প্রথম ম্যাচে ৮৪ রানে থেমেছিলেন মুশফিকুর রহিম। গতকাল সেই রানকে পেরিয়েছেন মাত্র, বৃষ্টি প্রথমবার থামাল তাকে। ২৬ মিনিট পর খেলা শুরু হয়ে মাত্র ১৪ বল হলো। ৯৬ রানে পৌঁছে যান মুশফিক। এরপর আবার বৃষ্টি। এমন থেমে থেমে গড়ানো ম্যাচে সবারই তো বিরক্তি আসে। সেঞ্চুরির দ্বারপ্রান্তে থাকা মুশফিকের মনের কী অবস্থা তা ভাবাই যায়। কিন্তু বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিশ্রমী ও অধ্যবসায়ী ক্রিকেটারটিকে বৃষ্টি বারবার বাধা দিয়েও অন্যমনস্ক করতে পারেনি। মনঃসংযোগের ব্যাঘাতকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের অষ্টম ওয়ানডে সেঞ্চুরি তুলে নেন মুশফিক। সপ্তম সেঞ্চুরির পর ১৫ ওয়ানডে বাদে আবারও শতরান তার। মুছলেন প্রথম ম্যাচে সেঞ্চুরি মিসের আক্ষেপ। যা ১৪ সেঞ্চুরি করা সাকিব আল হাসানকে পেছনে ফেলে সর্বোচ্চ ২৩ শতক হাঁকানো তামিম ইকবালের পরে বসাল তাকে।
বাংলাদেশের একজন মুশফিক আছেন বলে। তার মতো ম্যাচ পরিস্থিতি বুঝে ব্যাট করার সামর্থ্যে অনেক পিছিয়ে বাকিরা। গতকাল মোট ২৪৬ থেকে মুশফিকের ১২৫ বাদ দিলে থাকে মাত্র ১২১ রান। প্রথম ম্যাচের চেয়েও বাজে পরিস্থিতি। গত ম্যাচের মতো তামিম ইকবাল ও মাহমুদউল্লাহ বড় স্কোর করতে পারেননি। সাকিব তো টানা দ্বিতীয় ম্যাচে ব্যর্থ। আগের ম্যাচে ৩৪ বল খেলে করেছিলেন ১৫ রান। এবার তৃতীয় বলেই এলবিডাব্লিউ, নামের পাশে ০। মাত্র দ্বিতীয় ওভারেই উইকেটে আসতে হয় বলে ইনিংস সাজানোর দিকে মনোযোগী হন মুশফিক। তাই ৭৯ রান পর্যন্ত মেরেছেন মাত্র ১টি চার। ৯০ রানের মধ্যে দ্বিতীয়টি। বাকি ৩৫ রান করতে মারেন ৮ চার। প্রথম ম্যাচের মতো এবারও মাহমুদউল্লাহকে নিয়ে হাল ধরতে হলো সাবেক অধিনায়ককে। এই ম্যাচে তাদের জুটি দলকে দেয় ৮৭ রান। এতে বাংলাদেশের হয়ে ওয়ানডেতে এই জুটির ৬৪ ইনিংসে অবদান বাড়ল ২৪২৯ রানে। ১৯ বার হাফসেঞ্চুরি ও ৪ বার সেঞ্চুরি ছাড়ানো জুটি তাদের। জুটির তালিকায় শীর্ষেও মুশফিকের নাম। সাকিব আল হাসানের সঙ্গে ৮৭ ইনিংসে ৩২০৪ রান।
ম্যাচের শুরুতেই বিধ্বংসী হওয়ার ইঙ্গিত দেন তামিম। এক ওভারে তিন চার। ওয়ানডেতে নিজের স্ট্রাইক নিয়ে এত যে কথা সব যেন এই ইনিংসে থামিয়ে দিতে চান। তাই ব্যাট চালিয়ে যাচ্ছিলেন একের পর এক। তা করতে গিয়ে জীবনও পান ওই ওভারেই। পঞ্চম বলে পয়েন্টে তার ক্যাচ নিতে পারেননি লঙ্কান ফিল্ডার। ১২ রানে জীবন পেয়েও লাভ হয়নি তামিমের। দুশমন্ত চামিরার পরের ওভারের প্রথম বলেই এলবিডব্লিউ। লঙ্কার সবচেয়ে দ্রুতগতির বোলারের অসাধারণ একটি ইনসুইংগারে কিছু করারও ছিল না তামিমের। তিন বলের ব্যবধানে আবারও আঘাত চামিরার। এবার সাকিব আল হাসানকে ফেরান শূন্যতে। পেছনের পায়ে লেগেছে বলে রিভিউটা নষ্ট করেননি সাবেক অধিনায়ক। এক ওভারে দুই সেরা ব্যাটসম্যানকে হারিয়ে কঠিন অবস্থায় বাংলাদেশ।
