ঈদের আগে তাঁত পল্লিতে কাজের ভরা মৌসুম। এ সময় দম ফেলানোর সময় থাকে না তাঁতিদের। কিন্তু মহামারি করোনা ও লকডাউনের কারণে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বরাইদ ও দিঘুলিয়া ইউনিয়তের তাঁত পল্লিতে এবার নেই কোনো ব্যস্ততা।
প্রায় দেড় বছর ধরে কোনো অর্ডার না থাকায় পথে বসার উপক্রম হয়েছে সংশ্লিষ্ট তাঁত পরিবারের।
বরাইদ ইউনিয়নের আগ সাভার, সাভার, দিঘুলিয়া ইউনিয়নের জালশুকা, চাচিতারা এবং দিঘুলিয়া গ্রামে রয়েছে সাড়ে ৪ হাজার তাঁত মেশিন। প্রায় ৩ শতাধিক মহাজনের অধীনে ১৫ হাজার শ্রমিক প্রত্যক্ষভাবে এ পেশায় জড়িত।
১৫ হাজার শ্রমিকের প্রায় ৫০ হাজার মানুষের রুটি রুজির ব্যবস্থা বন্ধ রয়েছে লকডাউনে।

সরেজমিনে গিয়ে তাঁতিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সাটুরিয়ায় উৎপাদিত তাঁতের কাপড়, থ্রি পিস, পাঞ্জাবির কাপড় এবং গায়ের চাদর জেলার চাহিদা মিটিয়ে চলে যাচ্ছে দেশের শীর্ষ সব নামিদামি ব্যান্ডের শো-রুমে। এখানে ৬০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫ হাজার টাকার কাপড় উৎপাদন হয়। যখন কাজ থাকে প্রতিদিন গড়ে ৮-৯ হাজার পিস কাপড় উৎপাদন হয়।
হাতের মেশিনে প্রতি কাপড়ের মজুরি একশত পঞ্চাশ টাকা আর মেশিনে বোনা কাপড়ের মজুরি ৭০-৮০ টাকা। কিন্তু চলমান লকডাউনের কারণে ঈদের ভরা মৌসুমে কোনো কাজ না থাকায় হুমকির মুখে পড়েছে তাঁত শিল্পটি।
সাভার গ্রামের তাঁত মহাজন বাবুল হোসেন বলেন, গত বছরে করোনা আসার পর থেকেই আমাদের অর্ডার কমে গেছে। গেল বৈশাখের, রোজার ঈদ এবং এখন কোরবানির ঈদেও কোনো কাজ নেই। প্রতি মৌসুমে খরচা বাদ দিয়ে লাখ টাকা ব্যবসা হত। আর করোনার জন্য উল্টা আড়াই লাখ টাকার ঋণ হইছি।

একই গ্রামের সুমন আহম্মেদ বলেন, প্রতি বছর সুতার দাম, শ্রমিক খরচ বাড়লেও পাইকারি দাম বাড়ে না। করোনার সংকটে আমাদের তাঁত শিল্পই এখন সংকটের মধ্যে পড়ে গেছে।
আনোয়ার হোসেন নামে তাঁত শ্রমিক বলেন, অন্য পেশার বেকার শ্রমিকরা এই করোনায় ১-১০ বার খাদ্য সহায়তা পেয়েছে। কিন্তু তাঁত শ্রমিকদের কিছুই দেওয়া হয়নি।
সুরহাব হোসেন নামে তাঁতের মহাজন বলেন, আমি দেড় কোটি টাকা দিয়ে ৩ বছর আগে পাওয়ালম মেশিন দিয়ে বড় একটি কারখানা শুরু করেছি। ভালোই লাভ পাচ্ছিলাম। কিন্তু করোনায় সব শেষ। বাইরের জেলার ৪-৫ জন শ্রমিক লকডাউনের জন্য বাড়ি যেতে পারে নাই। তারা জোর করে কিছু কাজ করছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে কোনো ব্যাংকে ঋণ নিতে গেলে বলে, তাঁত পল্লিতে কোনো বরাদ্দ নাই। আমাদের সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা না করলে এ শিল্প অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে।

সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, আমাদের সাটুরিয়ার উৎপাদিত তাঁতের কাপড় বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ সুনাম রয়েছে। এটা আমাদের গর্বের। তাঁত শিল্পে জড়িতরা যাতে সহজ শর্তে সরকারি প্রণোদনা পান তার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনার চেষ্টা করব।
এ ব্যাপারে সাটুরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান বীর মু্ক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আব্দুল মজিদ ফটো বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁত পল্লিদের সাহায্য করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই অন্য পেশার মত তাঁতিদের অর্থ বরাদ্দ দেবেন। আমি উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দ্রুত সরকারি ও ব্যক্তিগতভাবে তাঁত শ্রমিকদের এই আপদকালীন খাদ্যসহায়তা দেব।
