বয়স তার ৩৮। ক্রিকেটে এতদূর এসে একজন পেসারের ছুটে চলা চাট্টিখানি কথা নয়। তাও আবার ছোট ফরম্যাটে নয়, পাঁচ দিনের ক্রিকেট টেস্টে। আর সবার কথা বাদ, ইংলিশ পেসার জেমস অ্যান্ডারসন যে অন্য ধাতুর তৈরি তা এখানেই স্পষ্ট। এই বয়সেও পূর্ণোদ্যমে বল হাতে ছুটছেন। ইনসুইং-আউটসুইংয়ে পরাস্ত করছেন ব্যাটসম্যানকে। গতি তো থাকছেই। ক্রিকেটের চতুর্থ সর্বোচ্চ এবং পেসারদের মধ্যে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি তিনি। তবুও বয়স ৩৮ বলে কবে থামছেন এই প্রশ্ন বারবারই শুনতে হয় ‘জিমি’কে। অ্যান্ডারসন অবশ্য বলে দিয়েছেন থামার লক্ষ্য নেই, আরও এগোবেন। উদাহরণ হিসেবে টেনেছেন ফুটবল তারকা জলাতান ইব্রাহিমোভিচ ও টেনিস গ্রেট রজার ফেদেরারকে। এ দুজন ৩৯ বছরেও নিজ নিজ খেলার সর্বোচ্চ পর্যায় মাতিয়ে চলেছেন। অ্যান্ডারসনের প্রশ্নÑ ওরা যদি চালিয়ে যেতে পারে তো আমি থামব কেন?
২০০৩ সালে অভিষেকের পর ১৮ বছরে ১৬০ টেস্ট খেলেছেন অ্যান্ডারসন। আর দুই টেস্ট খেললে ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা অ্যালিস্টার কুককে ছাড়িয়ে যাবেন। কোর্টনি ওয়ালশ, ওয়াসিম আকরাম, স্যার রিচার্ড হ্যাডলি, ডেল স্টেইন ও গ্লেন ম্যাকগ্রাকে ছাড়িয়ে পেসারদের মধ্যে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি (৬১৪ উইকেট) এখন তিনি। সামনে অনিল কুম্বলে (৬১৯), শেন ওয়ার্ন (৭০৮) ও মুত্তিয়া মুরালিধরন (৮০০)। ৫ উইকেট দূরে থাকা কুম্বলেকে অনায়াসে টপকে যাবেন জিমি। এরপর লেগ স্পিন গ্রেট ওয়ার্নকে ছুঁতে ছুটবেন। ইংলিশ পেসার গত অ্যাশেজের পর বলেছিলেন অবসরের চিন্তাটা করবেন পরের অ্যাশেজ শেষে। তার মানে আগামী বছর অ্যাশেজে খেলবেন নিশ্চিত। এর আগে নিউজিল্যান্ড ও ভারতের বিপক্ষে হোম সিরিজের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন জিমি। ভারতে গত সফর থেকে ফিরে গোড়ালির চোট কাটিয়ে উঠেছেন। এবার সামনের গ্রীষ্মের প্রস্তুতি নেবেন নিজের কাউন্টি ল্যাঙ্কাশায়ারের হয়ে।
যার চিন্তাটা লম্বা তার জন্য বারবার অবসরের প্রশ্ন শোনা বিরক্তিকর। গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই বিরক্তিই ফুটে উঠল অ্যান্ডারসনের কথায়, ‘আমাকে সবচেয়ে বেশি হতাশ করে একটা বিষয় তা হলো আমাদের দেশে কোনো লোক এক নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছলেই সবাই বলতে থাকেÑ তুমি তো গতি হারাচ্ছ, নিজের কাজটা করতে পারছ না ঠিকভাবে। আমি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি অনেকবার।’
ভুল বলেননি জিমি। গত অ্যাশেজ থেকেই তাকে অবসরের কথা শুনতে হচ্ছে। কিন্তু পারফরম্যান্সে মরচে ধরেনি তার। গত ১০ টেস্টে তার শিকার ৩৭। গড় মাত্র ১৭.৪০। সবশেষ সিরিজেও ভারতের বিপক্ষে জো রুটের মূল অস্ত্র ছিলেন অ্যান্ডারসন। তিন টেস্টে ১৫.৮৭ গড়ে নিয়েছেন ৮ উইকেট। অ্যান্ডারসন যে ইনজুরিপ্রবণ তাও বলা যাবে না। করোনার আগের বছর ২০১৯-এ দলের ১২ টেস্টের ৫টিতে খেলেছেন। করোনার বছর দলের ৯ টেস্টের ৬টিতে খেলেছেন। আর এ বছর ৩৮ বয়সেও ইংল্যান্ডের এখন পর্যন্ত খেলা ৬ টেস্টের চারটিতে স্ট্রাইক বোলার ছিলেন জিমি। তাই কেন থামবেন পাল্টা প্রশ্ন করতেই পারেন অ্যান্ডারসন। ইব্রাহিমোভিচ, ফেদেরার উদাহরণ টেনে বলেন, ‘আমি অন্য খেলার লোকদের দেখে অনুপ্রাণিত হই। দেখুন জøাতান ইব্রাহিমোভিচ ৩৯ বছরে এসি মিলানে নতুন চুক্তি করল। জাতীয় দলে ফিরল। আমেরিকান সকার তারকা টম ব্র্যান্ডি ৪৩ বছরে প্রতিযোগিতা জিতল। রজার ফেদেরার ৩৯ বছরে ইনজুরি থেকে ফিরে আবারও কোর্টে নামবে। ক্রিস থম্পসন ৪০ বছরে অলিম্পিক ম্যারাথনে কোয়ালিফাই করেছে। এটা আমাকে ভাবায় যে কেন আমি থামব? আসলে ব্যক্তিগত রেকর্ড যেমন পরের টেস্টেই অ্যালিস্টার কুককে ছোঁয়া (১৬১ ম্যাচ) আমাকে ভাবায় না। আমি প্রতি মৌসুমের শুরুতে ভাবি যে এবার আমি ফিট আছি কিনা। যখন দেখি বল হাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি আমি খেলি। এ বছরও আমার এটাই মনে হয়েছে যে থেমে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।’
তবে একদিন তো থামতেই হবে। সেদিন ক্রিকেটের কোনো ফরম্যাটটা মিস করবেন। আগেই ছোট ফরম্যাট থেকে অবসরে যাওয়া জিমি জানালেন টেস্ট ক্রিকেটই তার প্রিয়। এই ফরম্যাটকেই মিস করবেন বেশি। তবে এখন এই চিন্তা নয়। নিউজিল্যান্ড-ভারত সিরিজে নজর জিমির, ‘আমি টেস্ট ক্রিকেটকে খুবই ভালোবাসি। এই ভালোবাসা অন্য কী দিয়ে পূরণ করব জানি না। যেদিন অবসরে যাব সেদিন এই খেলাটাকেই মিস করব। এবং সেদিন থেকে আমাকে নতুন কিছু নিয়ে থাকতে হবে। এটাই জীবন। তবে এখন নিউজিল্যান্ড ও ভারত সিরিজ নিয়ে ভাবছি। ওরা বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালিস্ট। দুই সেরা দলের বিপক্ষে আমাদের জিততে হবে।’
