি। ২০০ মিটার স্প্রিন্টেও ৯ বারের সেরা। অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকে যেন তাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর কেউ নেই! আসলেই কি নেই? নাকি অন্যরা পারছেন না বা নতুন কেউ উঠে আসছে না, বছরের পর বছরে সেরা শিরিন? সাতক্ষীরার এই তরুণীর গল্প শুনলে আপনাকে বলতেই হবে বিজয়ীর বেশে তাকেই মানায়।
কথায় আছে, সাফল্য সব সময় পরিশ্রমীদেরই পক্ষে থাকে। ছোটখাটো গড়নের শিরিন সেই পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের জোরেই আজ দেশের স্প্রিন্ট ইতিহাসের অংশ।
২০১৩ বাংলাদেশ গেমস দিয়ে সিনিয়র প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শুরু বিকেএসপিতে বেড়ে ওঠা শিরিনের। সেবার ১০০ মিটার স্প্রিন্টে নাজমুন নাহার বিউটির কাছে ফটো ফিনিশিংয়ে পিছিয়ে দ্বিতীয় হয়েছিলেন। কিন্তু এরপর আর অ্যাথলেটিকসের সবচেয়ে মর্যাদার এই ইভেন্টে তাকে রুখতে পারেননি কেউই। গেল আট বছরে ৭টি জাতীয় ও ৪টি সামার মিটে দ্রুততম মানবী হয়েছেন। যে বাংলাদেশ গেমস দিয়ে বড়দের সঙ্গে লড়াই শুরু, এবার সেই বাংলাদেশ গেমসে ‘ডাবল’ জিতেই শিরিন নিজের রেকর্ড আরও সমুন্নত করলেন। ১০০ মিটার স্প্রিন্টে টানা ১২তম বারের মতো সেরা হওয়ার সঙ্গে ২০০ মিটার স্প্রিন্টে ভেঙে দিলেন ১৫ বছরের পুরনো রেকর্ড। ২০০৬ সালে বিউটির গড়া রেকর্ড হয়ে গেল অতীত। এখানেও টানা তৃতীয়বারের মতো সেরা শিরিন। সব মিলে ৯বার অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকে ‘ডাবল’ জয়ের নজির তার।
সাধারণ এক পরিবার থেকে উঠে এসে কীভাবে ট্র্যাকে অসাধারণ হয়ে উঠলেন শিরিন? গল্পটা ২০১০ সাল থেকে যে কোচের অধীনে রয়েছেন শিরিন, তারচেয়ে কেউ ভালো জানার কথা নয়। তিনি আবদুল্লাহ হেল কাফী। দেশ রূপান্তরকে বিকেএসপির এই কোচ বলছিলেন, ‘ওর অধ্যবসায় ও একাগ্রতাই সাফল্যের রহস্য, আর কিছু নয়। ওর ভাবনায় অন্য কিছুই নেই, ও শুধু ভাবে কীভাবে পারফর্ম করা যায়। এটা নিয়েই সে ব্যস্ত থাকে। দুইটা ঈদ গেল গত বছর, তার আগের বছর একটা ঈদ। তিনটি ঈদে ও বাড়ি যায়নি। সে ঈদের দিনও ট্রেনিং করেছে। সারা বিশ্বে যখন করোনায় সবকিছু বন্ধ, তখন ও বিকেএসপির মাঠে একা একা ট্রেনিং করেছে।’
আর শিরিন এক কোচের অধীনেই দীর্ঘ সময় অনুশীলন করে যাওয়াকে বড় করে দেখেন। তার মতে এ ক্ষেত্রে বিকেএসপির অবদানটাও অনেক। বেশ আগেই শিরিন এখানকার পাট চুকিয়েছেন। নৌবাহিনীর চুক্তিবদ্ধ অ্যাথলেট তিনি। তবে কর্র্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে বিকেএসপিতে অনুশীলনের সুযোগ-সুবিধা নিতে পারছেন। শিরিন এ জন্য কৃতজ্ঞ প্রতিষ্ঠানটির কাছে। প্রতিবারই সেরা হওয়ার পর বিকেএসপি, নিজ সংস্থা বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের কথা আলাদা করে বলেননি তিনি। আর বলেন কোচ আবদুল্লাহ হেল কাফীর কথা, যিনি এত বছর ধরে শিরিনকে দেখছেন কোনো রকম পরিশ্রম ছাড়া! এই কোচকে তাই বাবার আসনে রাখেন শিরিন।
