বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ঠেকালেন মমতা

আপডেট : ০৩ মে ২০২১, ০৩:১৬ এএম

একটু আধটু হাওয়া নয়, সংখ্যার নিরিখে যাই হোক ভোট শতাংশের দিক দিয়ে দেখলে নিঃসন্দেহে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল সুনামির মতো বিধ্বংসী হয়ে বিজেপির স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। সংখ্যার বিচারও খুব কম নয়। সোমবার দুপুর আড়াইটে নাগাদই তৃণমূল এগিয়ে রয়েছে ২০৫টি আসনে। অন্যদিকে বিজেপি মাত্র ৮০টা আসনে। কিন্তু ট্রেন্ড যা তাতে মনে হয় না বিজেপি কোনোভাবেই একশো পার হতে পারবে। ওই বড়জোর আশি-বিরাশি সিট নিয়েই অন্তত এবারের মতো তাদের ভোটযুদ্ধ শেষ করতে হবে।

বলে লাভ নেই মমতা ব্যানার্জি এভাবে বিজেপির মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে তৃতীয়বারের জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হবেন তা তার অতি বড় সমর্থকও আশা করেননি। আমি বারে বারে লিখে গেছি বিজেপি বঙ্গে আসবে না। কিন্তু অস্বীকার করে লাভ নেই যে গ্রামে গ্রামে জনমনে তৃণমূল কংগ্রেসের ওপর নানা কারণে জনগণের ক্ষোভ দেখে এক এক সময় মনে হয়েছিল জিতলেও কোনোরকমে কানের পাশ দিয়ে তীর যাবে। টায়ে টায়ে গরিষ্ঠতা পেলেই অনেক পাওয়া হবে তৃণমূলের পক্ষে।

জিতলেও আমি কেন, বাঘা বাঘা বিশেষজ্ঞও রবিবার অবধি জানাচ্ছিলেন যে এবারের লড়াই হাড্ডাহাড্ডি। এবং যেই জিতুক সেই খুব বড় মার্জিনে জিতবে না। এক দেড় হাজারের ফারাক থাকবে বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীর মধ্যে। মমতা ব্যানার্জি সবার সব জল্পনা-কল্পনায় জল ঢেলে একাধিক আসনে বিপুল ভোটে জিতে গেছেন বা জেতার পথে।

শুধু বিজেপি বা বিরোধী দলের চ্যালেঞ্জ নয় মমতাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে দলের মধ্যে থাকা অনেক বিক্ষুব্ধ সদস্য সমর্থকেরও। ভোটের আগে আগে মমতা ব্যানার্জির দল ছেড়ে তার একাধিক ঘনিষ্ঠ সহকর্মী বিজেপিতে চলে গিয়েছিলেন। চলে গিয়ে তাদের বড় অংশ অত্যন্ত অশ্লীল ভাষায় মমতা ব্যানার্জিকে আক্রমণও করেছে। এবার ভোটে ২৯৪টি আসনের মধ্যে বিজেপির প্রার্থী তালিকায় ১৪৮ জন

তৃণমূলের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও অন্যান্য নেতানেত্রীরা ছিলেন। তাদের মধ্যে নন্দীগ্রামে মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নেমে কুৎসিতভাবে মমতার চরিত্র হননে নেমে পড়েছিলেন একদা তৃণমূল কংগ্রেসের যুব-সভাপতি ও প্রভাবশালী মন্ত্রী, মমতাঘনিষ্ঠ শুভেন্দু অধিকারী। শেষ খবরে জানা গেছে, কয়েক দফা ভোট গণনার পর শেষ অবধি নন্দীগ্রামের ভোট গণনা স্থগিত করা হয়েছে।

বহু বিষয়ে মমতা ব্যানার্জির রাজনীতির সঙ্গে আমি একমত নই। অনেক সময়ে তার কাজের পদ্ধতি নিয়ে প্রচুর সমালোচনা করেছি। এখন তিনি জিতলেও ওর সব কাজ সমর্থনযোগ্য মনে করি না। তবু এই মুহূর্তে নিঃসন্দেহে মমতা ব্যানার্জির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা না করলে অন্যায় হবে। এবারের লড়াই শুধু জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা ছিল এটুকু বললেই যথেষ্ট বলা হয় না। এবার হারলে মমতা ব্যানার্জির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন উঠে যেত।

