পেকুয়ায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি: লক্ষাধিক পানিবন্দী

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২১, ০৭:৪৫ পিএম

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাউবো নিয়ন্ত্রিত বেড়িবাঁধ ভেঙে মাতামুহুরি নদীর পানি ঢুকে বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

পেকুয়া উপজেলা সদরের সঙ্গে বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ গত তিন দিন ধরে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। একইভাবে পেকুয়ার বিভিন্ন এলাকায় পল্লি বিদ্যুতের দেখা নেই। বন্যাকবলিত এলাকায় শত শত নলকূপ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এর ফলে বন্যা কবলিত এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, পেকুয়া উপজেলার তিনটি পয়েন্টে পাউবো নিয়ন্ত্রণাধীন বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় কমপক্ষে ৫০ গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোতাছেম বিল্লাহ সরকারি বরাদ্দ থেকে বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকায় শুকানো খাবারসহ ত্রাণসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রেখেছেন বলে জানিয়েছেন।

তিনি জানান, বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ইউএনও বানভাসি মানুষের খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে পেকুয়া উপজেলা শিলখালী ও বরাবাকিয়া ইউনিয়নের পাহাড়ে বসবাসকারী বেশ কিছু পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এর ফলে প্রবল বর্ষণ হলেও পেকুয়ায় পাহাড় ধসে জানমালের ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।   

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পেকুয়া সদর ইউনিয়নের পূর্ব মেহেরনামা এলাকায় বেড়িবাঁধের দু’পয়েন্টে ভেঙে যাওয়ায় সদর ইউনিয়নের পূর্ব মেহেরেনামা মোরার পাড়া, বাজার পাড়া, সৈকত পাড়া, নন্দীর পাড়া, হরিণাফাঁড়ী, চৈরভাঙ্গা, চড়া পাড়া, তেলিয়াকাটা, সাবেক গুলদি, সরকারি ঘোনা, নতুন বাগুবাজার, সাকুতলাসহ আরো বেশ কিছু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

পেকুয়া সদর ইউনিয়নের পূর্ব মেহেরানা গ্রামের বাসিন্দা এবি পার্টির নেতা কাউসার বিন ইসলাম জানান, ভেঙে যাওয়া পাউবোর বেড়িবাঁধ এখনো পুনর্নির্মাণ না হওয়ায় জোয়ারের সময় লোকালয়ে পানি প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। পূর্ব মেহেরনামা এলাকায় অনেক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পাউবোর বেড়িবাঁধ মাতামুহুরি নদীর বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বেড়িবাঁধের বিভিন্ন অংশে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে।

image

পেকুয়া সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বাহাদুর শাহ গত কয়েক দিন ধরে সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে নগদ অর্থ সহায়তা বিতরণ করেছেন বলে জানিয়েছেন।  

শিলখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরুল হোসাইন জানান, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের শিলখালী ইউনিয়নের পেঠান মাতবরপাড়া, হাজিরঘোনা, দোকানপাড়াসহ প্রায় ৮/১০ টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে যায়। বন্যাকবলিত এসব গ্রামের লোকজনকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে।

জানা যায়, বেড়িবাঁধ ভেঙে উজানটিয়া ইউনিয়নের বেশ কিছু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। মাতামুহুরি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জোয়ারের পানির আঘাতে উজানটিয়া ইউনিয়নের পূর্ব উজানটিয়া গোদারপাড়া স্টেশনের অদূরবর্তী স্থানে একটি পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। এতে করে বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে এই ইউনিয়নের পূর্ব উজানটিয়ার সুতাচুরা, গোদারপাড়া, নুরীর পাড়া, রুপালীবাজার পাড়া, দক্ষিণ সুতাচুরা, মালেকপাড়া, ঠান্ডার পাড়া, আতর আলী পাড়াসহ বিপুল এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে।

উজানটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম শহিদুল ইসলাম ইসলাম চৌধুরী জানান, তার ইউনিয়নের গুদারপাড়া গ্রামে এলাকায় পাউবোর ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ তিনি পাউবোর নির্দেশে বৃহস্পতিবার বার মেরামত করেছেন। এতে করে সামান্যতম হলেও জোয়ারের পানি ঠেকানো যাবে। 

তিনি অতি দ্রুত উজানটিয়া ইউনিয়নের সংস্কারবিহীন পাউবোর বেড়িবাঁধ মেরামতের জন্য পাউবোর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড পাউবোর পেকুয়া উপজেলার দায়িত্বে থাকা সেকশন অফিসার (এসও) প্রকৌশলী গিয়াস উদ্দিন জানান, গত কয়েক দিন ধরে তিনি পেকুয়ার বিভিন্ন বেড়িবাঁধ সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। মগনামায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ হওয়ায় এবার সেখানে কোনো ক্ষতি হয়নি। উজানটিয়া ইউনিয়নে ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধের জন্য জরুরি মেরামতের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে। তবে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধের অংশ মেরামত করেছেন।

image

তিনি আরো বলেন, পেকুয়া সদর ইউনিয়নের কোথাও বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়নি। বন্যার পানি লোকালয় থেকে দ্রুত বের হওয়ার জন্য স্থানীয়রা পেকুয়া সদরের পূর্ব মেহেরনামা এলাকার দুটি পয়েন্টে বেড়িবাঁধ কেটে দিয়েছেন।

সরেজমিনে বিভিন্ন গ্রাম পরিদর্শন করে দেখা গেছে, পেকুয়া উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের মধ্যে পেকুয়া সদর, বারবাকিয়া, শিলখালী, টইটং ও মগনামা ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে উপজেলার পেকুয়া সদর, মগনামা, শিলখালী, বারবাকিয়া ও টইটং ইউনিয়নের বিপুল এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। মাতামুহুরি নদীসহ শাখা নদীগুলোতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব ইউনিয়নের ইউনিয়নের শত শত বাড়িঘরে পানি ঢুকেছে। গ্রামীণ অবকাঠামো পানিতে তলিয়ে গেছে। অসংখ্য পুকুর, চিংড়ি ঘের ও মৎস্যখামার পানিতে তলিয়ে গেছে। বন্যার পানিতে ভেসে গেছে টাকার বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।  বীজতলাও পানিতে তলিয়ে গেছে। ফসল ও বীজতলার ক্ষতি হওয়ায় স্থানীয় কৃষকরা ও পড়েছেন চরম বিপাকে।

মগনামা ইউপি চেয়ারম্যান শরাফত উল্লাহ চৌধুরী জানান, মগনামা ইউনিয়নের কুমপাড়া, ধারিয়াখালী, বাইন্যা ঘোনা, দরদরি ঘোনা, মগঘোনা, শরৎঘোনা, পশ্চিম বাজার পাড়া, হারুন মাতবর পাড়া, কালার পাড়া, শুদ্ধাখালী পাড়া, কইডা বাজারপাড়াসহ আরো বেশ কয়েকটি গ্রাম টানা বর্ষণে প্লাবিত হয়েছে। বেশ কিছু পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার মগনামার ১৩০ পানিবন্দী পরিবারকে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে।  

বারবাকিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাওলানা বদিউল আলম জানান, তার ইউনিয়নের ভারুয়াখালী, বারাইয়াকাটা, নাজিরপাড়াসহ ৫/৬ টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ওই এলাকার গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

পাহাড়ি ঢলের পানি ও টানা বৃষ্টির কারণে ওই এলাকা প্লাবিত হয়েছে বলে চেয়ারম্যান জানান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত