সংকটে যেমন প্রকৃত বন্ধুকে চেনা যায়, তেমনই সঠিক পথের খোঁজও মেলে। করোনা ভাইরাসের প্রবল সংকটে তাই আশাজাগানিয়া অনেক ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেছি আমরা। মৃত্যুর বিভীষিকার মধ্যে সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থার আবশ্যকতা নতুন করে উপলব্ধি করলাম আমরা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা যেভাবে দিন-রাত সেবা দিচ্ছেন তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। মানব কল্যাণে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আরও কতজন কত কাজই না করছেন। কেউ লাশ সৎকারে, কেউ অসহায় মানুষের খাবারের সংস্থানে আবার কেউ অন্য কোনো সেবায় নিজেকে উজাড় করছেন। হতাশায় নিমজ্জিত আমাদের ভাবনায় যা অসম্ভব ঠেকে, তা-ই তারা সম্ভব করে তুলছেন।
এই মানবসেবার ব্রত দেশের সীমানায় আবদ্ধ নেই। তেমনই এক উদ্যোগের ফসল বাংলাদেশের নতুন ধরনের আড়াইশটি ভেন্টিলেটর প্রাপ্তি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত ও বাংলাদেশের কয়েকজন বাঙালির প্রচেষ্টায় জীবনরক্ষার অতি প্রয়োজনীয় এ যন্ত্রগুলো দেশে এসেছে। উপহারের ভেন্টিলেটরগুলো প্রাপ্তিতে বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বিশিষ্টজনদের মধ্যে যোগাযোগে এবং বাংলাদেশে পাঠানোয় ভূমিকা রাখে ‘বাংলা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড’ নামের এক সংগঠন। সম্প্রতি এ নিয়ে তারা একটি ওয়েবনিয়ার আয়োজন করে। সেখানে আলোচনা শুনতে শুনতে ভাবনায় ভেসে ওঠে দেশের তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবার হাল-হকিকত, জাগে নতুন আশাও।
এ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. অমিত চক্রবর্তী, শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ, যুক্তরাজ্য থেকে ডা. ইমতিয়াজ আহমেদ, বাংলাদেশ থেকে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ডা. কামরুল হাসান খান কথা বলেন। ভারতের রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক পবিত্র সরকারের সভাপত্বিতে এ ওয়েবনিয়ারে বাংলাদেশ থেকে আরও ছিলেন নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার এবং জাতীয় সংসদ সদস্য আরমা দত্ত। কলকাতার সাংবাদিক স্নেহাশিষ সুরের সঞ্চালনায় এ আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যে যেখানেই থাকুক কল্যাণের ব্রত নিয়ে সবাই কেমন পরস্পর একাট্টা। সাধারণ মানুষের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় আরও সামগ্রী জোগাড়ে তাদের অব্যাহত চেষ্টার কথাও জানা হলো।
যুক্তরাষ্ট্র নিবাসী নিউরোলজিস্ট ড. অমিত চক্রবর্তী তুলে ধরেন সদ্য পাওয়া এই ‘কো-ভেন্টিলেটর’-এর বৈশিষ্ট্য। তার বক্তব্য শুনে মনে হলো, তৃণমূলে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার বিশাল দুয়ার যেন খুলছে। আইসিইউ-ভিত্তিক ভেন্টিলেটরগুলো চালাতে যে ধরনের বিশেষ যোগ্যতার চিকিৎসক দরকার পড়ে এগুলোর ক্ষেত্রে তা আবশ্যক নয়। ফলে বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন চিকিৎসকের অভাবে ভোগা বাংলাদেশে তৃণমূলের হাসপাতালগুলোয় এটি দিয়ে তীব্র শ্বাসকষ্টের রোগীকে বাঁচানোর সম্ভাবনা মিলল। কো-ভেন্টিলেটরের জন্য আইসিইউ ব্যবস্থাপনাও দরকার পড়ে না, এমনকি গাড়িতে রোগী বহনের সময় ব্যাটারি দিয়ে চালানো যাবে এটি! একবার ভাবুন, যেখানে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ বাড়বে সেখানেই সহজে বহনযোগ্য এই ভেন্টিলেটর সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। হন্যে হয়ে বড় শহরের দিকে ছুটে আসার পথে আর অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যেতে হবে না।
বিপুল মাত্রায় অক্সিজেন দিতে না পারার কারণে করোনাভাইরাস আক্রান্ত কত রোগীর মৃত্যু আমরা অহরহ প্রত্যক্ষ করছি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যেই দেখা যায়, উপজেলা তো দূরের কথা অনেক জেলা শহরের হাসপাতালেও আইসিইউ নেই, কোনো কোনো জেলায় যৎসামান্য আইসিইউ আছে। তীব্র শ্বাসকষ্টে ভোগা হাজার হাজার রোগীর ভিড়ে যন্ত্রপাতির অভাবে চিকিৎসকদের নিরুপায় তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করার থাকে না তখন। চিকিৎসকরা প্রায়ই তাদের এ দুর্বিষহ মানসিক যাতনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেন।
