চকরিয়ায় বন্যায় রাস্তাঘাট-বেড়িবাঁধের ক্ষতি শত কোটি টাকার

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২১, ১২:৫৪ পিএম

অবিরাম ভারী বর্ষণ আর মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়ায় স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার প্রাদুর্ভাব ঘটে। এই অবস্থায় গত পাঁচদিন ধরে উপজেলার ১৮ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা জনপদে ৬ লাখের মধ্যে প্রায় চার লাখ মানুষ ছিলেন পানিবন্দি।

অবশ্য শনিবার থেকে নদীতে পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় নেমে যেতে থাকে বানের পানি। তবে লোকালয় থেকে পানি নেমে গেলেও নানা দুর্ভোগে পড়েছেন বানভাসী মানুষ।

এরই মধ্যে বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্র, রাস্তার দ্ধারে আশ্রয় নেয়া লোকজন বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর সড়কগুলো যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নলকূপগুলো কয়েকদিন ধরে পানিতে ডুবে থাকায় পানি উঠছে না। এতে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকটে পড়েছে বন্যাকবলিত মানুষ। টানা তিনদিন পর বন্যার পানি লোকালয় থেকে সরে যাওয়ায় এখন ভেসে উঠছে সড়কের ক্ষত চিহ্ন।

পানির স্রোতের চাপে বন্যায় উপজেলা এলজিইডি বিভাগের ৩০ কিলোমিটার, সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগের ২০ কিলোমিটার, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অধিদপ্তর (পিআইও) বিভাগের অধীন ১৮টি ইউনিয়নে প্রায় একশ কিলোমিটার সড়ক কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা।

রবিবার চকরিয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে একাধিক গ্রামীণ সড়ক দেখতে গিয়ে দেখা গেছে, বন্যার পানি সরে যাওয়ায় এখন ভেসে উঠছে সড়কের ক্ষত চিহ্ন। একইসঙ্গে বন্যার পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৬০ মিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সব মিলিয়ে বন্যার তাণ্ডবে চকরিয়া উপজেলাজুড়ে সড়ক ও বেড়িবাঁধের প্রায় শত কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

বন্যার তাণ্ডবে উপজেলার ১ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে অবস্থিত ২৫২টি চিংড়ি ঘের প্লাবিত হয়েছে। এতে ১৯ কোটি ১২ লাখ টাকার ৩৮২ মেট্রিক টন চিংড়ি ভেসে গেছে।

পাশাপাশি ভারী বর্ষণে উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এলাকায় ৭১২ হেক্টর আউশ, ৩৮০ হেক্টর আমনের বীজতলা, ৬৪৮ হেক্টর রোপা আমন ও ২৫৫ হেক্টর সবজিক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকা সরজমিন ঘুরে দেখা মেলে বন্যা কবলিত লোকজন খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে রয়েছে।

চকরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব ফজলুল করিম সাঈদী ইউনিয়ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের উদ্বৃতি দিয়ে জানান, পাঁচদিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে ঘর-বাড়িসহ রাস্তাঘাট। বানভাসি মানুষ খুব কষ্টে আছেন। সরকারিভাবে ও বেসরকারি উদ্যোগে যে ত্রাণ দেয়া হচ্ছে তা খুবই অপ্রতুল।

তিনি বলেন, উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চকরিয়া ১৮টি ইউনিয়ন ছাড়াও পৌরসভা এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানি কমলেও এখন ক্ষতির চিহ্ন দৃশ্যমান হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড চকরিয়া উপজেলার বদরখালী শাখা কর্মকর্তা (এসও) মো. জামাল মোর্শেদ বলেন, বন্যার তাণ্ডবে মাতামুহুরী নদীর চকরিয়া উপজেলা অংশের ৫ স্থানে ১১০ মিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) চকরিয়া উপজেলা প্রকৌশলী কমল কান্তি পাল বলেন, ভারী বর্ষণ আর পাহড়ি ঢলে উপজেলার ১৮ ইউনিয়নে প্রায় ৩০ কিলোমিটার সড়ক কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তদমধ্যে শনিবার সমীক্ষা চালিয়ে আমরা অন্তত চার কিলোমিটার সড়ক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নির্ণয় করেছি। যার ক্ষতির পরিমাণ ৩ থেকে চার কোটি টাকা।

চকরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এস এম নাসিম হোসেন বলেন, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ১৮টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় ৭১২ হেক্টর আউশ, ৩৮০ হেক্টর আমনের বীজতলা, ৬৪৮ হেক্টর রোপা আমন ও ২৫৫ হেক্টর সবজিখেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চকরিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বেনজির আহমেদ বলেন, উপজেলার চিরিংগা, বদরখালী, সাহারবিল, পশ্চিম বড় ভেওলা, ডুলাহাজারা ও খুটাখালী এলাকায় ১১ হাজার হেক্টর জমিতে আনুমানিক ৮১০টি চিংড়ির ঘের রয়েছে। তার মধ্যে ২৫২টি চিংড়িঘের প্লাবিত হয়েছে। এতে ১৯ কোটি ১২ লাখ টাকার ৩৮২ মেট্রিক টন চিংড়ি ভেসে গেছে।

এ ছাড়া চকরিয়ার ৮২টি বাণিজ্যিক পুকুর বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ১ কোটি ৬ লাখ টাকার ৫৩ মেট্রিক টন সাদা মাছও ভেসে গেছে।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ শামসুল তাবরীজ বলেন, উপজেলায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পর মাঠপর্যায়ে হিসাব করেই জানা যাবে ক্ষতির পরিমাণ। ঘর হারানো পরিবার ও ভেঙে যাওয়া সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে যোগাযোগ সচল করা অগ্রধিকার দেয়া হবে।

তিনি বলেন, বন্যা দুর্গত এলাকায় খাবার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়াও প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য ৪ টন চাল ও শুকনো খাবার দেয়া হয়েছে। আরো ২৮ টন চাল ও শুকনো খাবার বরাদ্দের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

অপরদিকে, বন্যায় দুর্গত মানুষের চিকিৎসা সহায়তায় চকরিয়ার উপজেলার ১৮ ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার জন্য মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। পাঁচদিনের টানা বর্ষণ ও বন্যার কারণে দুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে ডায়রিয়া, আমাশয়, জ্বরসহ পানিবাহিত নানা রোগব্যাধি। এছাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকে থেকেও বিশেষ ব্যবস্থায় দুর্গতদের দেয়া হচ্ছে চিকিৎসা সেবা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত