পাপুয়া নিউগিনির ‘কুখ্যাত’ বোমানা কারাগারে বন্দি থাকা বাংলাদেশি নাগরিক হেলাল উদ্দিন নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। মানসিক চাপ এবং কারাগারটির পরিবেশের কারণে সেই ঝাঁকড়া চুল কমতে শুরু করেছে তার। একবার নিউমোনিয়াও হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এসবিএস নিউজের তদন্ত প্রতিবেদন থেকে গত অক্টোবরে হেলালের দুর্দশার খবর পাওয়া যায়। গণমাধ্যমটির নামকরা প্রামাণ্যচিত্র বিভাগ ডেটলাইনে সোমবার হেলালকে নিয়ে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে তার শারীরিক আর মানসিক অসুস্থতার চিত্র উঠে এসেছে।
আট বছর ধরে ভুগছেন হেলাল: ঢাকা শহরে এক সময় বাবুর্চির কাজ করা হেলাল ২০১৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিসমাস আইসল্যান্ডে গিয়ে ধরা পড়েন। ওই সময় গ্রামের বাড়িতে সরকারবিরোধী একটি বিক্ষোভে অংশ নিয়ে ফেঁসে যান। পরে ভয়ে দেশ ছাড়েন।
অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসী কর্তৃপক্ষ অন্যদের মতো তাকেও মানুস দ্বীপের বন্দীশিবিরে পাঠিয়ে দেয়।
এই বন্দীশিবির নিয়ে দেশে-বিদেশে অস্ট্রেলিয়া সরকার সমালোচনার মুখে পড়লে ২০১৬ সালে তারা কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। তখন হেলাল মুক্তি পান।
২০১৭ সালের মার্চে অ্যালিস মাইকেলের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। দুজনে বিয়েও করেন। তাদের সংসারে একটি ছেলে সন্তান আছে।
হেলাল সংসার শুরু করে বেশি দিন স্বাধীন থাকতে পারেননি। তার শরণার্থী পরিচয় বাতিল করে কর্তৃপক্ষ আবার তাকে গ্রেপ্তার করে।
পাপুয়া নিউগিনির অভিবাসী বিষয়ক মন্ত্রী রিমবিঙ্ক পাতো ওই সময় জানান, দেশটিতে তার বসবাস অবৈধ। স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ না করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। হেলাল তখন বাংলাদেশে ফিরতে বাধ্য হন।
বাংলাদেশে ফিরলেও হেলালের মন পড়েছিল পাপুয়া নিউগিনিতে। বৈধভাবে সেখানে ফিরে যেতে তিনি ভিসার আবেদন করেন। কিন্তু সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে নৌকায় চড়ে থাইল্যান্ড এবং ইন্দোনেশিয়া হয়ে আবার পাপুয়া নিউগিনিতে পৌঁছান। এবারও ভিসা বা পাসপোর্ট কিছুই ছিল না তার।
হেলাল উদ্দিন বলছেন, ছয় সপ্তাহের সেই নৌকা ভ্রমণে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হন। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সমুদ্র সীমানার কাছে তার তিন বন্ধুকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। তার বেঁচে থাকাকে তিনি ‘অলৌকিক’ বলছেন।
মানুস দ্বীপের পশ্চিমে নেমে তিনি তার স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে মিলিত হন। আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যান তিনি। কিন্তু কয়েক মাস পর আবারও গ্রেপ্তার হন।
২০১৯ সালের মার্চে রেস্টুরেন্ট ব্যবসার জন্য বৈধ কাগজপত্র তুলতে গিয়ে ধরা পড়ে যান। এবারও অভিযোগ, সেই অবৈধ অনুপ্রবেশ।
হেলাল এখন যেমন আছেন: ২০২০ সালের এপ্রিলে ন্যাশনাল কোর্টের বিচারক ডেভিড ক্যানিং তার পর্যবেক্ষণে বলেন, হেলালকে তিন বছর পাপুয়া নিউগিনিতে থাকতে দেয়া উচিত।
কিন্তু অভিবাসন কর্তৃপক্ষ এই রায়ের বিরুদ্ধে আবার আপিল করে। সেই থেকে আর ছাড়া পাওয়া হয়নি হেলালের।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আপিলের শুনানি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারক মারা গেলে সেটি স্থগিত হয়ে যায়।
বোমানা কারাগার থেকে হেলাল ডেটলাইনকে বলেছেন, ‘সব কিছু থমকে আছে। কিছুই এখন আর শুনতে পাই না।’
‘স্ত্রী-সন্তান আমাকে ছাড়া কষ্টে আছে। ওদের টাকা দরকার, আমার কাজ করা দরকার।’
পাপুয়া নিউগিনি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে ডেটলাইন। তবে সেখান থেকে ইতিবাচক কোনো উত্তর তারা পায়নি।
শরণার্থী অ্যাডভোকেট আয়ান রিন্টুল বলছেন, হেলালকে নিয়ে তারা এখন অন্ধকারে।
‘আমি ওর সঙ্গে প্রায়ই কথা বলি। আমরা আপিলের তারিখের জন্য অপেক্ষা করছি।’
‘পুরো বিষয়টি ঝুলে আছে। দুই বছর আগে যে আশা আমাদের ছিল, তা এখন ফিকে। জানি না কতদিন এভাবে অপেক্ষা করতে হবে। ’
বোমানা কারাগারকে পৃথিবীর অন্যতম কঠিন কারাগার হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে ‘ওয়ার্ল্ডস টাফেস্ট প্রিজনস’ প্রামাণ্যচিত্রে। করোনার কারণে সেখানকার জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
রিন্টুল জানিয়েছেন, হেলালকে কয়েকবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মুক্তির আশায় কারাগারে থাকতে থাকতে তার শরীর আর আগের মতো নেই।
