ঠিক এক মাস আগে সুইজারল্যান্ডে আর্চারি বিশ্বকাপে (স্টেজ-২) রিকার্ভ মিশ্র দলগত ইভেন্টে রুপা জিতেছিলেন দিয়া সিদ্দিকী। সেই সাফল্যে তার সঙ্গী রোমান সানা আগেই সরাসরি অলিম্পিকে খেলার টিকিট নিশ্চিত করে রেখেছিলেন। সোমবার দিয়া সিদ্দিকী পেলেন ওয়াইল্ড কার্ডের মাধ্যমে টোকিও’র আসরে খেলার খবর।
দিয়ার অলিম্পিকের ছাড়পত্র পাওয়ার এই খবরে স্বাভাবিকভাবেই আর্চারি অঙ্গনে বইছে আনন্দের জোয়ার। অথচ একটা সময় নিজেকে দিয়ে কিছুই হবে না বলে মনে করতেন দিয়া। ক’দিন আগেই দেশ রূপান্তরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দিয়া বলেন, ‘জানেন একটা সময় মনে হয়েছিল আমাকে দিয়ে কিছুই হবে না।’
কেন এমন মনে হতো দিয়ার? ২০১৯ সালে আইএসএসএফ আন্তর্জাতিক সলিডারিটি আর্চারি দিয়ে প্রথম শিরোনামে আসা তার। অথচ সে বছর শেষ দিকে নেপালে হওয়া এসএ গেমসে খেলার সুযোগই যে মেলেনি তার। যে আসরে আর্চারি দশ ইভেন্টের সবগুলোতে স্বর্ণ জিতে অবিশ্বাস্য গল্প লিখে।
সাক্ষাৎকারে সেই কষ্টের কথাই বলেছিলেন দিয়া, ‘আইএসএসএফ সলিডারিটি চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জয়ের পর সবাই খুব বাহবা দিয়েছিল। অনেক আলোচনাও হয়েছিল আমাকে নিয়ে। এরপর থাইল্যান্ডে এশিয়া কাপে খেলতে যাই। সেখানে রোমান ভাইয়ার সঙ্গে মিক্সড টিম ইভেন্টে চতুর্থ হই। তখন পর্যন্ত ভালোই ছিল। কিন্তু এরপরই ছন্দপতন ঘটে। জাতীয় দলের ক্যাম্পে ট্রায়ালগুলোতে টার্গেট পূরণ করতে ব্যর্থ হই। যে কারণে এসএ গেমসের দল থেকে বাদ পড়ি।’
দিয়ার এই ছন্দ পতনের শুরু ২০১৯ সালে স্পেনে হওয়া যুব বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ থেকেই। দিয়ার কথায়, ‘ওখানে খুবই খারাপ পারফরম্যান্স হয়েছিল। তীর নিয়মিত বাইরে মারতে শুরু করি। খুব আপসেট হয়ে পড়েছিলাম। ওখান থেকেই আমার খারাপ করার শুরু। ফল স্বরূপ এসএ গেমসের দল থেকে বাদ পড়ি। এসএ গেমসের আগেই অবশ্য ক্যাম্প থেকে ছুটি নিই এসএসসি পরীক্ষার জন্য। এসএসসিতে অল্পের জন্য জিপিএ ফাইভ পাইনি (৪.৮৯)।’
পারফরম্যান্সে ছন্দ পতন হতেই অনেক সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছে দিয়াকে। ‘ওই সময় অনেকেই অনেক কথা বলত। আমি নাকি অনেক বেশি অহংকারী হয়ে গেছি, চিন্তা-ভাবনা অন্য দিকে চলে গেছে। অথচ আমি কখনই এমন নই। খুব ভেঙে পড়েছিলাম এসব কথা শুনে। মনে হচ্ছিল আমাকে দিয়ে আর কিছু হবে না।’- বলছিলেন দিয়া।
তখন আত্মবিশ্বাস তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল দিয়ার। তবে জেদ থেকেই আবার ফিরে আসা তার, ‘আমার কোচ মার্টিন (ফ্রেডরিখ), জিয়া স্যার, রোমান ভাই, মিলন ভাই (ইমদাদুল হক মিলন), আমাকে অনেক সাহস দিতেন। আমিও নিজেকে বোঝাতে শুরু করলাম। আমি কখনই অহংকার করিনি, সবসময় মাটির সঙ্গে মিশে থাকতে চেয়েছি। কারণ আমি মাটির মানুষ। এসএ গেমসের দলে সুযোগ না পাওয়ার পর খুব জেদ চেপে গিয়েছিল। ট্রায়ালে পাঁচ নম্বর হয়েছিলাম। আসলে একটা ধাক্কার পর বলে না মানুষের অনেক পরিবর্তন ঘটে। আমার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।’
করোনার বিরতি কাটিয়ে গত বছর জুলাইয়ে আবার ক্যাম্প শুরু হলে সবকিছু নতুনভাবে শুরু করেন দিয়া। তার চাপমুক্তির পেছনে রয়েছে দুই কোচের অবদান, ‘কোচ মার্টিন আমাকে কখনই হাল ছাড়তে দেননি। জিয়া স্যারও খুব সাহস দিতেন। তিনিই কোচকে বলে ফিঙ্গার ট্যাপ চেঞ্জ করে দেন। তখন থেকেই ধীরে ধীরে ভয়টা কাটতে থাকে। চাপমুক্ত হয়ে খেলতে শুরু করি।’
চাপমুক্ত দিয়া এরপর সুইজারল্যান্ডে লিখেন দারুণ এক সাফল্যের গল্প। যা তাকে সরাসরি অলিম্পিকের টিকিট কাটার বিশ্বাসও দিচ্ছিল। প্যারিসে চলমান আর্চারি ওয়ার্ল্ড কাপ স্টেজ-৩ আসর থেকে সেই টিকিট কাটার সুযোগ ছিল দিয়ার। তবে সেই স্বপ্ন পূরণ না হলেও সুইজারল্যান্ডের পারফরম্যান্সেই ওয়াইল্ড কার্ড মিলেছে তার। দেড় বছর আগে এসএ গেমসে সুযোগ না পাওয়া মেয়েটি এখন অপেক্ষায় অলিম্পিকের মঞ্চে খেলার।
আরো পড়ুন
