করোনাভাইরাসের মহামারীতে অর্থনীতির বেশিরভাগ খাত চরম ঝুঁকিতে থাকলেও সরকারের সঙ্গে চুক্তি থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর আয় নিরাপদ রয়েছে। চাহিদার তুলনায় দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন বেশি থাকায় অনেক কোম্পানি পূর্ণ সক্ষমতায় না চললেও সরকারের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) থাকায় কোম্পানিগুলোর নিট মুনাফায় ধারাবাহিকতা রয়েছে। কোনো কোনো কোম্পানির আয় বাড়ায় নিট মুনাফাতে বড় অংকের প্রবৃদ্ধিতেও রয়েছে। আবার একই গ্রুপের কোম্পানি অধিগ্রহণের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত কোম্পানির নিট মুনাফায় উল্লম্ফনও দেখা গেছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলোর তৃতীয় প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এমন তথ্য মিলেছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতের দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি কোম্পানি সামিট পাওয়ার লিমিটেডের আয়ে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় নিট মুনাফায় তেমন প্রভাব দেখা যায়নি। কোম্পানিটির তৃতীয় প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি হিসাব বছরের নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) বিদ্যুৎ বিক্রি থেকে সামিট পাওয়ারের আয় হয়েছে ৩ হাজার ৩৯ কোটি টাকা, যা আগের হিসাব বছরের একই সময়ের চেয়ে ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। তবে উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বাড়ায় আয় বৃদ্ধির প্রভাব মুনাফায় তেমনটা পড়েনি।
২০১৯-২০ হিসাব বছরের প্রথম নয় মাসে সামিট পাওয়ারের উৎপাদন ব্যয় ছিল মোট আয়ের ৫৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ, যা চলতি হিসাব বছরের একই সময়ে ৭৫ দশমিক ৪৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন ব্যয় ১১৬ শতাংশ। উৎপাদন বাড়ায় চলতি তৃতীয় প্রান্তিক শেষে কোম্পানির মোট আয় হয়েছে ৭৪৫ কোটি টাকা, যা আগের হিসাব বছরের একই সময়ে ছিল ৭১৮ কোটি টাকা। চলতি হিসাব বছরে সামিটের সুদবাবদ ব্যয়ও বেড়েছে। এ সময় সুদ ব্যয় হয়েছে ১০৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮৪ শতাংশ বেশি। কর পরিশোধের পর সামিটের মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৬৬৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৬৭৬ কোটি টাকা। চলতি হিসাব বছরের নয় মাসে অন্যান্য আয় আসায় সম্মিলিত নিট মুনাফা হয়েছে ৭০৭ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে অন্যান্য আয়ে বড় লোকসানের কারণে নিট মুনাফা কমে ৫৫২ কোটি টাকা হয়েছিল।
চলতি হিসাব বছরের নয় মাসে ডরি পাওয়ার জেনারেশনস অ্যান্ড সিস্টেমস লিমিটেডের বিদ্যুৎ বিক্রি থেকে সম্মিলিত আয় বেড়েছে ২৫ শতাংশ। চলতি হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিক শেষে বিদ্যুৎ বিক্রি থেকে ডরিনের আয় হয়েছে ৪৬৫ কোটি টাকা, যা আগের হিসাব বছরের একই সময়ে ছিল ৩৭২ কোটি টাকা। উৎপাদন ব্যয় ও প্রশাসনিক খরচের পর চলতি হিসাব বছরের নয় মাসে কোম্পানির পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৮৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৬০ শতাংশ বেশি। কর পরিশোধের পর ডরিনের সম্মিলিত নিট মুনাফা হয়েছে ৮৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বেশি। এ সময় কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৬ টাকা ২ পয়সা, যা আগের বছরের নয় মাসে হয়েছিল ৩ টাকা ৭৭ পয়সা।
করোনার মধ্যে চলতি হিসাব বছরের শুরুতে একই গ্রুপের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র অধিগ্রহণের কারণে ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির নিট মুনাফায় চমক দেখা গেছে। এতে করে কোম্পানির নিট মুনাফা প্রায় ৮২ শতাংশ বেড়ে গেছে। চলতি হিসাব বছরের প্রথম নয় মাসে বিদ্যুৎ বিক্রি থেকে ইউনাইটেড পাওয়ারের সম্মিলিত আয় হয়েছে ২ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ৮০২ কোটি টাকা। ইউনাইটেড পাওয়ার সরকারের পাশাপাশি ঢাকা ও চট্টগ্রামের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। কোম্পানির রেভিনিউর বড় অংশই এসেছে অধিগ্রহণ করা দুই সাবসিডিয়ারি থেকে।
উৎপাদন ব্যয় শেষে চলতি হিসাব বছরের নয় মাসে ইউনাইটেড পাওয়ারের সম্মিলিত মোট আয় হয়েছে ৯৩৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৯৭ শতাংশ বেশি। প্রশাসনিক ব্যয়, অন্যান্য আয় ও সুদবাবদ আয়-ব্যয়ের পর কোম্পানির কর-পরবর্তী সম্মিলিত মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৮৭৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪৮২ কোটি টাকা।
বড়দের পাশাপাশি চলতি হিসাব বছরে বিদ্যুৎ খাতের ছোট কোম্পানিগুলোর আয়ও বেড়েছে। চলতি হিসাব বছরের নয় মাসে বারাকা পাওয়ারের আয় বেড়েছে ৯ শতাংশ। এ সময়ে উৎপাদন ব্যয় কিছুটা কমে যাওয়ায় কোম্পানির মোট আয় বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। কর পরিশোধের পর বারাকা পাওয়ারের সম্মিলিত নিট মুনাফা হয়েছে ৭০ কোাট ৯৭ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২২ শতাংশ বেশি।