আগের ম্যাচে ব্যর্থ লিটন দাশ এবার ভুল না করার পণ করেছিলেন। তাই ২১ বলে শুধু সিঙ্গেল নিয়েই করেন মাত্র ৫ রান। ২২তম বলে চামিরাকে প্রথম চার মারেন। মুশফিকের সঙ্গে জুটি বেঁধে ভালোই এগোচ্ছিলেন। কিন্তু ভুল শটে ইনিংসের আত্মাহুতি দেন। বাঁহাতি স্পিনার সান্দাকানের অফস্ট্যাম্পের বাইরের সাধারণ একটি বলকে অযথাই পয়েন্টে তুলে মারলেন। ফলাফল ক্যাচ অনুশীলনের মতো বল একেবারে ফিল্ডারের হাতে। সর্বশেষ ১১ ইনিংসে দ্বিতীয় হাফসেঞ্চুরির অপেক্ষা বাড়ল এই ব্যাটসম্যানের।
মোহাম্মদ মিঠুনের পরিবর্তিত মোসাদ্দেক হোসেন নামেন এরপর। ২০১৯ এ সবশেষ ওয়ানডেতে ৭-এ নেমেছিলেন। এবার পাঁচে। কিন্তু ব্যাটে রান খরা সেই আগের মতোই। স্ট্রাইক রোটেট করে মুশফিককে সঙ্গ দিচ্ছিলেন। কিন্তু ১২ বলে ১০ এর বেশি করা হলো না। সান্দাকানের লেগ স্ট্যাম্পের বাইরের বল ফ্লিক করতে গিয়ে কিপারের হাতে ধরা। ১৬ ওভারে ৭৪ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে বেশ বিপদে বাংলাদেশ। আগের ম্যাচে মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ জুটি বাঁধেন দল ৪ উইকেটে ৯৯ এ থাকার সময়। এবার ৭৪ রানেই। দেখেশুনে এগোতে থাকেন তারা। ম্যাচের প্রথম ছক্কা আসে মাহমুদউল্লাহর ব্যাট থেকে ২৯তম ওভারের প্রথম বলে। দলের রান তার আগে ২৮ ওভারে ৪ উইকেটে ১২২। দ্রুত রান তোলা শুরু করছিলেন মাহমুদউল্লাহ। পরের ৫ ওভারে ওঠে ৩৬ রান। কিন্তু তখনই আবার ধাক্কা। কিপার কুশল পেরেরার দারুণ বুদ্ধিতে হার মানেন মাহমুদউল্লাহ। ৫৮ বলে ৪১ রানে থাকা অবস্থায় সান্দাকানকে ল্যাপ সুইপ করতে যাচ্ছিলেন। তা আগেই বুঝতে পেরে লেগসাইডে সরে যান পেরেরা। বল আটকে যায় তার গ্লাভসে। ৭-এর সমস্যা কাটানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন আফিফ প্রথম ম্যাচে। এবার দুই ওভারে দুই চার মেরে হাত চালিয়ে খেলা শুরু করেন। অথচ ইনিংসের তখনো ১৬ ওভার বাকি। ১০ রানের বেশি টিকতে পারেননি আফিফ। উদানাকে লং অনে তুলে মারতে গিয়েও ক্লিয়ার হিট করতে পারেননি। তাই কিছুদূর পিছিয়ে যেতে সহজেই ক্যাচ নেন নিশাঙ্কা। মিরাজ উইকেটে টিকলেন মাত্র ২ বল। হাসারাঙ্গার গুগলিতে বোকা বনে সরাসরি বোল্ড হন।
মোসাদ্দেক-আফিফরা যে ভুল করেছেন ক্রিজে আসা সাইফুদ্দিনকে সেই ভুল করতে দেননি মুশফিক। সাইফুদ্দিনকে একেবারে ঠা-া থাকতে বলে নিজে দলের রানের গতি বাড়ান। তাই দুজনের ৪৮ রানের জুটিতে মুশফিকের রান ৩৭। ১১ রানে রান আউট হয়ে সাইফুদ্দিন ফেরার পর চার বলে তিন চার মারেন মুশফিক। শরিফুল ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম বলেই আউট হন। পরের ওভারে চামিরাকে তুলে মারতে গিয়ে মুশফিকের ১২৫ রানে অসাধারণ ইনিংসের শেষ হয়। ১১ বল অব্যবহৃত রয়ে যায়।