এছাড়া বিদায়ী মন্ত্রিসভার মন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপধ্যায় থেকে বৈশালী ডালমিয়া, হাওড়ার প্রাক্তন মেয়র রথীন চক্রবর্তী এরকম অজস্র নেতাকর্মীর অনেকেই নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ’র ডাকে তৃণমূলকে হারাতে আদাজল খেয়ে ভোটের রাজনীতিতে নেমে পড়েছিলেন। এখনো অবধি যা খবর তাতে ওই দলবদলুদের একজনও এগিয়ে নেই। ধরে নেওয়া যায় যে একজনও এবার জিতবে না। এই দলবদলুদের কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ ভালোভাবে মেনে নেননি।

রাখঢাক না করে আর একটা কথা সোজা কথায় বলা যায় যে, এবারের ভোটে তৃণমূল সুপ্রিমোর ভাষায় গাদ্দারদের পাশাপাশি মমতা ব্যানার্জিকে লড়তে হয়েছে একাধিক কেন্দ্রীয় এজেন্সির সঙ্গে। সিবিআই, নির্বাচন কমিশন, ইডি, আয়কর দপ্তর অত্যন্ত দৃষ্টিকটুভাবে নানা হেনস্তা করেছে তৃণমূলকে। কখনো পুরনো মামলায় ‘অভিযুক্ত’দের ঠিক ভোটের আগে ডেকে পাঠিয়ে বা কাউকে আয়কর সংক্রান্ত ফাইল চেয়ে পাঠিয়ে চাপে রেখেছিল নরেন্দ্র মোদি সরকারের অধীনে থাকা নানা সংস্থা। এছাড়া পুলিশ প্রশাসনের আধিকারিকদের যখন তখন কারণে-অকারণে বদলি করে প্রায় প্রকাশ্যে মমতা ব্যানার্জিকে হেনস্তা করা দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছিল নির্বাচন কমিশনের। ফলে কখনো কখনো মমতা ব্যানার্জিকে চক্রব্যূহে আটকেপড়া অসহায় অভিমন্যু মনে হয়েছে।

বস্তুত এবারের ভোটে তৃণমূলের জয়ের পেছনে বড় কারণ বিজেপির কুৎসিত ভাষা ও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতি যা এ বঙ্গের সাধারণ মানুষ মেনে না নিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে।

সাধারণ লোকে তৃণমূলকে যত না সমর্থন করেছেন তার চেয়ে অনেক বেশি ঘেন্না করে বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি যে ভাষায় মমতা ব্যানার্জিকে ‘দিদি ও দিদি’ বলে বিদ্রুপ করে গেছেন তা রাস্তার লুম্পেনদের আচরণের মতো ঠেকেছে লোকজনের, বিশেষ করে নারীদের কাছে। অমিত শাহ, নাড্ডা ও কৈলাশ বিজয় বর্গী, দিলীপ ঘোষ ও ছোট বড় সিকি আধুলি বিজেপি নেতারাও যে ভঙ্গিতে দিনের পর দিন মমতা ব্যানার্জিকে আক্রমণ করতে গিয়ে অজান্তেই বঙ্গ সংস্কৃতিকে আক্রমণ করে গেছেন, সেটা তারা অসংবেদী বলে টের পাননি। কিন্তু সাধারণ বাঙালি মনে মনে ভয় পেয়ে গেছে আগামী দিনে এই দল যদি ক্ষমতায় আসে তাতে রাজ্যের ছবিটা কী হবে সেই আশঙ্কায়।