চিকিৎসাসেবা নিয়ে খবরগুলোয় দেখবেন, তৃণমূলের হাসপাতালে যত পদ রয়েছে তত লোকবল না থাকার কথা প্রায়ই উঠে আসে। বোঝাই যায়, সরকারি হাসপাতালগুলোর মান উন্নয়নে অবহেলা রয়েছে। বিগত দশকগুলোয় স্বাস্থ্যসেবার হাল এক রকম বেসরকারি খাতের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু ধনাঢ্য ব্যক্তিরাই নন সামান্য সচ্ছলরাও বেসরকারি হাসপাতালমুখী। কিন্তু করোনাভাইরাসের এ সংকটে সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থা কত জরুরি সেই বোধ শাপে বরের মতো জাগিয়ে দিয়েছে। এখন সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়াতে কত কিছুই না করা হচ্ছে। হাজার হাজার চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, হাসপাতালে হাসপাতালে বসছে অক্সিজেন প্ল্যান্ট, যাচ্ছে আইসিইউ বেড। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর তোড়জোড় চলছে।
ওই ওয়েবনিয়ারে ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেই ফেললেন, বিশ্বে কোথায় কী প্রযুক্তি তৈরি হচ্ছে সব খবর তাদের কাছে নেই। প্রশ্ন জাগে, সরকারিভাবে এই খোঁজখবর রাখার কি ব্যবস্থা নেই? পরক্ষণেই মনে পড়ে, সাধারণের স্বাস্থ্যসেবাকে এগিয়ে নিতে পারে এমন বিষযগুলো কেন সংবাদপত্রে বেশি বেশি ছাপা হয় না? প্রযুক্তিপাতায় তো নিয়মিতই এসবের খবর আসতে পারে।
বিনামূল্যে পাওয়া ২১/২২ কোটি টাকা মূল্যের আড়াইশ কো-ভেন্টিলেটর দেশে আনায় ঝক্কি পোহাতে হয়েছে ডা. এ বি এম আবদুল্লাহকেও। এ সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ যে প্রয়োজন হয়েছে সেই ইঙ্গিতও মেলে। অদ্ভুত এক রেওয়াজ চালু হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া বেশিরভাগ কাজই আটকে থাকে। এমন জরুরি সময়েও আইসিইউ বেড, পিসিআর ল্যাব পৌঁছানোর পরও কোথাও কোথাও তা চালু করতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় ব্যয়ের খবর আসছে। তাই অব্যবস্থাপনার সংকটের কথা ওই ওয়েবনিয়ারে তুলে ধরেন সংসদ সদস্য আরমা দত্ত। দ্রত যথাযথভাবে কো-ভেন্টিলেটরগুলোর ব্যবহার নিশ্চিত করার জোর তাগিদ দেন তিনি।
তৃণমূলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রচেষ্টার প্রমাণ আমরা আগেও পেয়েছি। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করেছিলেন, সরকার বদলে যা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শুধু তার ইচ্ছা থাকলেই সবটা সফল হবে না; স্বচ্ছ গতিশীল ব্যবস্থাপনাও প্রয়োজন। সেজন্য তথ্য অবারিত হওয়া দরকার, জনগণের অংশগ্রহণও আবশ্যক। প্রথম থেকেই সব তথ্য উন্মুক্ত করে দিলে মাঝে মাঝে বেমক্কা খবরে আর নড়েচড়ে বসতে হবে না, সবাই সতর্ক হবেন।
বাংলাদেশে সত্তর শতাংশের বেশি মানুষের বাস পল্লী অঞ্চলে। তাই তৃণমূলে সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা না থাকার অর্থ দাঁড়ায় তারা বঞ্চনার শিকার হচ্ছে; যা মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অথচ বাংলাদেশের স্থিতিশীলতায় অগ্রগতিতে এ মানুষদের অবদান কম নয়। অতিমারীর মধ্যে গ্রামবাসীর কারণেই অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা না লাগার কথা মন্ত্রীরাও স্বীকার করে থাকেন। অথচ গ্রামের মানুষরাই যুগ যুগ ধরে অবহেলার শিকার।
মহামারী শুরুর পর গত বছর জেলা-উপজেলার হাসপাতালে কভিড রোগীদের জন্য বেড নির্দিষ্ট করার হিড়িক পড়ে। এখনো সেসব রয়েছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিদিন যে তথ্য প্রকাশ করে তাতে এক জেলার তথ্য মেলাতে গিয়ে দেখি, ওই জেলার মোট কভিড রোগীর বেড সংখ্যায় উপজেলার বেডগুলো গণনায় ধরাই হয়নি। বুঝতে অসুবিধা হয় না, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কভিড রোগীদের বেড আদতে গুরুত্বহীন।
দম বন্ধ হয়ে আসা এ সময়েও দেশজুড়ে দারুণ সব স্থাপত্যে শত শত মডেল মসজিদ নির্মাণ সম্ভব হলে মডেল হাসপাতাল গড়া যাবে না কেন? মুজিববর্ষ ঘিরে লাখ লাখ গৃহহীনকে ঘর বানিয়ে দিয়ে যে অভূতপূর্ব নজির সরকার স্থাপন করেছে, স্বাস্থ্য খাতেও তেমন উদ্যোগ সময়ের দাবি। মাঝে মাঝে খবর আসে, জরুরি চিকিৎসা দিতে প্রত্যন্ত পাহাড়ি কোনো গ্রামবাসীকে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে হেলিকপ্টারে করে উড়িয়ে আনার। দেশের সব মানুষকে এভাবে উড়িয়ে এনে চিকিৎসা দেওয়া নিশ্চয় সম্ভব নয়, তার চেয়ে দেশজুড়ে চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা গড়ে তোলাই শ্রেয়।
গ্রামবাসীদের মধ্যেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। জেলায় জেলায় ব্যাপক হারে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। সময় এসেছে তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত করার। এতে বড় শহরগুলোতে গ্রামবাসীর ভিড় কমলে শহরবাসীর সেবা পেতেও সুবিধা হবে। শুধু করোনাভাইরাস আক্রান্তের ক্ষেত্রেই নয় তৃণমূলে সব রকম চিকিৎসার ভিত গড়ে তোলার এটাই সময়।
লেখক : সাংবাদিক