অন্যরা পারছে না বলেই শিরিন সেরা থেকে যাচ্ছেন এমন কথার মানে খুঁজে পান না কোচ, ‘অন্যরা পারছে না এর জন্য তো ও (শিরিন) দায়ী নয়। অন্যরা ওর মতো পরিশ্রম হয়তো করছে না। ওর মতো হয়তো হৃদয়ে ধারণ করছে না অ্যাথলেটিক্সকে। সমালোচনাটা অহেতুক। অন্যদের বরং ওকে দেখে উৎসাহী হওয়া উচিত’ বলছিলেন কাফি। যোগ করেন, ‘দেখেন ও ২০১৪ সালে প্রথমবার দ্রুততম মানবী হয়েছিল। অনেক দিনই কিন্তু পেরিয়েছে। এখন আর এটা বলা যাবে না কেউ উঠে আসেনি এই সময়ে। ওর (শিরিন) টাইমিংগুলো দেখেন। ও রেকর্ড টাইমিংয়ে দৌড়াচ্ছে। ও ওর পরিশ্রমেরই পুরস্কার পাচ্ছে।’
এই পরিশ্রমের জোরে শুধু অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকেই নয়, শিরিন পড়াশোনাতেও এ দেশের ক্রীড়াবিদদের জন্য উদাহরণই গড়েছেন। ২০০৭ সালে বিকেএসপিতে ভর্তি হন শিরিন। ২০১২ সালে এসএসসি ও ২০১৪ সালে এইচএসসি শেষ করে ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে ২০১৪-১৫ সেশনে অনার্সে ভর্তি হয়ে ২০১৮ সালে শেষ করেন। ২০১৯ সালে মাস্টার্স শেষ করেন একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বিপিএড করেছেন উত্তরা ইউনিভার্সিটি থেকে। এখন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি করছেন স্পোর্টস সায়েন্সে। স্বপ্ন দেখেন বিদেশে স্পোর্টস সায়েন্সে পিএইচডি করার। ‘পড়াশোনার মাধ্যমে সায়েন্স কাজে লাগিয়ে স্পোর্টসকে আপডেট করা যায় কি না, সেই চিন্তা মাথায় রেখেই পড়াশোনাকে খেলাধুলার সঙ্গে মিক্সড করেছি’ বলেন শিরিন।
সাতক্ষীরার যে গ্রাম থেকে উঠে এসেছেন শিরিন, সেখানে কোনো মেয়ে শর্টস পরে দৌড়াবে এটা ছিল অবিশ্বাস্য ব্যাপার। শিরিনের পরিবারও যথেষ্ট রক্ষণশীল। চার বোনের মধ্যে তিনি মেজ। বাবা-মা চাইতেন মেয়ে পড়াশোনাটাই করুক মন দিয়ে। কিন্তু শিরিন সেই ছোট্টটি থাকার সময়ই মজে যান খেলায়। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই প্রথম হওয়া। তার
কথায়, ‘বিকেএসপিতে ভর্তির আগে আমাদের জেলায় মোটামুটি আলোড়ন তৈরি করতে পেরেছিলাম।’ পরে স্থানীয় কোচ আকবর আলীর মাধ্যমে বিকেএসপির কথা জানতে পাওয়া ও ট্রায়াল দেওয়া। বিকেএসপিতে ট্রায়ালের সময়ই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন এখানে তাকে ভর্তি হতে হবে। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল শিরিনের। আর তাইতো আজ অন্য সবার জন্য উদাহরণ তৈরি করতে পারছেন।
তবে বিকেএসপির ট্র্যাকে প্রথম দিনের স্মৃতিটা ভুলতে পারেন না শিরিন, ‘আমার ক্লাস থ্রি-ফোরের একটা কেডস ছিল; সাদা রঙের কেডস যেগুলো আমরা স্কুলে পরি। বিকেএসপিতে ৭ম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার সময় সে রকমই জুতা ছিল পায়ে’, শিরিন বলে যান, ‘জুতাটা এমন ছিল, মাঠ পর্যন্ত হেঁটে যাওয়াই খুব কষ্ট হতো, ওটা পরে দৌড়ানো কোনো মতেই সম্ভব নয়। এরকমভাবেই আমার শুরু। পরে বাবা আমাকে আরেক জোড়া কেডস কিনে দেন। সে সময় মনে হয়েছিল, এই ট্র্যাকের শ্রেষ্ঠ স্থানে আমাকে যেতে হবে।’
শিরিন কি পেরেছেন? উত্তরটা সবারই জানা!