শান্তিনিকেতনকে ‘দখল’ করার অপচেষ্টা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ারে সাম্প্রদায়িক অমিত শাহর বসে পড়াও শিক্ষিত বাঙালির অহংবোধে ঘা দিয়েছে। বিজেপি মনে রাখেনি এ রাজ্য শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নয়, এই বঙ্গ নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, চিত্তরঞ্জন দাশ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামের। আপনি চান বা না চান প্রবল সাম্প্রদায়িক প্রচারের মধ্যেও এখানে গ্রামে গ্রামে সম্প্রীতির আবহ বয়ে চলে নদীর ফল্গুধারার মতো। মমতা ব্যানার্জির ‘জয় বাংলা’ স্লোগান যতটা জনমনে প্রভাব ফেলেছে তার ধারেকাছে পৌঁছতে পারেনি রাজনৈতিক সন্ত্রাসী ‘জয় শ্রীরাম’ আওয়াজ। যতবার এই ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান উঠছে মাঠেঘাটে ততই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের মনে আছে এই কর্কশ স্লোগান তুলেই গুজরাটে গণহত্যা চালিয়েছিল নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহর নেতৃত্বে সংঘ পরিবারের গু-ারা। সেই আতঙ্ক থেকে সংখ্যালঘু ভোটের পুরোটাই প্রায় গেছে তৃণমূলের ভোট বাক্সে।

পাশাপাশি মমতা সরকারের কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী প্রভৃতি জনমুখী কর্মসূচিও এ রাজ্যের গরিব মানুষের বড় অংশকে নিশ্চিতভাবেই প্রভাবিত করেছে। একটা কথা আগেও বলেছি আজও বলব জনমোহিনী ক্ষমতা এই মুহূর্তে মমতা ব্যানার্জি ছাড়া সারা দেশেই অন্য কারোর সে-রকম নেই। মমতা আক্ষরিক অর্থেই জননেত্রী। কখনো কখনো মমতা ব্যানার্জির মধ্যে ইন্দিরা গান্ধীর ছায়া দেখতে পান অনেকেই। মহাশ্বেতা দেবী, সুভাষ মুখোপাধ্যায় শুধু নন, একদা কমিউনিস্ট নেত্রী গীতা মুখোপাধ্যায়ও প্রভূত প্রশংসা করতেন মমতা ব্যানার্জির।

এবারের ভোটে তথাকথিত তৃতীয় শক্তি ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেছে। বামেদের কেরল সাফল্য পেছনে চলে গেছে বাংলায় এখনো অবধি কোথাও তাদের এগিয়ে না থাকার খবরে। কংগ্রেসের অবস্থাও খুব খারাপ। মালদা মুর্শিদাবাদে কংগ্রেসের তথাকথিত গড় তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। এখনো অবধি সংযুক্ত মোর্চা জিতেছে মোটে একটা আসনে। এগিয়ে আছে দুটোতে। ভাঙ্গর বিধানসভায় জিতেছে আইএসএফ চেয়ারম্যান নৌশাদ সিদ্দিকী। এগিয়ে আছেও আইএসএফ প্রার্থীরাই। অশোকনগর ও ক্যানিং পূর্বে। গণনা চলছে অত্যন্ত ঢিমেতালে। শোনা যাচ্ছে কমিশনের কম্পিউটার হ্যাং করে গেছে। শুরুতেই বলেছি সিটের চেয়েও প্রাপ্ত ভোট তৃণমূলের পক্ষে উল্লেখযোগ্য। এখনো অবধি পঞ্চাশ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে তৃণমূল। যা দশ বছর ক্ষমতায় থাকার পরে খুবই কঠিন। সাধারণ ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে প্রতিষ্ঠানবিরোধী ভোট দেয় লোকে। এবার প্রায় মাঝরাত থেকে নারীরাও যখন লাইন দিয়েছেন তখন বিজেপি আশা করেছিল এ ভিড় তাদের পক্ষে যাবে। কিন্তু সেটা ঘটেনি।

সবার সব গবেষণায় জল ঢেলে শেষ হাসি হাসলেন মমতা ব্যানার্জিই। অবশ্যই তার প্রশংসা প্রাপ্য। শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, এই জয় সর্বভারতীয় রাজনীতিতে আগামী দিনে মমতা ব্যানার্জিকে ফের প্রাসঙ্গিক করে তুলল। দু’হাজার চব্বিশ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রইলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। লেখক

ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত