প্রতিকূলতায়ও চলছে ১৪২ বছরের ‘আয়ুর্বেদিক’ মানসিক চিকিৎসালয়

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২১, ০৯:৫৫ পিএম

কোনো সরকারি বা বেসরকারি সাহায্য ছাড়াই প্রতিকূলতায়ও ১৪২ বছর ধরে মানসিক ভারসাম্যহীনদের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের চন্দনাইশের ঐতিহ্যবাহী জোয়ারার ‘পাগলা গারদ’ নামে খ্যাত মানসিক চিকিৎসালয়টি।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের জোয়ারা রাস্তার মাথা থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার পশ্চিমে জোয়ারা গ্রামে ১৮৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একমাত্র আয়ুর্বেদিক এ ‘পাগলা গারদ’।

জানা যায়, কবিরাজ নিশি চন্দ্র দাশ তার ১০ একর জমিতে সরকারি অনুমোদন নিয়ে ‘দামোদর ঔষধালয়’ নামে একটি আয়ুর্বেদিক প্রতিষ্ঠানসহ মানসিক সেবা কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে দামোদর ঔষধালয়টি নিশি বৈদ্যের বাড়ি হিসেবে পরিচিতি পায়। মানবসেবার ব্রত নিয়ে প্রতিষ্ঠিত আয়ুর্বেদিক চিকিৎসালয়টি আধুনিক হাসপাতালের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখনো টিকে আছে। এখানে সম্পূর্ণ নিজস্ব পদ্ধতিতে তৈরি আয়ুর্বেদিক ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয় মানসিক রোগীদের। তৎকালীন পাকিস্তান আমলে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে শাখা খুলে চিকিৎসা সেবা দিত প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে  নিশি বৈদ্যের গড়ে তোলা এ পাগলা গারদের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করা হয়। ধ্বংস করা হয় কবিরাজি ওষুধের কারখানাও । দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঋণ করে পুনরায় এ মানসিক হাসপাতাল চালু হয়। তবে তা আর আগের রূপ ফিরে পায়নি। নিশি বৈদ্য বাড়ির ঐতিহ্য বজায় রাখতে প্রতিষ্ঠানটির হাল ধরেন কবিরাজ নিশি রঞ্জন দাশের ছেলে কবিরাজ চিত্ত রঞ্জন দাশ।

সম্প্রতি সরেজমিনে পরিদর্শনে জানা যায়,  এ চিকিৎসালয়ের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে দুটি মাটির ঘরে। ঘর দুটিতে ছোট ছোট কক্ষ করা হয়েছে। যেখানে মানসিক রোগীদের রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কেয়ারটেকারের মাধ্যমে এখানকার রোগীদের থাকা-খাওয়াসহ যাবতীয় সেবা দেওয়া হয়  সুচারুভাবে। দেশ স্বাধীনের পর এ পর্যন্ত তিন সহস্রাধিক মানসিক রোগীকে সম্পূর্ণভাবে সুস্থ করে তোলা হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা অনেক মানসিক রোগী এখানে চিকিৎসা সেবা নিয়ে সুস্থ হয়ে নতুন জীবন ফিরে যায়। সংশ্লিষ্টরা জানান, অধিক জটিল রোগীর চিকিৎসা এখানে সম্ভব না হলে তাদের পাবনা মানসিক হাসপাতালে অথবা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

এর বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক পীযুষ সেন জানান, তাদের নিজস্ব প্রক্রিয়ায় বৃক্ষ, গুল্ম, লতাপাতা ও বিভিন্ন ওষধি দ্রব্য ব্যবহার করে এখানকার রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া  হয়। অ্যালোপ্যাথিক বা অন্য কোনো ওষুধ তারা রোগীকে দেন না।

মাটির ঘরের ছোট ছোট কক্ষে কয়েকজন মানসিক ভারসাম্যহীন রোগীকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। তাদের দেখাশোনা, খাওয়া-দাওয়ার জন্য এখানে নিয়োজিত আছে বেশ কয়েকজন কেয়ারটেকার। তত্ত্বাবধায়কের দাবি, প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া মানসিক রোগীদের সুস্থ হওয়া রেকর্ড শতকরা ৮০ ভাগ।

আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত কোনো ব্যবস্থা না থাকা প্রসঙ্গে তিনি জানালেন, সরকারি বা বেসরকারি কোনো বিভাগ বা সংস্থা  থেকে কখনো কোনো সাহায্য পাওয়া যায়নি। আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে ইচ্ছা থাকলেও তা করা হচ্ছে না। এখানে ভর্তি করিয়ে কেউ হয়তো রোগীর ভরন-পোষণের খরচ চালান। অনেকে আবার সেই খরচও দেন না। বাণিজ্যিক নয়, শুধু সেবাব্রত নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি চালানো হচ্ছে। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে ছয় পুরুষ ও এক নারী রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এখানে। সাধারণত রোগী প্রতি ভর্তি ফি ৭ হাজার  টাকা নেয়া হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত