বিশিষ্টরা নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে সর্বহারার সর্বনাশ দেখেন: তসলিমা

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২১, ১০:০৬ এএম

দুই দফায় ছয় দিন রিমান্ডের পর পরীমনির জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয় শুক্রবার।

গত ৪ আগস্ট পরীমনিকে আটকের পর থেকে ন্যায়বিচারের দাবিতে সরব হয়েছেন অনেকেই। চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি তার সদস্যপদ স্থগিত করলেও শৈল্পিক ধারার নির্মাতা প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। সম্প্রতি আস্তে আস্তে মুখ খুলতে শুরু করেছেন এফডিসিকেন্দ্রিক অনেক নির্মাতারা। মানববন্ধনের ডাকও দিয়েছে একাধিক প্ল্যাটফর্ম। লেখালেখি হচ্ছে পত্র-পত্রিকায়।

এর মাঝে পরীর নাম উল্লেখ না করেই সংবাদমাধ্যমে লিখিত বিবৃতি দিয়েছেন ১৭ বিশিষ্ট নাগরিক।

এ বিশিষ্ট নাগরিকদের সমালোচনা করে ফেইসবুকে নিজের মতামত জানালেন তসলিমা নাসরিন।

নির্বাসিত লেখিকা বলেন, “ফাইনালি বাংলাদেশের ‘বিশিষ্ট নাগরিকেরা’ চলচ্চিত্র শিল্পী পরীমনির ওপর যে ভয়াবহ নির্যাতন হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়েছেন। বিশিষ্ট নাগরিকেরা সব সময়ই সব ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পর কিছু লোকের ক্রমাগত চাপে এবং অনুরোধে মাথা দোলান, কয়েক দিন ভেবেচিন্তে বিবৃতিতে নাম যাওয়ায় রাজি হন। তার আগে অবশ্য নিশ্চিত হয়ে নেন, অন্য ‘বিশিষ্ট’রা বিবৃতিতে সই করেছেন। বিশিষ্টদের নাম থাকলে বিশিষ্টরা এগোন, অ-বিশিষ্টদের সঙ্গে শুরু থেকে প্রতিবাদে নামেন না, তার চেয়ে বসে বসে নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে সর্বহারার সর্বনাশ দেখেন।”

এরপর পরীমনিকে নিয়ে লেখা ৪ জুলাইয়ের পোস্ট তুলে ধরেন তসলিমা— “ফেইসবুকে শিং মাছের মতো দেখছি প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে বাংলাদেশের নায়িকা পরীমনির বিরুদ্ধে কুৎসিত সব গালাগালি। কোনো মেয়ের বিরুদ্ধে যখন লোকেরা ক্ষেপে ওঠে, তাকে দশদিক থেকে হামলা করতে থাকে, এমন উন্মত্ত হয়ে ওঠে যেন নাগালে পেলে তাকে ছিঁড়ে ফেলবে, ছুড়ে ফেলবে, পুড়িয়ে ফেলবে, পুঁতে ফেলবে, ধর্ষণ করবে, খুন করবে, কুচি কুচি করে কেটে কোথাও ভাসিয়ে দেবে, তখন আমার ধারণা হয় মেয়েটি নিশ্চয়ই খুব ভালো মেয়ে, সৎ মেয়ে, সাহসী মেয়ে, সোজা কথার মেয়ে। আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা এটাই বলে। বাংলাদেশের সিনেমা আমি দেখি না। পরীমনির নামও আগে শুনিনি। তবে তাকে আমি দূর থেকে আমার শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা জানাচ্ছি। সব মেয়ে স্ট্রাগল করে না, কিছু মেয়ে করে। কিছু মেয়ে স্ট্রাগল করে সব মেয়ের জন্য যুগে যুগে বেটার পরিস্থিতি আনে। এই স্ট্রাগল করা কিছু মেয়েই একেকটা মাইলফলক।”

আরও বলেন, “সেই শুরু, সেই থেকে লিখে যাচ্ছি। মেয়েটির দুর্ভোগ ক্রমশ বাড়ছিলই। এর মধ্যে মেয়েটিকে দেশের পুলিশ গোষ্ঠী, ধর্মান্ধ গোষ্ঠী, ধনী গোষ্ঠী, মূর্খ গোষ্ঠী, মাফিয়া গোষ্ঠী, মিডিয়া গোষ্ঠী, প্রভাবশালী গোষ্ঠী— যত গোষ্ঠী আছে জ্যান্ত কবর দিয়ে দিয়েছে। নার্ভাস ব্রেক ডাউন হয়ে গেছে সম্ভবত। যত মানসিক ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। শেষে আড়মোড়া ভাঙলেন কারা? ‘বিশিষ্ট নাগরিকেরা’। বিশিষ্ট নাগরিকেরা বড় বৃদ্ধ। বড় বেশি ঘুমিয়ে থাকেন। কানে কম শোনেন। দেশ যে অন্ধকারে তলিয়ে গেছে, সে খেয়াল রাখেন না। দেশ জুড়ে যে নারীবিদ্বেষী হায়েনারা আর শকুনেরা সাহসী মেয়েদের কামড়ে খাচ্ছে, ছিঁড়ে খাচ্ছে— তা দেখেন না, চোখে ছানি পড়েছে অনেক আগেই। বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাগরিকেরা জরুরি কথা বলতে বড় বেশি দেরি করেন। পরিবেশ ঠিক থাকলে, মুখ খুললে অসুবিধে হবে না জেনে, তারপর মুখ খোলেন। বেড়ালের গলায় ঘণ্টিটা সব সময় অ-বিশিষ্টরা বাঁধেন। ঝুঁকি নেন অ-বিশিষ্টরাই। তাদের চোখ কান খোলা। সমাজে আসলে অথর্ব বিশিষ্টের চেয়ে প্রতিবাদী অ-বিশিষ্টদের বেশি দরকার।”

শনিবার আদালত থেকে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে নেওয়া হয় পরীমনিকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত