জনগণ ও কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত না করে কখনোই কোনো মহামারী মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রশাসননির্ভর নানামুখী পদক্ষেপ দিয়ে গত দেড় বছরে করোনা মোকাবিলায় সরকার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সফল হয়নি। তারপরও সরকার প্রশাসনের বাইরে কারও ওপর আস্থা রাখতে চাইছে না। চলতি সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় কমিউনিটি তো দূরের কথা, জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করার কোনো পদক্ষেপ নেই, যা মহামারী পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
গতকাল রবিবার নাগরিক প্লাটফর্ম এবং হাঙ্গার প্রজেক্টের পক্ষ থেকে আয়োজিত ‘করোনা মোকাবিলায় স্থানীয় জনসম্পৃক্ত উদ্যোগ’ শীর্ষক ভার্চুয়াল সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। তারা বলেন, একের পর এক সরকারের স্ববিরোধী পদক্ষেপ জনগণকে ভুল বার্তা দিচ্ছে। করোনার ক্ষতি ও বাঁচার উপায় সকলে জানে, কিন্তু কেউ মানছে না। আইন প্রয়োগ করেও মানানো যাচ্ছে না।
এ অবস্থায় হাঙ্গার প্রজেক্টের ‘করোনা প্রতিরোধী গ্রাম’-এর মতো করে স্থানীয় কমিউনিটি ও জনগণকে সম্পৃক্ত করে মহামারী মোকাবিলায় মডেল উপজেলা তৈরির প্রস্তাব করেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষণা সংস্থা সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, এটা এমন একটা সংকট, যেটা প্রতিটি জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারের উচিত জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মোকাবিলা করা। সরকারকে মনে রাখতে হবে, স্থানীয় উন্নয়ন সহযোগীরা সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।
তার আগে দি হাঙ্গার প্রজেক্টের কান্ট্রি ডিরেক্টর এবং গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. বদিউল আলম মজুমদার জানান, তার প্রতিষ্ঠান গত বছরের এপ্রিল থেকে করোনাভাইরাস বিস্তার রোধে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার প্রযুক্তিগত নির্দেশিকা অনুসরণ করে দেশের প্রায় বারশ’ গ্রামে ‘করোনাভাইরাস প্রতিরোধ সক্ষম গ্রাম (সিআরভি)’ বাস্তবায়ন করেছে। এতে জনগণ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নেতৃত্বকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। কীভাবে সংক্রমণ ঠেকানো যাবেÑ সে বিষয়ে যেমন সচেতন করা হয়েছে, তেমনি বাস্তবায়নে পাশে থেকেছে প্রজেক্টের স্বেচ্ছাসেবীরা। আবার কেউ সংক্রমিত হলে তার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হয়েছে। এভাবে সংশ্লিষ্ট গ্রামগুলোতে সংক্রমণ অনেকটা কমানো গেছে। ওইসব গ্রামের স্বাস্থ্য সচেতনতা অন্য গ্রামগুলোর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। বদিউল আলম মজুমদার বলেন, প্রধানমন্ত্রী যদি দলমত নির্বিশেষে সকলকে ডাক দেন এবং করোনা মোকাবিলায় সহায়তা চান, তাহলে বড় একটা কাজ হতে পারে।
প্রফেসর রওনক জাহান বলেন, করোনা মোকাবিলায় কমিউনিটিবেজড জাতীয় কর্মপরিকল্পনা দৃশ্যমান নয়, আদৌ হয়েছে কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। সরকারের দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা। মানুষ জানে করোনা মোকাবিলা করতে হবে। কিন্তু কেউ তা মানছে না, সরকারও মানাতে পারছে না। এর কারণ সরকার নিজেও তার সিদ্ধান্তে স্থির থাকতে পারছে না। এর প্রভাব পড়ছে সব মানুষের মধ্যে।
এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্লাটফর্ম, বাংলাদেশের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, করোনা মোকাবিলায় যা কিছু করার, সরকার একা তার প্রশাসন দিয়ে করতে চায়। এমনকি জনপ্রতিনিধিদের এ কাজে সম্পৃক্ত করায় অনীহা দেখা গেছে। জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর জন্য, বিশেষত বেসরকারি উন্নয়ন সহযোগীদের নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করার প্রস্তাব গত বছর থেকে করা হলেও কোনো সাড়া নেই। সংক্রমণ বেড়ে গেলে সরকার মাঝেমধ্যে লকডাউন দিচ্ছে, তাতে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছেÑকাজের কাজটি কিন্তু হচ্ছে না।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, মাঠের বক্তৃতা দিয়ে করোনা মোকাবিলা করা যাবে না। করোনা প্রতিরোধের প্রথম কথা হবে ন্যায্যতা। ১৪ দিনের লকডাউন দিয়ে বলা হয়েছিল, শিল্প-কারখানাসহ সব কিছু বন্ধ থাকবে। কিন্তু রবিবার থেকে পোশাক কারখানা খুলে দেওয়া হলো। সুরক্ষা অ্যাপ চলছে ম্যানুয়ালি। যাকে চেনা যায়, তার টিকার ডেট তাড়াতাড়ি দেওয়া হচ্ছে, অন্যরা দেরিতে পাচ্ছে। গ্রামে এনআইডি দেখালে টিকা মিলবে, শহরে কেন এ ব্যবস্থা নয়Ñ প্রশ্ন রাখেন তিনি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, জনসম্পৃক্ত করে করোনা মোকাবিলায় যে উদ্যোগ দরকার ছিল, তা নেই। সরকারের দিক থেকে এমন কোনো নির্দেশনা নেই। সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজে থেকে কাজ করছে। আমি নিজেও এ কাজ করতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলাম। সেরে আবার নেমেছি। গ্রামের মানুষ নিজেদের মতো করে চলছে, করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। তার চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। নিজ এলাকায় করোনা মোকাবিলায় ‘জামিল ব্রিগেড’ নিয়ে কাজ করছি। এখানে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স বসে আছে, প্রয়োজনে পাচ্ছি না।
বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলা চেয়ারম্যান স্বপন কুমার দাস বলেন, করোনা মোকাবিলা কার্যক্রম স্থানীয়করণ করা দরকার। সমন্বয়হীনতা দূর করা দরকার। স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করছে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিরা সহায়তা দিচ্ছে। অথচ হওয়া উচিত ছিল উল্টো। দফায় দফায় যে লকডাউন দেওয়া হয়েছে, তা সফল হয়নি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক্সেস টু ইনফরমেশন প্রকল্পের পলিসি অ্যাডভাইজর আনির চৌধুরী বলেন, করোনা মোকাবিলায় স্বেচ্ছাভিত্তিতে যারা কাজ করছে, তাদের করোনা সংক্রমণসংক্রান্ত সরকারি তথ্য দেওয়া দরকার।
অন্যদের মধ্যে অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহীদুজ্জামান খোকন, সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান সাঈদ মেহেদী, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল, এডিসি নির্বাহী পরিচালক সেলিমা সারওয়ার, এফআইভিডিবি নির্বাহী পরিচালক বজলে মোস্তফা রাজী অংশ নেন। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের সমন্বয়ক ও ব্র্যাকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ড. মোস্তাক রাজা চৌধুরী।
